অথচ যখন বার্লিনে পড়াশুনা করত তখন তিন বছর ধরে মাসে চার শ মার্ক খর্চা করে আরামে দিন কাটিয়েছে।
অনেক রাতে খাবার ডাক পড়ল। গরম বাঙলা দেশেই যখন বিয়ের রান্না ঠাণ্ডা হয় তখন ঠাণ্ডা কাবুলে যে বেশীর ভাগ জিনিসই হিম হবে তাতে আর আশ্চর্য কি?
মীর আসলম তাই খানিকটে মাংস এগিয়ে দিয়ে বললেন, কিঞ্চিৎ শূল্যপক অজমাংস ভক্ষণ কর। আভ্যন্তরিক উত্মার জন্য ইহাই প্রশস্ততম।
তারপর দোস্ত মুহম্মদকে জিজ্ঞেস করলেন, কোনো জিনিসের অপ্রাচুর্য হয় নাই তো? দোস্ত মুহম্মদ বললেন, তা ব্ গুলুয়েম রসীদ–গলা পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে— গরগরা শুদম আমার ফাঁসি হয়ে গিয়েছে।
কোনো জিনিসে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হওয়ার এই হল ফার্সী সংস্করণ।
আফগান বিয়ের ভোঙ্গে যে বিস্তর লোক প্রচুর পরিমাণে খাবে সে কথা কাবুলে না এসেও বলা যায়, কিন্তু তারো চেয়ে বড় তত্ত্ব কথা এই যে, যত খাবে তার চেয়ে বেশী ফেলবে, বাঙলা দেশের এই সুসভ্য বর্বরতার সন্ধান আফগানরা এখনো পায়নি।
খাওয়া-দাওয়ার পর গালগল্প জমলো ভালো করে। শুধু দোস্ত মুহম্মদ কাউকে কিছু না বলে তিনটে কুশনে মাথা দিয়ে দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। আমার বাড়ি ফিরবার ইচ্ছে করছিল, কিন্তু আবহাওয়া থেকে অনুমান করলুম যে, রেওয়াজ হচ্ছে, হয় মজলিসের পাঁচজনের সঙ্গে গুষ্ঠিসুখ অনুভব করা, নয় নির্বিকারচিত্তে অকাতরে ঘুমিয়ে পড়া। বিয়ে বাড়ির হৈ-হল্লা, কড়া বিজলি বাতি আফগানের ঘুমের কোনো ব্যাঘাত জন্মাতে পারে না।
রাত ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে একজন একজন করে প্রায় সবাই ঘুমিয়ে পড়লেন। সইফুল আলম আমাদের আরেকপ্রস্থ চা দিয়ে গেলেন। মীর আলমের ভাষা বিদগ্ধ হতে বিদগ্ধতর হয়ে যখন প্রায় যজ্ঞভস্মের মত পূতপবিত্র হবার উপক্রম করেছে, তখন তিনি হঠাৎ চুপ করে গেলেন। চেয়ে দেখি, সেই বৃদ্ধ সেতার খানা কোলে তুলে নিয়েছেন।
মীর আসলম আমাকে কানে কানে বললেন, তোমার অদৃষ্ট অদ্য রজনীর তৃতীয় যামে সুপ্রসন্ন হইল।
সমস্ত সন্ধ্যা বৃদ্ধ কারো সঙ্গে একটি কথাও বলেননি। পিড়িং করে প্রথম আওয়াজ বেরতেই মনে হল, এর কিন্তু বলবার মত অনেক কিছু আছে।
প্রথম মৃদু টঙ্কারের সঙ্গে সঙ্গেই দোস্ত মুহম্মদও সোজা হয়ে উঠে বসলেন–যেন এতক্ষণ তারই অপেক্ষায় শুয়ে শুয়ে প্রহর গুনছিলেন।
সেতারের আওয়াজ মিলিয়ে যাবার পূর্বেই বুড়ার গলা থেকে গুঞ্জরন ধ্বনি বেরল কিন্তু ভুল বললুম— গলা থেকে নয়, বুক, কলিজা থেকে, তার প্রতি লোমকূপ ছিন্ন করে যেন সে শব্দ বেরল। সেতার বাঁধা হয়েছিল কোন্ সন্ধ্যায় জানিনে কিন্তু তার গলার আওয়াজ শুনে মনে হল, এর সর্বশরীর যেন আর কোনো ওস্তাদের ওস্তাদ বহুকাল ধরে বেঁধে বেঁধে আজ যামিনীর শেষমে এই প্রথম পরিপূর্ণতায় পৌঁছালেন।
ওস্তাদী বাজনা নয়–বুড়ার গলা থেকে যে পরী হঠাৎ ডানা মেলে বেরল, সেতারের আওয়াজ যেন তার ছায়া হয়ে গিয়ে তারই নাচে যোগ দিল।
ফার্সী গজল। বুড়ার চোখ বন্ধ; শান্ত-প্রশান্ত মুখচ্ছবি, চোখের পাতাটি পর্যন্ত কঁপছে না, ওষ্ঠ অধরের মৃদু স্ফুরণের ভিতর দিয়ে বেরিয়ে আসছে গম্ভীর নিষ্কম্প গুঞ্জরন। বাতাসের সঙ্গে মিশে গিয়ে সে আওয়াজ যেন বন্ধনমুক্ত আতরের মত সভাস্থল ভরে দিল।
গানের কথা শুনব কি, সেতারে গলায় মিশে গিয়েছে, যেন সন্ধ্যা বেলাকার নীল আকাশ সূর্যাস্তের লাল আবির মেখে নিয়ে ঘন বেগুনী থেকে আস্তে আস্তে গোলাপীর দিকে এগিয়ে চলেছে। আর পাঁচজনের কথা বলতে পারিনে–এরকমের অভিজ্ঞতা আমার জীবনে এই প্রথম। জন্মান্ধ যেন চোখ মেলল সূর্যাস্তের মাঝখানে। আমি তখন রঙের মাঝখানে ডুবে গিয়েছি— সমুদ্র, বেলাভূমি, তরুপল্লব কিছুই চোখে পড়ছে না।
ধ্বনির ইন্দ্রজালে মোহাচ্ছন্ন করে বৃদ্ধ যেন একমাত্র আমারই কানে কানে তার গোপন মন্ত্র পড়তে লাগলেন,
শবি আগর, শবি আগর, শবি আগর—
যদি এক রাত্রের তরে, মাত্র এক রাত্রের তরে, একবারের তরে—
আমি যেন চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছি, কি? কি? কি? এক রাতের তরে, একবারের তরে কি? কিন্তু বলার উপায় নেইদরকারও নেই, গুণী কি জানেন না?
আজ লবে ইয়ার বোসয়ে তলবম্
প্রিয়ার অধর থেকে একটি চুম্বন পাই
প্রথমবার বললেন অতি শান্তকণ্ঠে, কিন্তু যেন নৈরাশ্য-ভরা সুরে, তারপর নৈরাশ্য যেন কেটে যেতে লাগল, আশা-নিরাশার দ্বন্দ্ব আরম্ভ হল, সাহস বাড়তে লাগল, সবশেষে রইল দৃঢ় আত্ম বিশ্বাসের ভাষা, পাবোই পাবো, নিশ্চয় পাব।
গুণী গাইছেন লবে ইয়ার, প্রিয়ার অধর আর আমার বন্ধ চোখের সামনে কালোর মাঝখানে ফুটে ওঠে টকটকে লাল দুটি ঠোঁট, যখন শুনি বিেসয়ে তলব, যদি একটি চুম্বন পাই, তখন চোখের সামনে থেকে সব কিছু মুছে যায়, বুকের মাঝখানে যেন তখন শুনতে পাই সেই আশানিরাশার দ্বন্দ্ব, আতুর হিয়ার আকুলিবিকুলি, আত্মবিশ্বাসের দৃঢ় প্রত্যয়।
হুঙ্কার দিয়ে গেয়ে উঠলেন, জোয়ান শওম
তাহলে আমি জোয়ান হব— একটি মাত্র চুম্বন পেলে লুপ্ত যৌবন ফিরে পাব।
সভাস্থল যেন তাণ্ডব নৃত্যে ভরে উঠল— দেখি শঙ্কর যেন তপস্যা শেষে পার্বতীকে নিয়ে উন্মত্ত নৃত্যে মেতে উঠেছেন। হুঙ্কারের পর হুঙ্কার জোয়ান শওম, জোয়ান শওম। কোথায় বৃদ্ধ সেতারের ওস্তাদ–দেখি সেই জোয়ান মঙ্গোল। লাফ দিয়ে তিন হাত উপরে উঠে শূন্যে দুপা দিয়ে ঘন ঘন ঢেরা কাটছে, আর দু-হাত মেলে বুক চেতিয়ে মাথা পিছনে ছুঁড়ে কালো বাবরী চুলের আবর্তের ঘূর্ণি লাগিয়েছে।
