তখন লক্ষ করলুম তাদের শরবত পানের প্রক্রিয়াটা। তারা চামর তো দোলায়ই না, হাত দিয়েও গেলাসের মুখ থেকে মাছি খেদায় না। গেলাস মুখে দেবার পূর্বে সেটাতে একটু মোলায়েম ঠোনা দেয়, সঙ্গে সঙ্গে মাছিগুলো ইঞ্চি তিনেক উপরে ওঠামাত্রই গেলাসটি টুক করে টেনে এনে চুমুক লাগায়। ঘিনপিত এদের নেই।
পলও লক্ষ করে আমাকে কানে কানে শুধালে, এ লক্ষ্মীছাড়া জায়গায় এসব লোক থাকে কেন?
আমি বললুম, সে বড় দীর্ঘ কাহিনী। অর্থাৎ এদের প্রত্যেককে যদি জিগ্যেস কর তবে শুনবে, প্রত্যেকের জীবনের দীর্ঘ এবং বৈচিত্র্যময় কাহিনী।
এ সংসারের সর্বত্রই একরকম লোক আছে যারা রাতারাতি লক্ষপতি হতে চায়। খেত-খামার, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-মোকরি, কোনও কাজেই ওদের মন যায় না। অত খাটে কে, অত লড়ে কে?– এই তাদের ভাবখানা।
সিনেমায় নিশ্চয় দেখেছ, হঠাৎ খবর রটল আফ্রিকার কোথায় যেন সোনা পাওয়া গিয়েছে; সেখানে মাটির উপর-নিচে সর্বত্র তাল তাল সোনা পড়ে আছে আর অমনি চলল দলে দলে দুনিয়ার লোক সেই সোনা যোগাড় করে রাতারাতি বড়লোক হওয়ার জন্য। সিনেমা কত রঙ-চঙেই না সে দৃশ্য দেখায়! অনাহারে তৃষ্ণায় পড়ে আছে, এখানে মড়া সেখানে মড়া। কোনও কোনও জায়গায় বাপ-মা, বেটা-বেটি চলেছে এক ভাঙা গাড়িতে করে ছেলেটার মুখ দিয়ে রক্ত উঠছে, মেয়েটা ভিরমি গেছে। বাপ টিনের ক্যানাস্তারা হাতে করে ধুঁকতে ধুঁকতে জল খুঁজতে গিয়ে এ পাথরে টক্কর খেয়ে পড়ে যাচ্ছে, ও পাথরে ঠোক্কর খেয়ে জখম হচ্ছে। মায়ের চোখে জলের কণা পর্যন্ত নেই– যেন অসাড় অবশ হয়ে গিয়েছে।
এগিয়ে চলেছে, এগিয়ে চলেছে, এরা এগিয়ে চলেছে। এ ছাড়া উপায় নেই। থামলে অবশ্যম্ভাবী মৃত্যু, এগুলে বাঁচলে বাঁচতেও পার।
কজন পৌঁছয়, কজন সোনা পায়, তার ভিতর কজন জনসমাজে ফিরে এসে সে ধন ভোগ করতে পারে, তার কোনও সরকারি কিংবা বেসরকারি সেনসাস কখনও হয়নি। আর হলেই-বা কী? যাদের এ ধরনের নেশা জন্মগত তাদের ঠেকাবে কোন্ আদমশুমারি?
কিংবা হয়তো এদেরই একজন লেগে গেল কোম্পানি বানিয়ে, শেয়ার বিক্রি করে টাকা তুলতে। কেন? কোনও এক বোম্বেটে কাপ্তান কোনও এক অজানা দ্বীপে কোটি কোটি টাকার ধন নিয়ে উধাও হয়ে যায়। যে দ্বীপ খুঁজে বের করতে হবে। সেই ধন উদ্ধার করে রাতারাতি বড়লোক হতে হবে। সেই সমুদ্রে ওই দ্বীপটায় থাকার কথা সেখানে যাত্রী-জাহাজ বা মাল-জাহাজ কিছুই যায় না। সে দ্বীপে নাকি খাবার জল পর্যন্ত নেই। ওই বোম্বেটে কাপ্তান নাকি জলতৃষ্ণায় মারা গিয়েছিল, আরও কতরকম উড়ো খবর।
যে কোম্পানি খুললে, সে বলে বেড়াচ্ছে তার কাছে ম্যাপ রয়েছে ওই দ্বীপে যাবার জন্য। সাধারণ লোক বলে, কই ম্যাপটা দেখি। লোকটা বলে, আব্দার। তার পর তুমি টাকাটা মেরে দাও আর কি? কিন্তু রাতারাতি বড়লোক হওয়ার দল অতশত শুধায় না। তারা কোম্পানির শেয়ারও কেনে না– পয়সা থাকলেও কেনে না। তারা গিয়ে কান্নাকাটি লাগায় লোকটার কাছে খালাসি করে, বাবুর্চি করে আমাদের নিয়ে চল তোমার সঙ্গে। আমরা মাইনে কিছু চাইনে। কাপ্তেনও ওইরকম লোকই খুঁজছে– শক্ত তাগড়া জোয়ান, মরতে যারা ডরায় না।
তার পর একদিন সে জাহাজ রওনা হল। কিন্তু আর ফিরে এল না।
কিংবা ফিরে এল মাত্র কয়েকজন লোক। কিছুই পাওয়া যায়নি বলে এরা তাকে খুন। করেছে। তখন লাগে পুলিশ তাদের পিছনে। মোকদ্দমা হয়, আরও কত কী?
পল কাফের সেই চারটি জিবুটিবাসীর দিকে তাকিয়ে ফিস ফিস করে আমাকে শুধাল, এরা সব ওই ধরনের লোক?
আমি বললুম, না, তবে ওদের বংশধর। বংশধর অর্থে ওদের ছেলে-নাতি নয়, কারণ ও ধরনের লোক বিয়ে-থা বড় একটা করে না। বংশধর, বলছি, এরা ওই দলেরই লোক, যারা রাতারাতি বড়লোক হতে চায়। কিন্তু আজকের দিনে তো আর সোনা পাওয়ার গুজব ভালো করে রটতে পারে না তার আগেই খবরের কাগজগুলো প্লেনভাড়া করে সবকিছু তদারক করে জানিয়ে দেয়, সমস্তটা ধাপ্পা কিংবা জাহাজভাড়া করার কথাও ওঠে না। প্লেনে করে ঝটপট সবকিছু সারা যায়। হেলিকপ্টার হওয়াতে আরও সুবিধে হয়েছে। একেবারে মাটির গা ছুঁয়ে ভালো করে সবকিছুই তদারক করা যায়।
তাই এরা সব করে আফিং চালান, কিংবা মনে কর, কোনও দেশে বিদ্রোহ হয়েছে বিদ্রোহীদের কাছে বেআইনিভাবে বন্দুক-মেশিনগান ইত্যাদি বিক্রি।
যখন কিছুতেই কিছু হয় না, কিংবা সামান্য যে টাকা করেছিল তা খুঁকে দিয়েছে, ওদিকে বয়সও হয়ে গিয়েছে, গায়ে আর জোর নেই, তখন তারা জিবুটির মতো লক্ষ্মীছাড়া বন্দরে এসে দু পয়সা কামাবার চেষ্টা করে, আর নতুন নতুন অসম্ভব অ্যাডভেঞ্চারের স্বপ্ন দেখে। জিবুটির মতো অসহ্য গরম আর মারাত্মক রোগ-ব্যাধির ভিতরে কোন সুস্থ-মস্তিষ্ক লোক কাজের সন্ধানে আসবে? কিন্তু এদের আছে কষ্ট সহ্য করার অসাধারণ ক্ষমতা। তাই এদের জন্য এখানে কিছু একটা জুটে যায়। এই যেমন মনে কর, এখান থেকে যে রেললাইন শুরু হয়ে আবিসিনিয়ার রাজধানী আদ্দিস-আবাবা অবধি গিয়েছে প্রায় পাঁচশো মাইলের ধাক্কা– সে লাইনে তো নানারকমের কাজ আছেই, তার ওপর ওরই মারফতে ব্যবসা-বাণিজ্য যা হবার তা-ও হয়। ওইসব করে, আর একে অন্যকে আপন আপন যৌবনের দুঁদেমির গল্প বলে।
