.
এ বছরে প্রতিটি লেখার সময় স্বামীজির কথা মনে পড়ে। তিনি যে শুষ্ককাষ্ঠ অরসিকজন ছিলেন না সেইটে এই সুবাদে মনে পড়ল। নিম্নের রসিকতাটি ঈষৎ দীর্ঘ কিন্তু জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে দীর্ঘতর শুনতেও কারও আপত্তি থাকার কথা নয়।
(মুসলমানদের শিয়া সম্প্রদায়ের কাছে গোস্তাকির বেহ মাফ চেয়ে)
লক্ষ্ণৌ শহরে মহরমের বড় ধূম। বড় মসজিদ ইমামবাড়ায় জাঁকজমক রোশনির বাহার দেখে কে। বেসুমার লোকের সমাগম। হিন্দু-মুসলমান, কেরানি য়াহুদি ছত্রিশ বর্ণের স্ত্রী-পুরুষ বালক-বালিকা, ছত্রিশ বর্ণের হাজারো জাতের লোকের ভিড় আজ মহরম দেখতে। লক্ষ্ণৌ শিয়াদের রাজধানী। আজ হজরত হাসান-হোসেনের নামে আর্তনাদ গগন স্পর্শ করছে- সে ছাতি-ফাটানো মর্সিয়ার কাতরানি কার না হৃদয় ভেদ করে? হাজার বছরের প্রাচীন কারবালার কথা আজ ফের জীবন্ত হয়ে উঠেছে। এই দর্শকবৃন্দের ভিড়ের মধ্যে দূর গ্রাম থেকে দুই ভদ্র রাজপুত তামাশা দেখতে হাজির। ঠাকুর সাহেবদের যেমন পাড়াগেঁয়ে জমিদারের হয়ে থাকে– বিদ্যাস্থানে ভয়েবচ।
সে মোসলমানি সভ্যতা, কাফ-গাফের বিশুদ্ধ উচ্চারণ সমেত লস্করি জবানের পূবৃষ্টি, আবা কাবা চুস্ত পায়জামা তাজ মোড়াসার রঙ্গ-বেরঙ্গ শহরপসন্দ ঢঙ অতদূর গ্রামে গিয়ে ঠাকুর সাহেবদের স্পর্শ করতে আজও পারেনি। কাজেই ঠাকুররা সরল সিধে, সর্বদা শিকার করে জমামরদ কড়াজান আর বেজায় মজবুত দিল।
ঠাকুরদ্বয় তো ফাটক পার হয়ে মসজিদের মধ্যে প্রবেশোদ্যত, এমন সময় সিপাহি নিষেধ করল। কারণ জিজ্ঞাসা করায় জবাব দিল যে, এই যে দ্বারপার্শ্বে মুরদ খাড়া দেখছ, ওকে আগে পাঁচ জুতা মার তবে ভিতরে যেতে পাবে। মূর্তিটি কার? জবাব এল– ও মহাপাপী ইয়েজিদের মূর্তি। ও হাজার বছর আগে হজরত হাসান-হোসেনকে মেরে ফেলে; তাই আজ এ রোদন, শোকপ্রকাশ। প্রহরী ভাবল, এ বিস্তৃত ব্যাখ্যার পর ইয়েজিদ-মূর্তি পাঁচ জুতার জায়গায় দশ তো নিশ্চিত খাবে। কী কর্মের বিচিত্র গতি! উল্টা সমঝলি রাম ঠাকুরদ্বয় গললগ্নীকৃতবাস ভূমিষ্ঠ হয়ে ইয়েজিদ-মূর্তির পদতলে কুমড়ো-গড়াগড়ি আর গদগদ স্বরে স্তুতি- ভেতরে ঢুকে আর কাজ কী? অন্য ঠাকুর আর কী দেখব? ভালা বাবা আজি দেবতা তো উঁহি হ্যায়, অস্ মারো শারোকো কী অভিত রোবত। (ধন্য বাবা ইয়েজি, এমনি মেরেচো শালাদের কি আজও কাঁদছে!!) [বেসুমার = অগুনতি; আদমশুমারি তুলনীয়। মর্সিয়া = শোকগীতি। কাফগাফের উচ্চারণ = কাফ আরবি বর্ণমালার অক্ষর ৷ আরব ইহুদি ছাড়া অন্যের পক্ষে উচ্চারণ কঠিন। গাফ উচ্চারণ সহজ। তবে কাফ-গাফ সংযুক্তভাবে সমষ্টি অর্থে ব্যবহার হয়। জবান = ভাষা। আবা কাবা = ঝোলা জামা। চুস্ত = টাইট। তাজ মোড়াসা = বাঁধা তৈরি পাগড়ি। শহরপসন্দ = শহরের সকলেই যে বস্তু পছন্দ করে। জম মরদ = জওয়ান মর্দ। ইয়েজিদ = আজকাল এজিদই লেখা হয়, কিন্তু ইয়েজিদ মূল উচ্চারণের অনেক নিকটবর্তী।]
রস তো পেলেনই, কিন্তু পাঠক স্বামীজির গল্প বলার টেকনিকটি লক্ষ করুন।
হাসির অ-আ, ক-খ
০১.
হাসির অ-আ, ক-খ।
হাসির চুটকিলা (উইট, হিউমার এনেকডোট) নিয়ে যেসব সঙ্কলন বেরোয়, সেগুলো বেশিরভাগ আপনার-আমার মতো সাধারণ জনই করে থাকে। অবশ্য এদের নির্মাতারা, অর্থাৎ যারা সব উইট বা রসিকতা প্রথম পাঁচজনকে হাসিয়ে কিংবা একজনকে চটিয়ে আর পাঁচজনকে হাসিয়ে নির্মাণ করেছিলেন, তাঁদের অনেকেই ওয়াইলডের মতো বিখ্যাত সাহিত্যিক, কিংবা হুইলারের মতো চিত্রকর নন। আবার এ কথাও অতি সত্য যে, বেশিরভাগ চুটকিলাই অতি সাধারণজনই করে থাকে– সাহিত্যে, কাব্যে, দর্শনে, এমনকি সমাজেও তারা বিখ্যাত নন। পাড়ার চায়ের দোকানে যে লোক রসিয়ে গল্প বলে, কারও কথার উত্তরে হাসির জবাব দিয়ে আর পাঁচজনকে হাসিয়ে মারে, সে লোকটি দোকানের বাইরে হয়তো কোনওকিছুতেই সার্থক হয়নি– হয়তো-বা পাড়ার মুরুব্বি তাকে বিশ্ব-বকাটে পদবি দিয়ে বসে আছেন, কারণ চায়ের দোকান থেকে ছেলের মারফত গ্রু গৃহিণী তার কয়েকটি রসিকতা তার কানে এসে পৌঁছেছে, এবং হয়তো-বা তারই মতো দু-একটি মুরুব্বিকে নিয়েই।
অথচ পৃথিবীর অধিকাংশ চুটকিলা নির্মাণ করেছে এরাই। লোকমুখে ঘুরেফিরে এ-দেশ ও-দেশ হয়ে হয়ে বিশ্বময় এরা ছড়িয়ে পড়ে। বরঞ্চ ওরই মতো যে লোকসঙ্গীত মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে, তাদেরও নির্মাতার সন্ধান কোনও কোনও স্থলে পাওয়া যায়, কিন্তু এদের বৃহৎ অংশের মূল অনুসন্ধান কেউ করে না, তবে কোনও লাভও নেই।
লোকসঙ্গীত, রূপকথার মতো এইসব হাসির চুটকিলার সৃষ্টিকর্তা প্রধানত জনগণ। অবশ্য গুণী, জ্ঞানী, রসিক সাহিত্যিকরাও এতে আপন আপন মৃদুহাস্য, অট্টহাস্য, বিদ্রূপব্যঙ্গ মিশিয়ে দিয়েছেন।
তা ছাড়া এমনসব ঘটনাও ঘটে, যা দেখে বা শুনে মনে হাস্যরসের উদ্রেক হয়। যারা ঘটনাটা দেখল বা শুনল, তাদের কারও একজনের সামান্যতম রসবোধ থাকলে এবং সে ঘটনাটি ব্রডকাস্ট করলেই হল। যেমন আইনস্টাইনের গৃহিণী ছিলেন অতিশয় সরলা নারী*। [*এঁর সরল হৃদয় সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথও আমাদের ছেলেবেলায় কিছু কিছু শুনিয়েছেন। বারান্তরে সেকথা হবে।] কী-এক পরব উপলক্ষে, স্বামী অসুস্থ বলে, তিনি নিমন্ত্রিত হয়ে একা গেছেন আমেরিকার বিশাল এক ল্যাবরেটরিতে। সেখানে দৈত্য-দানবের মতো ভীষণদর্শন বিরাট বিরাট যন্ত্রপাতি। বিমূঢ়ের মতো এটা-সেটা দেখতে দেখতে একজন কর্তাব্যক্তিকে তিনি শুধালেন, এগুলো এগুলো দিয়ে কী হয়? কর্তাব্যক্তি বিগলিত হয়ে সুমধুর মৃদুহাস্য হেসে মুরুব্বির সুরে বললেন, কেন ম্যাডাম, এইসব যন্ত্রপাতি দিয়েই তো আপনার স্বনামধন্য স্বামীর থিয়োরি সব সপ্রমাণ করা হয়। ম্যাডাম তো দশ হাত বরফপানিমে। অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে তিনি বললেন, কিন্তু কিন্তু আমার স্বামী তো এসব টোকেন পুরনো খামের উল্টো দিকে।
