‘মানুষের জন্মবৃত্তান্ত। জননীগর্ভের মধ্যেকার অবস্থা।’ খাতা বোঝাই চিত্রমালা—নিজের ভাবনাচিন্তা দিয়েই আঁকেন, কেউ শেখায়নি। ছবি আঁকতে আঁকতে গুনগুন করেন:
সে দেশের যত নদনদী
ঊর্ধ্বদিকে জলস্রোতে বহে নিরবধি—
আবার জলের নিচে আকাশ বাতাস
তাতে মানুষ বাস করতেছে।
দীন শরতের লেখা দেহতত্ত্বের গান। হরিপদ গোঁসাইয়ের নাম অনেক শুনেছি, এই প্রথম দেখছি। ভাল হঠযোগ, প্রাণায়ামে দক্ষ বাউল। শুনেছি প্যারিসে যান যুবক যুবতীদের যোগ শেখাতে। তারাও আসে শীতকালে এই নবাসনে। বাড়িঘরদোর বেশ আধুনিক ধাঁচের, স্যানিটারি পায়খানা, পাতকুয়া আর টিউবওয়েল। ফরাসি ভক্তভক্তাদের জন্য, তাদেরই বদান্যতায় তৈরি। গোছানো মানুষ। হাসতে হাসতে দেখালেন নানা রাজপুরুষের সঙ্গে তাঁর ফোটোর অ্যালবাম। তারপরে চমকে দিলেন প্যারিস থেকে প্রকাশিত একটা সিডি রেকর্ড বার করে। হরিপদ গোঁসাই আর নির্মলা গোসাইয়ের কণ্ঠে বাউলগান, তাঁদের রঙিন ছবি। ইনলে কার্ডে লেখা Inde : Chants D’initiation Das Bauls Du Bengale.
হরিপদ-র প্রসন্ন হাসি দেখে বুঝলাম মানুষটা সবাইকে মেরে বেরিয়ে গেছেন—কোথায় লাগে সুবলদাস বা সাধনদাস? এবারে আশ্রমবিহারিণী নির্মলা মা-কে দেখি। সবাই নির্মলাকে মা-ই বলে। আট বছর পেরোনো একটু পৃথুল চেহারা, পান খেয়ে দাঁত কালো, গেরুয়া বসন, পাকা চুল। সিডির কভারে তাঁর ছবিটা উত্তরচল্লিশ বয়সের। তখনও চেহারায় কটাক্ষে খানিকটা রং ছিল, এখন একেবারে সদানন্দ হাস্যময়ী। হরিপদ বেশ প্রত্যয় নিয়ে বললেন, ‘নির্মলা সেবাদাসী নয়, সাধনসঙ্গিনী। কুড়ি বছরে দুই মেয়ে নিয়ে বিধবা হয়েছিল। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছি, তার পরে ওকে আশ্রমে এনে সাধনভজন আর গান শিখিয়েছি।’
—আপনাদের সন্তান নেই?
—বাউল সাধনায় কি সন্তান জন্ম দেয়? দেয় না। গানে তাই বলছে : ‘শরিক কোরোনা না রে মন/ করি বারণ।’ আমাদের ঊর্ধ্বযোগ। শেখা কি সহজ? এই নির্মলা আমার কাছে কত মারধর খেয়েছে। জিজ্ঞেস করুন।
জিজ্ঞেস করতে হয় না। নির্মলা নিজেই উজিয়ে বলে, ‘কী মার যে মেরেছে গোঁসাই— চড়চাপড় লাথি পর্যন্ত খেয়েছি। রাগ অভিমান কত করেছি। গোঁসাই কত ভালবেসে রাগ ভাঙিয়েছে, পায়ে ধরেছে। এখন তো আমরা বুড়োবুড়ি, তবে সাধনায় আছি। শিষ্যসেবক অনেক। গোঁসাই যায় শিষ্যদের বাড়ি। আমি যেতে পারিনে, কোমরে বাত, তা ছাড়া এই আশ্রমের দেখাশোনা কে করবে?’
আশ্রমটা বেশ বড় করেই ফেঁদেছে এরা। প্রশস্ত উঠোনের চারপাশে আট-দশখানা ঘর। গোরু আছে তিনটে। হলস্টিন গাই। তার জন্য খড়ের আয়োজন। একপাশে ধানের মরাই। উঠোনে গাঁয়ের বোষ্টম ভক্তরা দিনান্তে সন্ধ্যাকীর্তন গাইছে। বাড়ির কাজকর্ম করছে জনাকয় শিষ্যসেবক, বউ-ঝি। হরিপদ গর্বিত গলায় বলেন, ‘আমি বরিশালের মানুষ, এসে পড়েছি নবাসনে। এখানে একবার গান করতে এসে বাঁধা পড়ে গেছি। গাঁয়ের লোকজনই আশ্রমের জমি দিয়েছে। বেটারা সব সন্ধেবেলা তাড়ি খেয়ে পড়ে থাকত, নইলে ঝগড়া কাজিয়া করত। এখন সায়ংসন্ধ্যা নামগান করে। দু’-চারজন বাউল গান গায়। আমাকে বলে বাবা, নির্মলাকে মা।’
‘প্যারিস থেকে যারা আসে তারা কী বলে?’ আমি জানতে চাই।
‘তারাও বাবা বলে, মা বলে, এই দেখুন ফোটো।’ দেখলাম দুই স্বর্ণকেশী ফরাসিনী হরিপদ-র গালে গাল ঠেকিয়ে ছবি তুলেছে। ‘মিশেল আর জেনিপা… আমাদের দুই মেয়ে।’
নির্মলা বলেন, ‘জেনিপা বেশি দুষ্ট… মিশেল খুব শান্ত।’
পৃথিবীতে যত আশ্চর্য জিনিস দেখেছি তার মধ্যে একটা হল হরিপদ-নির্মলার ফরাসি সন্তানদের আলেখ্য। ওরা যোগ শিখতে আসে। হরিপদ বলেন, ‘ওদের খুব সাদা সহজ ভাববেন না। আমাকে ওরা টেস্ট করে তবে বাবা বলে মেনেছে।’
—তাই নাকি? কী রকম?
প্রথমবার যেবার প্যারিসে যাই, তিরিশ বছর আগে, তখন যোগ শেখাতে যেতাম। একদল ছেলেমেয়ে যোগ শিখত, তা ধরুন জন পনেরো। খুব দুষ্ট। একদিন গাড়ি করে নিয়ে যাচ্ছে আমাকে। তিনটে গাড়ি। হঠাৎ একটা নদী দেখে বলে স্নান করবে। সবাই হুড়মুড় করে নেমে পড়ল। সবাই জামাকাপড় খুলে ফেলল। বুঝুন কাণ্ড। একেবারে বেবাক নাঙ্গা। আমাকেই নিয়ে নিল সঙ্গে। জাপটে ধরল জলের মধ্যে। আমি কুম্ভক করে থাকলাম। দেখেশুনে ওরা হার মেনে বলল, ‘বাবা তুমি কঠিন লোক।’ আমি বললাম, ‘আমি যে সাধক।’
হরিপদ শুধু সাধক নয়, তাত্ত্বিক ও যোগী, চিত্রকরও। ছোটখাটো টোটকা চিকিৎসাতেও যশ আছে। তবে সব অর্থে দরদি বাউলপ্রেমিক, তাদের অভিভাবকও বটে। বিপদে আপদে বাউলদের পাশে দাঁড়ান, টাকা পয়সা দেন। মা নির্মলা বললেন, ‘বাউলদের মধ্যে বড্ড ব্যাধি বাবা। সংযম নেই। ইতরপনা বেশি। পুরুষের রোগ এসে যায় মেয়েদের মধ্যে। তখন এই নির্মলা মা ভরসা। গোঁসাই চিকিৎসা করেন আর আমি করি সেবা। ভাল কথা, আপনাকে একটা মজার জিনিস দেখাই।’
নির্মলা দ্রুত ঘরে ঢোকেন। না জানি আরও কী দেখাবেন। সিডি দিয়ে শুরু হয়েছে, ফরাসি শিষ্যশিষ্যাদের ফোটো দেখেছি। এবারে নির্মলা এলেন একতাড়া কাগজ নিয়ে। তাতে রয়েছে অপটু সই কিংবা নিরক্ষরের টিপছাপ, ওপরে মুচলেকা।
‘এসব কী জানেন?’ নির্মলা বিশদ করে বোঝেন, ‘এসব হল ব্যভিচারী ভণ্ড কিংবা বজ্জাত বাউলদের মুচলেকা। সাধনার নামে যারা মেয়েদের নষ্ট করে। এখানে এনে আমি তাদের নাকে খৎ দেওয়াই আর মুচলেকা লিখে নিই। নির্মলা মা-কে সবাই ভয় করে বুঝলেন।’
