উদ্ধব ফুট কেটে বলল, ‘আসলে দাদা ওর মনটা খুব নরম তো… নইলে ভাবুন আমার মতো পথের ভিখিরিকে ভালবাসে? কী আছে আমার? বাপ-মা নেই, চালচুলো নেই, এমনকী চক্ষু হেন রত্নও নেই…’
পাপিয়া সজোরে উদ্ধবের মুখ চেপে ধরে বলে, ‘চুপ চুপ। সব আছে তোমার। আমি আছি না?’
উদ্ধবের অন্ধচোখে জল পড়ে আর পাপিয়া সুন্দর করে হাসে— সেই হাসি অবশ্য উদ্ধব দেখতে পায় না, তবে বুঝতে পারে নিশ্চয়। তার নীরব কান্না থামে। আর আমি দেখি কী সুন্দর মর্তমানবী। সস্তা সিনথেটিক শাড়ির উদ্ভাসে রিক্ত গহনার শূন্যতা সত্ত্বেও সিঁথির সিঁদুরে রক্তিম যৌবনশ্রী— অথচ কোথাও এক চিলতে ত্যাগের অহংকার নেই, রয়েছে উৎসর্জনের পুণ্য। উচ্চশিক্ষার মোহ ছেড়েছে, ফেলে এসেছে বিত্তবাসনা, সম্পন্ন পিতৃগৃহের আওতা, সচ্ছল দাম্পত্যের ভবিষ্যৎ স্বপ্ন।
এদের কি বলা যাবে বাউলের চরণদাসী? কোনও ভাবেই না। অন্যোন্য সম্পর্কের চিরবন্ধনে বাঁধা প্রকৃত মানবমানবী। অন্তরের দৃষ্টিপ্রদীপের আলোয় মেয়েটি বরণ করেছে ছেলেটিকে। প্রতিবন্ধী বাউল কে বলবে একে? হাত ধরেছে চিরন্তনী নারী। সামান্য অন্নপানের পরিতৃপ্ত সংসার। টিনের চালার ছোট মাথা গোঁজার আস্তানা, একটা টিউকল, দুটো একটা পেঁপে বা কলা গাছ। উদ্ধব মাঝে মাঝে গান বানায় মুখে মুখে,পাপিয়া একটা খাতায় লিখে রাখে যত্ন করে। আহামরি গান কিছু নয়, তবু তো সৃষ্টি। তাতে আছে চলমান জীবনের বেঁচেবর্তে থাকার চিহ্ন। পিরনিবাসের প্রতিবন্ধী কল্যাণকেন্দ্রে না এলে আমার জীবনের একটা বড় স্বপ্ন দেখা অচরিতার্থ থেকে যেত। নারীর কত বড় শক্তি।
এমন যে নারীর কল্যাণময়ী রূপ তার ব্যতিক্রমও কি দেখিনি? মনে পড়ে অগ্রদ্বীপের মেলায় সম্বৎসর তমালতলায় জাঁকিয়ে বসে মীরা মোহান্ত-র আখড়া। এককালের গৌরবর্ণা রূপসী মীরা এখন আসর পরিচালিকার ভূমিকায়— একেবারে নিখুঁত মা-গোঁসাই। উনিশ শতকে কলকাতার সংস্কারান্ধ তিমিরাচ্ছন্ন অন্তঃপুরে মীরার মতো মধ্যবয়সিনী মা-গোঁসাইরা যেতেন। লোকশিক্ষা দিতেন, অক্ষরজ্ঞান শেখাতেন নিরক্ষর অন্দরবাসিনীদের। শোনাতেন কীর্তন ও দেহতত্ত্বের গান। লোকচিকিৎসা, জড়িবুটিতে ছিলেন ওস্তাদ। মীরা যেন অবিকল সেই মা-গোঁসাইয়ের স্থির প্রতিমা। মাঝে মাঝেই মেটেরির স্থায়ী আখড়া ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে শিষ্যদের বাড়ি হেথাহোথা। কুশল নেওয়া, ধর্ম কথা বলা, গান শোনানো অথচ গুরুদক্ষিণা আদায় করতেও তৎপর, সতর্কচক্ষু।
সারা বছর আখড়া চালানো, চালডাল সবজির জোগান বজায় রাখা, শিষ্যদের সানুপুঙ্খ খবর নেওয়া ও তা মনে রাখা সবই মীরার সহজ ভজনার মতো। তমালতলায় সে যখন বাঁধানো শানে গালিচা পেতে বসে আসর পরিচালনা করে সে দেখবার মতো। একেবারে যেন জন্মনেত্রী। কে কোথায় বসবে, কাকে বেশি আপ্যায়ন করতে হবে, কাকে চা দিতে হবে, কাকে পান, সবই তার খেয়াল থাকে। পদ্মাসন করে বসে আছে, গেরুয়া বসন, নাকে রসকলি। আয়ত দুটি শান্ত চোখ এককালে বিদ্যুৎপ্রভ ছিল— তখন অনেক বাউল বৈষ্ণব পাক খেয়েছে ঘূর্ণিঝড়ে। এখনও হ্যাজাকের আলোয় স্পষ্ট দেখি মীরার চোখের অগ্নিকোণে পরিতৃপ্তির ঝিলিক, ঠোঁটের ফাঁকে কর্তৃত্বের অদৃশ্য সফল হাসি৷ শিষ্যরা ভৃত্যের মতো নির্দেশ নিচ্ছে আর পালন করে কৃতার্থ বোধ করছে। মীরা নির্দেশ দিচ্ছে কোন শিল্পীর পর কোন শিল্পী আসরে উঠে কর্ডলেস মাইকটা হাতে নেবে। গানের আগে তারা মীরাকে কুর্নিশ করে। দেখবার মতো।
এই অনুষঙ্গে মনে পড়বেই কালিদাসীকে। সত্তর পেরোনো বৃদ্ধা গায়িকা—বাউলতত্ত্ব জানে। সারাবছর এ মেলা থেকে সে মেলা। একটা ঝকমকে র-সিল্কের সাইডব্যাগ বানিয়েছে কালিদাসী—মোটামুটি হোল্ডঅল। চলেছে জেলা তথ্য অফিসে, লোকসংস্কৃতি পর্ষদে, বিধায়ক বা পঞ্চায়েত সভাপতির দরবারে। ‘গানের সুযোগ করে দাও গো বাবাসকল, পেনশন দেবার ব্যবস্থা করো, গান করতে এলে রাহাখরচ বাড়াও। খাব কী?’ যেমন তেমন যখন তখন বেশ ক’টা তত্ত্বগান গেয়ে দিতে পারে। কেউ নেই, নিঃসম্বল। সত্যি সত্যি শেষ পারানির কড়ি তার কণ্ঠের গান। কিন্তু সে গানের সমাদর কি থাকতে পারে বরাবর?
পশ্চিমবঙ্গ লোকসংস্কৃতি ও আদিবাসী সংস্কৃতি কেন্দ্র-র উদ্যোগে বসেছিল বাউল সম্মেলন ও সেমিনার গুসকরার এক কলেজে। বাউলদের সান্নিধ্যে কাটল দু’রাত দু’দিন। একদিন সকালে ঘরোয়া আলোচনা চক্রে আলোচ্য বিষয় ছিল: ‘বাউল গানের ভবিষ্যৎ’। নানাজনে উঠে নানা কথা বলছেন। আমরা বিশেষজ্ঞরা ফুট কাটছি, গোঁজামিল বহুরকমের আশ্বাস দিচ্ছি। হঠাৎ বর্ধমানের এক বাউল গায়িকা, খানিকটা বর্ষীয়সী, বলে উঠলেন, ‘বাউল গানের ভবিষ্যৎ কী হবে তা নিয়ে ভেবে কী হবে? বলুন তো আপনারা, আমার কী হবে?’
—কেন? কেন?
—আগে যারা গান শুনত, আদর করত, টাকা পয়সা দিত, তারা তো কই আর ডাকে না। তা হলে কি আমি শুকিয়ে মরে যাব?
আমরা চুপচাপ। এক যুবক বাউল নীরবতা ভেঙে বলল, ‘দিদি… ফুলে যখন মধু থাকে তখন ভ্রমর আসে। মধু শুকোলে কি ভ্রমর আসবে? সেটা আপনার ভাবা ভুল।’
ফুলের ওপর ভ্রমর বসে আছে এমন ধরনের লোকচিত্র আঁকতে পারেন নবাসনের হরিপদ গোঁসাই। তাঁর আশি-পেরোনো নির্মেদ চেহারা একহারা, শ্মশ্রুগুম্ফজটাজুট মূর্তি। আপনমনে বসে বসে বাউলতত্ত্বের ছবি আঁকছিলেন। পদ্মের মৃণাল, জলস্তর আর সবুজ লতাপাতা। জিজ্ঞেস করলাম : ‘এসব কী আঁকছেন?’
