শমনদমন রাবণ আর রাবণদমন রাম,
শ্বশুরদমন শাশুড়ী আর শাশুড়ীদমন হাম্।
ঢিলে গল্প, কঁচা রসিকতা। কিন্তু দোস্ত মুহম্মদ নবীনের মত, যাহা পায় তাহাই খায়, মুখে হাসি লেগেই আছে।
আমি বললুম, সব বুঝেছি, কিন্তু একটা খাট তো অন্তত কেনো, মাটিতে শোবে নাকি?
দোস্ত মুহম্মদ বললেন, তবে আসল কথাটা এই বেলা শোন; বিলিতী আসবাবপত্রে আমি কখনো আরাম বোধ করিনি দশ বৎসর চেষ্টা করার পরও। অথচ পয়সা দিয়ে কিনেছি, ফেলতে গেলে লাগে। এতদিনে যখন সুযোগ মিলল তখন নূতন করে জঞ্জাল জুটোব কেন? এইবার আরাম করে পাঠানী কায়দায় ঘরময় মই চষে বেড়াব খাট থেকে পড়ে গিয়ে কোমর ভাঙবার আর ভয় নেই।
আমি বললুম, কর্মরত ন শিকনদ, তোমার কোমর ভেঙ্গে দু টুকরোনা হোক।।
কথা ছিল দুজনে একসঙ্গে বাগদান সায়েবের বাড়ি যাব।
পূর্বেই বলেছি ফরাসী দূতাবাসে বগদানফ সায়েবের বৈঠকখানা ছিল বিদেশী মহলের কেন্দ্রভূমি। বাগান থেকেই শব্দ শুনে তার আভাস পেলুম। ঘরে ঢুকে দেখি একপাল সায়েব মেম।
আমাকে ঘরের মাঝখানে দাঁড় করিয়ে বগদানফ সায়েব চোস্ত ফরাসী ভাষায় দুরুস্ত ফরাসী কায়দায় বললেন, পেরমেতে মওয়া ল্য প্লেজির দ্য ভূ প্রেজাতে অনুমতি যদি দেন তবে আপনাদের সামনে অমুককে নিবেদন করে বিমলানন্দ উপভোগ করি।
তারপর এক-একজন করে সকলের নাম বলে যেতে লাগলেন। আমি বলি, হাডুডু, তাঁদের কেউ বলেন, আশাতে, কেউ বলেন, শার্মে, কেউ বলেন, রাভি। অর্থাৎ আমার সঙ্গে পরিচিত হয়ে কেউ হয়েছেন enchanted, কেউ charmed কেউ বা ravished! একেই বলে ফরাসী ভদ্রতা। এরা যখন গ্রেতা গার্বো বা মার্সেনে দাঁতরিশের সঙ্গে পরিচিত হয়ে সত্যি সত্যি enchanted হন তখন কি বলেন তার সন্ধান এখনো পাইনি।
মসিয়োঁ লাফোঁ গল্পের হেঁড়া সুতোর খেই তুলে নিয়ে বললেন, তারপর বাদশা আমায় জিজ্ঞেস করলেন, ফরাসী শিখতে ছমাসের বেশী সময় লাগার কথা নয়। আমি বললুম, না হুজুর, অন্তত দুবছর লাগার কথা।
বগদানফ সায়েব বললেন, করেছেন কি? বাদশাহের কোনো কথায় না বলতে আছে? দিবা দ্বিপ্রহরে, প্রখর রৌদ্রালোকে যদি হুজুর বলেন পশ্য, পশ্য, নীলাম্বরের ললাটদেশে চন্দ্রমা কি প্রকারে শ্বেতচন্দন প্রলেপ করেছেন। আপনি তখন প্রথম বললেন, হুজুরের যে পূতপবিত্র পদদ্বয় অনাদি কাল থেকে অসীম কাল পর্যন্ত মণিমাণিক্যবিজড়িত সিংহাসনে বিরাজমান এ-গোলাম সেই পদরজ
স্পর্শ লাভের আশায় কুরবানী হতে প্রস্তুত। তারপর বলবেন—
বাধা দিয়ে মাদাম লাফে বললেন, সম্পূর্ণ মন্ত্রোচ্চারণে যদি ভুলচুক হয়ে যায়? দৈর্ঘ্য তো কিছু কম নয়।
বগদানফ সায়েব সদয় হাসি হেসে বললেন, অল্প-স্বল্প রদবদল হলে আপত্তি নেই। মণি-মাণিক্যের বদলে হীরা-জওহর বলতে পারেন, পদরজের পরিবর্তে পদধুলি বললেও বাধবে না।
তারপর বলবেন, হুজুরের কী তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, চন্দ্রমা সত্যই কি অপূর্ব বেশ ধারণ করেছেন এবং নক্ষত্রমণ্ডলী কতই না নয়নাভিরাম।
ইতালির সিমোরা দিগাদো জিজ্ঞেস করলেন, তবে কি ভদ্রতা বজায় রেখে হুজুরকে সত্যি কথা জানাবার কোনো উপায়ই নেই। এই মনে করুন মসিয়োঁ লাফে যদি সত্যি সত্যি জানাতে চান যে, ফরাসী শিখতে দুবছর লাগে?
বগদানফ বললেন, নিশ্চয়ই আছে, বাদশা যখন বলবেন ছমাস আপনি তখন বলবেন, নিশ্চয়ই, হুজুর, ছমাসেই হয়। দুবছরে আরো ভালো হয়। হুজুরেরও তো কাণ্ডজ্ঞান আছে। আপনার ভদ্ৰসৌজন্যের আতর তিনি শুকবেন, গায়ে মাখবেন, তাই বলে তো আর গিলবেন না।
মসিয়োঁ লাফে বললেন, এ সব বাড়াবাড়ি।
বগদানফ বললেন, নিশ্চয়ই; বাড়াবাড়িরই আরেক নাম superfluity। আর পোয়েট টেগোর আমাদের তিনি গুরুদেববলেই তিনি প্রোফেসর বেনওয়া ও আমার দিকে একবার বাও করলেন তিনি বলেন, আর্টের সৃষ্টি হয়েছে সুপারফ্লুয়িটি থেকে। আমার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে বললেন, কথাটা বোঝাতে গিয়ে তিনি শাস্ত্রী মশায়কে কি একটা চমৎকার তুলনা দিয়েছিলেন না?
আমি বললুম, কাঠের ডাণ্ডা লাগানো টিনের কেনেস্তারায় করে রাধু মালীর নাইবার জল আনার মধ্যে আর নন্দলাল কতৃক চিত্রবিচিত্রিত মৃৎপাত্র ভরে যোড়ণী তন্বী সুন্দরীর জল আনার মধ্যে যে সুপারফ্লুয়িটির তফাত তাই আর্ট।
বগদানফ সায়েব উৎসাহিত হয়ে বললেন, শুধু আর্ট? দর্শন, বিজ্ঞান, সব কিছু কলচর বলতে যা কিছু বুঝি। সবই সুপারফ্লুয়িটি থেকে, বাড়াবাড়ি থেকে।
অধ্যাপক ভ্যাঁসাঁ বললেন, কিন্তু এই কলচর যখন চরমে পৌঁছয় তখন গুরুচণ্ডালে এত পার্থক্য হয়ে যায় যে, বাইরের শত্রু এসে যখন আক্রমণ করে তখন সে দেশের সব শ্রেণী এক হয়ে দাঁড়াতে পারে না বলে স্বাধীনতা হারায়। যেমন ইরান।
আমি বললুম, ভারতবর্ষ।
পোলিশ মহিলা মাদাম ভরভচিয়েভিচি বললেন, কিন্তু ইংরেজ? তারা তো সভ্য, তাদের গুরুচণ্ডালেও তফাত অনেক, কিন্তু তারা তোল সব সময় এক হয়ে লড়তে পারে।
বগদানফ জিজ্ঞেস করলেন, কাদের কথা বললেন, মাদাম?
ইংরেজের।
ঐ যারা ইয়োররাপের পশ্চিমে একটা ছোট দ্বীপে থাকে?
মজলিসে ইংরেজ কেউ ছিল না। সবাই ভারী খুশী। আমি মনে মনে বললুম, আমাদের দেশেও বলে চরুয়া।
অধ্যাপক ভ্যাঁসাঁ বললেন, বগদানফ ঠিকই অবজ্ঞা প্রকাশ করেছেন। ইংরেজদের ভিতর অনেক খানদানী বংশ আছে সত্যি কিন্তু গুরুচণ্ডালে যে বৈদগ্ধ্যের পার্থক্য হবে, সে কোথায়? ওদের তো থাকার মধ্যে আছে এক সাহিত্য। সঙ্গীত নেই, চিত্রকলা নেই, ভাস্কর্য নেই, স্থপতি নেই। শ্রেণীতে শ্রেণীতে যে পার্থক্য হবে তার অনুভূতিগত উপকরণ কোথায়? অথচ ফ্রান্সে এসব উপকরণ প্রচুর; তাই দেখুন ফরাসীরা এক হয়ে লড়তে জানে না, শান্তির সময় রাজ্য পর্যন্ত চালাতে পারে না। যে দেশে আছি তার নিলে করতে নেই, কিন্তু দেখুন, এক ফোঁটা দেশ অথচ স্বাধীন।
