বলতে না বলতে সে ঢুকে গেছে ওই মোটরের মেলায়। ওর কথা ঠিক। গাড়িগুলো যেন কাল-পরশু কেনা। আমি শুধালুম, তা গাড়িগুলো এই খোলা-মেলায় জলঝড় খাচ্ছে?
বলল, ওই তো, স্যার, রগড়। হামবুর্গে গাড়ি পাবেন সহজে– গারাজ পাবেন খুব যদি কপালের জোর থাকে। তার পর শুধাল, আপনার দেশে হাল কী রকম?
আমি বললুম, আমাদের দেশে অনেক লোক পূর্বজন্মে বিশ্বাস করে।– পূর্ব-জন্মটা কী চিজ সেটা তাকে বুঝিয়ে বলতে হল। শেষ করলুম এই বলে, সেই পূর্বজন্মে যদি অশেষ পুণ্য করে থাকো, তবে এ জন্মে তোমার কপালে মোটর থাকলে থাকতেও পারে। মোটরই যখন নেই তখন গারাজের তো কথাই ওঠে না।
পরের ঘটনা, কিন্তু এই সুবাদে বলে ফেলি। এর কিছুদিন পর গিয়েছি সেই বন শহরে যেখানে ছাত্রজীবনের কয়েক বছর কাটিয়েছিলুম। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে যেতে দেখি, সামনে অগুনতি মোটর। আমার সতীর্থ– এখন নামজাদা স্লিস্টার সঙ্গে ছিল। শুধালুম, পরবটরব আছে নাকি রে? হার আডেনাওয়ার এলেন নাকি? তিনি না কাছেপিঠে কোথায় যেন থাকেন?
শুধাল, কেন?
ওই যে অত মোটরগাড়ি।
সে তো স্টুডেন্টদের।
বলে কী! ত্রিশ-বত্রিশ বছর পূর্বে বন্ বিশ্ববিদ্যালয়ের শ-তিনেক অধ্যাপকদের ক-জনের মোটরগাড়ি আছে আমরা আঙুলে গুনে বলতে পারতুম। আর আজ!
হামবুর্গে ফিরে যাই।
আমার এক প্রবীণ বন্ধু ছিলেন আমার চেয়ে বছর পনেরো বড়। তিনি যুদ্ধের পর গত হন। উঠেছিলুম তাঁরই বিধবার বাড়িতে। তারই এক মেয়ে কথায় কথায় বলল, জানেন, আজকাল এ দেশে অনেক ছেলেমেয়ে স্টুডেন্ট থাকাকালীনই বিয়ে করে ফেলে। কাগিন্নি চললেন মোটর হাঁকিয়ে কলেজে যেমন মনে করুন মেডিকেল কলেজ। পিছনের সিটে একটি বাচ্চা, কোলে আরেকটি। কলেজে পৌঁছে ছোটটি রাখলেন ধাইয়ের জিম্মায়, অর্থাৎ ক্ৰেশে। বড়টা গেল বাগানে খেলতে।
ওদের খেলার জন্য নাকি স্পেশাল বাগান আছে। সত্যি আছে কি না সেটা আমি চোপ করার সুযোগ পাইনি। তবে একথা সত্য, এখন বেশকিছু ছেলেমেয়ে পাঠ্যাবস্থাতেই বিয়ে করে।
বললুম, আগে তো এরকম ছিল না, এখনই-বা হল কী করে?
বলল, আগে বাপ-মায়ের এত টাকা ছিল কোথায় যে ছেলেকে বলবে, তুই বিয়ে কর। নাতি পোষার পয়সা আমার আছে। আমিও বলি, সেই যখন বিয়ে করবেই একদিন, তখন শুকিয়ে শুকিয়ে পুঁইডাটাটি হয়ে যাবার কী প্রয়োজন?
আমার মনে পড়ল এক বিয়েতে স্বৰ্গত ইন্দিরা দেবী একটা জোয়ান ছোকরাকে বললেন, দেখ দিকিনি, ছেলেটা কী রকম বুদ্ধিমানের মতো বিয়ে করে ফেলল। তোরা যে পিত্তি না চটিয়ে খেতে পারিসূনে।
কিন্তু এস্থলে বলে রাখা ভালো, জর্মনিতে কোনও ছেলেই বিয়ে করে বউ নিয়ে বাপের সঙ্গে থাকে না– ভিন্ন বাসা বাঁধে।
অতএব বাপ দুটো সংসার পুষবে! এন্তের টাকা না থাকলে পারে কেডা?
কিন্তু ইতোমধ্যে আমার মাথার ভিতর দিয়ে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। তবে কি এই ভারতবর্ষে বাল্যবিবাহে আমরা পৌঁচেছিলুম এই পদ্ধতিতেই ধাপে ধাপে! কারণ জানি, অতি প্রাচীন যুগে এদেশে বাল্যবিবাহ ছিল না। তার পর বোধহয় হঠাৎ একদিন ধনদৌলত বেড়ে যায় আজ যেরকম জর্মনিতে। তখন আমরাও ছেলেছোকরাদের বিয়ে দিতে লাগলুম, তারা নিজের পায়ে দাঁড়াবার পূর্বেই। আস্তে আস্তে, ধাপে ধাপে করে গৌরীদান!
এ পৃথিবীতে নতুন কিছুই নেই।
সুখী হবার পন্থা
সুখী হবার পন্থা? সর্বনাশ! সে পন্থাটা এ অধমের যদি জানাই থাকত তবে– যাকগে। ইতোমধ্যে একটা গল্প মনে পড়ল। এক ছোকরার বিয়ে করার বড় শখ। কিন্তু কিছুতেই হয়ে উঠছে না। ওদের পরিবারে একমাত্র শ্রীহনুমানের পুজো হয় অন্য কোনও দেবতা সেখানে কল্কে পান না– তাই ত্রিসন্ধ্যা তাঁরই পুজো করে আর কাকুতি-মিনতি করে, হে ঠাকুর, আমার একটা বউ জুটিয়ে দাও। ওদিকে এরকম ঘ্যানর ঘ্যানর শুনে হনুমানের পিত্তি চটে গিয়েছে। শেষটায় একদিন স্বপ্নে দর্শন দিয়ে হুঙ্কার দিলেন, ওরে বুদ্বু, বউ যদি জোটাতে পারতুম, তবে আমি নিজে বিয়ে না করে confirmed bachelor হয়ে রইলুম কেন?
তাই বলছিলুম, সুখী হবার পন্থাটা যদি আমার জানাই থাকত তবে আমি এই টক্ দিতে যাব কেন? স্পষ্টত দেখা যাচ্ছে আমি যে ট দিচ্ছি সেটা হয় আপনাদের আনন্দ দেবার জন্য, নয় অর্থাগমের জন্য, কিংবা উভয়ত। আপনাদের আনন্দ দেবার ইচ্ছাটা তৃষ্ণাবিশেষ এবং বুদ্ধদেব সেটাকে তনহা অর্থাৎ তৃষ্ণা বলেছেন, এবং এই তন্হা থেকেই সর্ব দুঃখের উৎপত্তি। এই তন্হাজনিত দুঃখ নিবারণই সুখ। আমাদের শাস্ত্রেও আছে, ভারাদ্যপগমে সুখীসংবৃতোহহমিতিবৎ, দুঃখভাবনে সুখিতৃপ্রত্যয়াৎ। বাংলা কথায়, আমার ঘাড়ে বোঝা ছিল, সেটা নেবে যেতেই বললুম, আহা কী আরাম, এসো ক্ষুদিরাম : আহা কী সুখ, ঘুচে গেছে দুখ। অর্থাৎ দুঃখের অভাবই সুখ বলে প্রতীয়মান হয়। তাই পরদুঃখকাতর ফরাসি গুণী ভলতের এক অন্ধ মহিলাকে সান্ত্বনা দিয়ে চিঠি লেখেন, Nous avons un grand sujet a traitor : it sagit de bonheur on du monis detre le moins malheureux quon peut dans ce monde.
আমাদের আলোচনার বস্তু বিপুলাকার এবং মহত্ত্বপূর্ণ : প্রশ্ন এই, সুখী হওয়া যায় কিসে, অন্ততপক্ষে এ সংসারে অল্পতর দুঃখী হওয়া যায় কী প্রকারে?
এটাকে আরও সোজা করে বলি। এক ক্ষ্যাপা ক্রমাগত মাথায় হাতুড়ি ঠুকছে। আমি শুধালুম, ওরে পাগল, মাথায় হাতুড়ি ঠুকছিস কেন? একগাল হেসে বলল, যখন টুকি না, তখন কী আরাম! সেই সংস্কৃত প্রবচনেই ফিরে এলুম, ঘাড়ের বোঝা নেবে যাওয়াতে কী আরাম! মহাকবি হাইনেকে আমি বড্ডই শ্রদ্ধা করি, কিন্তু এস্থলে তিনি যেটা বলেছেন, সেটা আমাদের পাগলের হাতুড়ি পেটার চেয়ে অনেক ফিকে। তিনি বলেছেন, কড়া ঠাণ্ডার রাতদুপুরে লেপের তলা থেকে পা বের করতে বেজায় শীত লাগল। ফের পা দুখানা ভিতরে টেনে নিয়ে বললুম, আহ্ কী সুখ!
