দেখি তাজমহলের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলেন শাহজাহান আর মমতাজ। হাত ধরাধরি করে। নবীন প্রাণ, নূতন যৌবন ফিরে পেয়েছেন, শতাব্দীর বিচ্ছেদ শেষ হয়েছে।
শুনি সঙ্গীত তরঙ্গের কলকল্লোল জাহ্নবী। সগররাজের সহস্র সন্তান নবীন প্রাণ নবীন যৌবন ফিরে পেয়ে উল্লাসধ্বনি করে উঠেছে।
কিন্তু গুণী, যৌবন পেয়েছে, প্রিয়ার প্রসাদ পেয়েছে, চূড়ান্তে পৌছে গিয়েছে অথচ কবিতার পদ যে এখনো অগ্রগামী
শবি আগর, আজ লবে ইয়ার বোসয়ে তলবম্
জোয়ান শওম—
আজি এ নিশীথে প্রিয়া অধরেতে চুম্বন যদি পাই
জোয়ান হইব
তারপর, তারপর কি?
শুনি অবিচল দৃঢ়কণ্ঠে অদ্ভুত শপথ গ্রহণ,–
জসেরো জিন্দেগী দুবারা কুনম
এই জীবন তাহলে আবার দোহরাতে, দুবার করতে রাজী আছি। একটি চুম্বন দাও, তাহলে আবার সেই অসীম বিরহের তপ্ত দীর্ঘ অন্তবিহীন পথ ক্ষতবিক্ষত রক্তসিক্ত পদে অতিক্রম করবার শক্তি পাব। আসুক না আবার সেই দীর্ঘ বিচ্ছেদ, তোমার অবহেলার কঠোর কঠিন দাহ!
আমি প্রস্তুত, আমি শপথ করছি,
–জসেরো জিন্দেগী দুবারা কুনম!
গোড়া হতে তবে এ-জীবন দোহরাই।
আমি মনে মনে মাথা নিচু করে বললুম, ক্ষমা করো গুণী, ক্ষমা করো কবি। শিখরে পৌঁছে উদ্ধত প্রশ্ন করেছিলুম, পদ এখনো অগ্রগামী, যাবো কোথায়। তুমি যে আমাকে হঠাৎ সেখান থেকে শূন্যে তুলে নিতে পারো, তোমার গানের পরী যে আমাকেও নীলাম্বরের মর্মমাঝে উধাও করে নিয়ে যেতে পারে, তার কল্পনাও যে করতে পারিনি।
বারে বারে ঘুরে ফিরে গুণীর আকুতি-কাকুতি শবি আগর, যদি এক রাতের তরে আর সেই দৃঢ় শপথ জিন্দেগী দুবারা কুনম, এ-জীবন দোহরাই–গানের বাদ বাকি এই দুই বাক্যেই বারে বারে সম্পূর্ণ রূপ নিয়ে স্বপ্রকাশ হচ্ছে। কখনো শুনি শবি আগর কখনো শুধু দুবারা কুনম শবি আগর, দুবারা কুনম।
পশ্চিমের সূর্য ডুবে যাওয়ার পরও পুবের আকাশ অনেকক্ষণ ধরে লাল রঙ ছাড়ে না কখন গান বন্ধ হয়েছিল বলতে পারিনে। হঠাৎ ভোরের আজান কানে গেল, আল্লাহু আকবর, খুদাতালা মহান মাভৈ, মাভৈ, ভয় নেই, ভয় নেই, তোমার সব কামনা পূর্ণ হবে।
ওয়া লাল আখিরাতু খাইরুন লাকা মিনাল উলা।
অতীতের চেয়ে নিশ্চয় ভালো হবে তো ভবিষ্যৎ।*
চোখ মেলে দেখি কবি নেই। মোল্লা মীর আসলম পাথরের মত বসে আছেন, আর দোস্ত মুহম্মদ দু-হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলেছেন।
——————-
* কুরান শরীফ ৯৩, ৪।
২০. দরজা খাঁখাঁ করছে
দরজা খাঁখাঁ করছে। ঘরে ঢুকেই থমকে দাঁড়ালুম। আসবাবপত্র সব অন্তর্ধান। কার্পেটের উপর অ্যাটাচিকেসে মাথা রেখে দোস্ত মুহম্মদ শুয়ে। আমাকে দেখেই চেঁচিয়ে বললেন, বোরর, গুমশোবেরিয়ে যা, পালা এখান থেকে।
দোস্ত মুহম্মদের রকমারি অভ্যর্থনা সম্ভাষণে ততদিনে আমি অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। কাছে গিয়ে বললুম, জিনিসপত্র সব কি হল? আগা আহমদ যে ভারী ভারী টেবিল চেয়ার, কোচ সোফা পর্যন্ত সরাবে ততটা আঁচ করতে পারিনি।
দোস্ত মুহম্মদ বিড়বিড় করে বললেন, সব ব্যাটা চোর, সব শালা চোর, কোনো ব্যাটাকে বিশ্বাস নেই, কাবুল থেকে প্যারিস পর্যন্ত।
আমি বললুম, বড় অন্যায় কথা। চুরি করল আগা আহমদ, দোষ ছড়ালে প্যারিস পর্যন্ত।
বললেন, কী মুশকিল, আগা আহমদ চুরি করলে তার পিছনে আমি রাইফেল কাঁধে করে বেরতুম না? না বেরলে আফ্রিদী সমাজে আমার জাত-ইজ্জত থাকত? নিয়েছে ব্যাটা লাফেঁ?
সে আবার কে?
পর্শু এসে পৌঁচেছে, ফরাসীর অধ্যাপক। ল-ই-দরিয়ায় বাসা বেঁধেছে বেশ বাড়িখানা। আফগান সরকারের যত আদিখ্যেতাআত্তি সব বিদেশীদের জন্য।
আমি বললুম, চোর কে, তার সাকিন-ঠিকানা সব যখন জানেন তখন মাল উদ্ধার–
বললেন, আইনে দেয় না–বেচারী দুঃখ করছিল কোথাও আসবাবপত্র পাচ্ছে না। আমি বললুম আমার বাড়িতে বিস্তর আছে–ফরাসী জানো তে, বুক দ্য মোবল, ফুল দ্য মোবল, তা দ্য মোবল, ব্যাটাকে দেখিয়ে দিলুম বিস্তর মাল কত বিচিত্র কায়দায় ফরাসীতে বলা যায়। শুনে ব্যাটা দুসরা আফগান লড়াইয়ের গোরা সেপাইয়ের মত কচুকাটা হয়ে শুয়ে পড়ল।
আমি বিরক্ত হয়ে বললুম, শুয়ে পড়ল কোথায়, এসে তো দিব্যি সব কিছু ঝেঁটিয়ে নিয়ে গেল।
দোস্ত মুহম্মদ আপত্তি জানিয়ে বললেন, তওবা তওবা, নিজে এলে কি আর সব নিয়ে যেত–দেখত না ভিটেতে কবুতর চরার মত অবস্থা হয়ে উঠেছে। আমিই সব পাঠিয়ে দিলুম।
আমি চটে গিয়ে বললুম, বেশ করেছ, এখন মনো হিমে শুয়ে–
এক লাফ দিয়ে দোস্ত মুহম্মদ আমার গলা জড়িয়ে ধরে বললেন, বলিনি বলিনি, তখন বলিনি, পারবিনি রে, পারবিনি–তোকে আপনি বলা ছাড়তেই হবে। কিন্তু তুই ভাই রেকর্ড ব্রেক করেছিস ঝাড়া পনরো দিন আপনি চালিয়েছিস।
আমি বললুম, বেশ বেশ। কিন্তু স্বেচ্ছায় যখন সব কিছু বিলিয়ে দিয়েছ তখন দুনিয়া শুদ্ধ লোককে চোর চামার বলে কটু কাটব্য করছিলে কেন?
কাউকে বলবিনে, শুনেই ভুলে যাবি? তবে বলি শোন। তুই যখন ঘরে ঢুকলি তখন দেখলুম তোর মুখ বড় ভার। হয়ত দেশের কথা ভাবছিলি, নয় কাল রাত্তিরের গানের খোয়ারি কাটিয়ে উঠতে পারিসনি কেন যে ক্ষ্যাপার এরকম ভূতুড়ে গান গায়? তা সে যাকগে। কিন্তু তোর মুখ দেখে মনে হল তুই বড্ড বেজার। তাই যা-তা সব বানিয়ে, তোকে চটিয়ে সব কথা ভুলিয়ে দিলুম। দেখলি কায়দাখানা।
আমি বললুম, খুব দেখলুম, আমাকে বেকুব বানালে। তোমাকে বেকুব বানায় আগা আহমদ, আর তুমি বেকুব বানালে আমাকে। তা নূতন কিছু নয়। আমাদের দেশে একটা দোহা আছে
