কম্যুনিস্ট দেশে নাকি রাজনৈতিক কারণে গ্রেফতারি হয় অতি ভোরবেলা– এদেশে যে-রকম ১৯৪৭-এর আগে হত, আর হিটলারি জর্মনিতে তো নিজে দেখেছি। এ ব্যাপার নিয়ে নাকি ঠাট্টা-মস্করা খুব বেশি বরদাস্ত করা হয় না।
ভোর পাঁচটার সময় বাড়িওলা ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে ঘন্টা বাজিয়ে মৃদুকণ্ঠে বলছে, কমরেড, অযথা ভয় পাবেন না। আমি শুধু বলতে এসেছি, বাড়িতে আগুন লেগেছে মাত্র। কিংবা, কী বললে? ইভান ইভানোভিচ মারা গিয়েছে? কই, আমি তো তার গ্রেফতার হওয়ার খবরটা পর্যন্ত পাইনি। কিংবা খবরের কাগজে শোকসংবাদ কলামে পিতামাতা প্রকাশ করলেন, আমাদের স্বর্গস্থ সৃষ্টিকর্তা তার অসীম করুণায় আমাদের কন্যাকে কল্যাণতর লোকে নিয়ে গিয়েছেন। আপন সোশ্যালিস্ট দেশকে অপমান করার জন্য দুজনাই পরের দিন গ্রেফতার হন।
সবচেয়ে বিপজ্জনক হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক রসিকতাই সবচেয়ে বেশি আদর পায়। পূর্বেই প্রাভদা প্রসঙ্গে তার একটি নিবেদন করেছি। এগুলো সচরাচর তৈরি হয় কতকগুলো বিশেষ বিষয়বস্তু নিয়ে পার্টির দুর্নীতি, বড়কর্তাদের বিলাসব্যসন (হালে চীনও খ্রশ্চফকে গালাগাল দিয়েছে এই বলে যে, তাঁর দুখানা আপন মোটরগাড়ি আছে), ধর্মবিশ্বাসে অসহিষ্ণুতা, স্বাধীন-চিন্তার নিপীড়ন, চাষাদের বেগার খাটানো, উপরাষ্ট্র-ধর্ষণ ইত্যাদি। যারা কম্যুনিজমে বিশ্বাস করে না কিংবা কম্যুনিস্টদের কার্যকলাপে দুর্নীতি সহ্য করতে পারে না তাদের আত্মাভিমান রক্ষা করার একমাত্র উপায় ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের শরণ-নেওয়া।
এক কয়েদি আরেক কয়েদিকে, তোর কি মাথা খারাপ? আদালতে কেন স্বীকার করলি, কালোবাজারে চিনি কিনেছিস?
দ্বিতীয় কয়েদি, কী করি বল। সরকারপক্ষের উকিলই যে আমাকে চিনি বেচেছিল। কিংবা শিক্ষামন্ত্রীকে পাগল বলার অপরাধে একজনের কুড়ি বছরের জেল হয়। পাঁচ বছর হয় সরকারি কর্মচারীকে অপমান করার জন্য, বাকি পনেরো বছর রাষ্ট্রের গোপন খবর প্রকাশ করে দেবার জন্য। কিংবা,
রুশ কর্মী কথায় কথায় বলল, আমি সবচেয়ে ভালোবাসি কম্যুনিস্ট পার্টির মেম্বারদের জন্য কাজ করতে। সরকারি কর্মচারী প্রশংসা করে বললেন, বড় আনন্দের কথা। তা, আপনি কী কাজ করেন? আজ্ঞে আমি গোর খুঁড়ি।
কিংবা,
চেকোশ্লোভাকিয়া থেকে প্রাপ্ত :
খবরের কাগজের হকাররা রাস্তায় চেঁচাচ্ছে, রুশেরা চাঁদে পৌঁছে গেছে, রুশেরা চাঁদে পৌঁছে গেছে। রাস্তায় একাধিক উল্লসিত কণ্ঠস্বর, সবাই? সবাই?
কিংবা,
ট্রামগাড়ির কন্ডাক্টর : এগিয়ে চলুন, মশাইরা, এগিয়ে চলুন।
আমরা মশাইরা নই, আমরা কমরেড।
মস্করা ছাড়ুন। কমরেডরা ট্রামগাড়ি চড়েন না, তাঁরা চড়েন আপন আপন মোটরগাড়ি।
কিন্তু পূর্বেই বলেছি, এসব রসিকতা করতে হয় টাপেটোপে নিতান্ত আপনজনের মাঝখানে। নইলে —
তিন বৃদ্ধ পার্কের বেঞ্চিতে চুপচাপ বসে। তার মধ্যে দুজন ওয়াক্ থুঃ ওয়াক্ থুঃ বলে থুথু ফেলছে। তৃতীয়জন বলল, দয়া করে কোনওপ্রকারের রাজনৈতিক আলোচনা আরম্ভ করবেন না। নইলে আমাকে গোয়েন্দা বিভাগে খবর দিতে হবে।
ইংরেজিতে বলে, নীরবতা হিরন্ময়।
ইহুদিরা আসলে প্রাচ্যদেশীয় বলে বহুশত বছর ইয়োরোপে থাকার পরও তাদের রসিকতায় বিদ্রূপ ও তিক্ততা থাকে অনেক বেশি। ওদিকে হিটলার যে-রকম একদা ইহুদিদের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছিলেন, তার দশভাগের একভাগ না হলেও কমুনিস্ট দেশে ইহুদি-নির্যাতন আরম্ভ হয়ে গিয়েছে অনেক দিন। ইহুদিরাও বাধ্য হয়ে বাইরের দিক দিয়ে যতদূর সম্ভব গা বাঁচিয়ে চলে ও অন্তরে অন্তরে অন্তরীণ হয়ে থাকে।
চতুর পোলিশ ইহুদি মূর্খ পোলিশ ইহুদির সঙ্গে কীভাবে আলাপ করে?
নিউইয়র্ক থেকে, টেলিফোনযোগে। কিংবা,
সরকারি কর্মচারী ইহুদিকে বললেন, কমরেড লেভি, আপনি ফর্মে লিখেছেন, আপনার কোনও আত্মীয় বিদেশে বসবাস করে না। ওদিকে আমরা খবর পেয়েছি, আপনার আপন ভাই ইসরায়েলে বাস করে।
তা তো করেই। সে আছে আপন দেশে, আমিই তো আছি বিদেশে।
সবচেয়ে কম শুনতে পাওয়া যায় বড় পাণ্ডাদের নিয়ে রসিকতা। তার কারণ উৎপীড়িত জনেরাও অতি অল্পদিনের অভিজ্ঞতায় বুঝে যায়, যাকে নিয়ে রসিকতা করা হয়, গৌণভাবে তারই বিজ্ঞাপন করা হয় মাত্র। একথাটা উভয়পক্ষই বিলক্ষণ জানে বলে হিটলারের দক্ষিণহস্তস্বরূপ গ্যোরিঙ তাঁর সম্বন্ধে বাজারে রসিকতা চালু হওয়া মাত্রই সেটি সংগ্রহ করে রাখতেন এবং এ ধরনের রসিকতা নিজেই যে শুধু বলে বেড়াতেন তাই নয়, অন্য সকলকেও নয়া নয়া রসিকতা বানাবার জন্য টুইয়ে দিতে কসুর করতেন না।
রুশ দেশও ব্যত্যয় নয়। তাই খ্রশ্চ ইত্যাদিকে নিয়ে রসিকতার বাড়াবাড়ি নেই, তবু দু-একটি যা শুনতে পাওয়া যায় সেগুলো উপাদেয়। তারই একটি দিয়ে শেষ করি।
শীর্ষ সম্মেলন শেষ করে নিকিতা খ্রুশ্চফ ও পুলিশকর্তা (আসলে গোয়েন্দা বিভাগের সর্বাধ্যক্ষ) সাখার একসঙ্গে উড়োজাহাজে করে দেশে ফিরছেন। সাখার বললেন, কেনেডির অলঙ্কারগুলো লক্ষ করেছিলি? একদম সাচ্চা।
নিকিতা বললেন, না, কই, দে তো।* [*ভেল্টভখের (সুরিষ) ১৪৫২ সংখ্যার সাহায্যে লেখা।]
রাঁধে মেয়ে কি চুল বাঁধে না?
চীনেদের ঠেঙিয়ে বের করতে হবে, এ তো বাঙলা কথা। কিন্তু রাধে মেয়ে কি চুল বাঁধে?– এর অর্থটি সরল। যে মেয়ে রাঁধছে তার যদি খোঁপাটি তখন ঢিলে হয়ে যায় তবে সে কি রাঁধতে রাঁধতেই চুল বাঁধে না? রান্না বড়ই প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান, কিন্তু চুল বাধাটা এমন কিছু মারাত্মক অপরিহার্য শুভকর্ম নয় যে, তদভাবে বাড়িসুদ্ধ লোক মারমুখো হয়ে চেলি নিয়ে বাড়ির বউয়ের দিকে তাড়া লাগাবে। তবু বাড়ির বউ জানে, রাঁধতে হয়, চুলও বাঁধতে হয়।
