বাইরের জানোয়ারগুলোর জ্বালায় অস্থির হলে আমি হামেশাই চিড়িয়াখানায় যাই। খুদখেয়ালি অর্থাৎ আত্মচিন্তার জন্য জায়গাটি খুব ভালো। তা সেকথা যাক।
সয়াজী রাও বহু জানোয়ার এনেছেন বহু দেশ ঘুরে। পৃথিবীটা তিনি কবার প্রদক্ষিণ করেছেন, তার হিসেব তিনি নিজেই ভুলে গিয়েছেন। একবার বিলেত যাবার সময় তার পরিচয় হল হাবশী দেশের রাজা হাইলে সেলাসিসের সঙ্গে।
আমাদের দেশের লোক সাদা চামড়ার ভক্ত। যে যত কালো সাদা চামড়ার প্রতি তার মোহ তত বেশি, ইয়োরোপে নাকি কালো চামড়ার আদর ঠিক সেই অনুপাতে। একমাত্র হাবশীরাই শুনেছি আপন চামড়ার কদর বোঝে। তাই সায়েবদের দিকে তারা তাকায় অসীম করুণা নিয়ে—আহা, বেচারিদের ও-রকম ধবলকুষ্ঠ হয় কেন?
সয়াজী রাও-এর রঙ কালো। হাবশী রাজা প্রথম দর্শনেই বুঝে ফেললেন, আমাদের মহারাজার খানদান অতিশয় শরীফ। কোনো রকমের বদ-জাত ধলা খুন তার কুলজিঠিকুজিতে কভি-ভী দাখিল হতে পারেনি। এ খুনের জন্য আমীর-ওমরাহ, নোকরখিদমৎগার আপন খুন বহাতে হামেহাল হরবকত হাজির।
হাবশী-রাজ সয়াজী রাও-এর দরাজদিলের নিশানও ঝটপট পেয়ে গেলেন। জাহাজেই রাজার জন্মদিন পড়েছিল-সয়াজী রাও তাকে একখানা খাসা কাশ্মীরি শাল ভেট দিলেন। হাবশীরাজ সে-শাল পেয়ে খুশির তোড়ে বে-এক্তেয়ার। জাহাজময় ঘুরে-ফিরে সবাইকে সে-শাল দেখালেন, লালদরিয়ার গরমিকে একদম পরোয়া না করে সেই লাল শাল গায়ে দিয়ে উদ্বাহু হয়ে নৃত্য করলেন। চোরচোট্টার ভয়ে শেষতক তিনি শালখানা কাপ্তান সায়েবের হাতে জিম্মা দিলেন।
হাবশী-রাজও কিছু নিকৃষ্টি মনুষ্য নন। সয়াজী রাও-এর দিন-তোড় মহব্বতের বদলে তিনি কী সওগাত দেবেন সে বাবতে বহুৎ আন্দিশা করেও তিনি কোনো ফৈসালা করে উঠতে পারলেন না। তাঁর রাজত্বে আছেই বা কী, দেবেনই বা কী? দুশ্চিন্তায় হাবশী রাজার কালো মুখ আরো কালো হয়ে গেল।
আমি বললুম, অসম্ভব! আমি মিশরে থাকার সময় বিস্তর হাবশী দেখেছি। তারা খানদানী নয়—তাদের মুখই আরো কালো করা যায় না, খুদ হাবশী-রাজের কথা বাদ দিন।
মৌলবীসাহেব রাগ করে বললেন, ঝকমারি! হাজার দফা ঝকমারি তোমাদের মতো বদরসিককে গল্প বলা। পঞ্চম জর্জের রঙ তো ফর্সা, তবে কি ভয় পেলে তার রঙ আরো ফর্সা হয় না?
আমি ‘আলবৎ আলবৎ’ বলে মাপ চাইলাম।
মৌলবীসাহেব বললেন, ‘শেষটায় হাবশীরাজ মহারাজের সেক্রেটারির সঙ্গে ভাব জমিয়ে বহুৎ সওয়াল-জবাব করলেন আর মনে মনে একটা ভেট ঠিক করে নিলেন।
সে বৎসর গরম পড়েছিল বেহদ। লু চলেছিল জাহান্নমের হাওয়া নিয়ে, আর আকাশ থেকে ঝরছিল দোজখের আগুন। সয়াজী সরোবরের বেবাক নিলুফরী পানি খুদাতালা বেহেশত বাসিন্দাদের জন্য দুনিয়ার মাথট হিসেবে তুলে নিয়েছিলেন, আর বরোদার জৈনরা পাখিদের জন্য গাছে গাছে জল রেখেছিল হাজারো রুপিয়া খর্চা করে। শুকনো গরমের জুলুমে আমার দাড়ি-গোঁপ পর্যন্ত যখন পট-পট করে ফেটে যাচ্ছিল এমন সময় শহরময় খবর রটলো, হাবশী বাদশাহ হাইলে সেলাসিস মহারাজা স্যজী রাওকে এক জোড়া সিংহ-সিংহী তোফা পাঠিয়েছেন—তার মুল্লুকের সবচেয়ে বড় জানোয়ার। হিজ হাইনেস সয়াজী রাও মহারাজ, সেনা-খাস-খেল বাহাদুর, ফরজন্দ-ই-দৌলত-ইইনকলিসিয়া, শমশের জঙ্গ বাহাদুরের কদমের ধুলো হবার কিস্মাৎ এদের নেই, তবু যদি মহারাজ মেহেরবাণী করে এদের গ্রহণ করেন, তবে হাবশী বাদশাহ বহুৎ, বহুৎ খুশ হবেন।
সেই গরমের মাঝখানে খবরটা রটল আগুনের মততা। আর গুজোব রটল ধুয়োর মতো বা তার চেয়েও তাড়াতাড়ি। কেউ বলে, ‘ওরকম জোড়া-সিংগি লন্ডন শহরের চিড়িয়াখানাতেও নেই, কেউ বলে, হাবশী বাদশা খাস ফরমান দিয়ে মানুষের মাংস খাইয়ে খাইয়ে এদের তাগড়া করিয়েছেন, কেউ বলে, এদের গর্জনের চোটে জাহাজের তাবৎ লস্কর-সারেঙ বদ্ধ কালা হয়ে গিয়েছে। আরো কত আজগুবি কথা যে রটলো তার ঠিক-ঠিকানা নেই।
সয়াজী রাও যে খুশ হয়েছিলেন সে সংবাদটাও শহরে রটলো। চিড়িয়াখানার ম্যানেজারের উপর হুকুম হল হাবশী সিংগির জন্য খাস হাবেলি তৈরি করবাব। কামাররা সব লেগে গেল খাঁচা বানাতে—দিনভর দমাদ্দম লোহা পেটার শব্দ শুনি, আর শহরের ছোঁড়ারা তখন থেকেই খাঁচার চতুর্দিকে ঝামেলা লাগিয়ে মেহমানদের তসবির-সুরৎ নিয়ে খুশ-গল্প জুড়ে দিয়েছে।
ম্যানেজার বোম্বাই গেলেন সিংগিদের আদাব-তসলিমাত করে বরোদা নিয়ে আসার জন্য। সেখান থেকে তারে খবর এল মেহমানরা কোন গাড়িতে বরোদা পৌঁছবেন। সেদিন শহরের ছ’আনা লোক স্টেশনে হাজিরা দিল— হুজুরদের পয়লা নজরে দেখবার জন্য। হাবেলিতে যখন তাদের ঢোকানো হল, তখন শহরের আর বড় কেউ বাদ নেই। সয়াজী মহারাজ শুনলেও গোসা করবেন না বলে বলছি, খুদ তাকে দেখবার জন্যও কখনো এরমধারা ভিড় হয়নি।
আমিও ছিলুম। আর যা দেখলুম তার সামনে দাঁড়াবার মতো আর কোনো চীজ আমি কখনো দেখিনি। আমার বিশ্বাস এ-জোড়া সিংগি দেখার পর আর কেউ খুদাতালায় অবিশ্বাস করবে না। তোমরা কী সব বলল না, নেচার নেচার—সব কিছু নেচার বানিয়েছে—
আমি বাধা দিয়ে বললুম, আমি তো কখনো বলিনি।
মৌলবীসাহেব ট্যারচা হাসি হেসে বললেন, ‘সিংগি দুটোর সামনে কাউকে আমি বলতেও শুনিনি। তোমাদের ঐ নেচার কোন কোন জিনিস পয়দা করেছেন জানিনে, কিন্তু এরকম সিংগি বানানো তার বাপেরও মুরদের বাইরে।
কী চলন, কী বৈঠন, ক্যা পশম, ক্যা গর্দন! পায়ের নখ থেকে দুমের লোম পর্যন্ত সব কুছ গড়া হয়েছে, স্রেফ এক চীজ দিয়ে—তাকৎ! খুদার কেরামতি বুঝবে কে, তাই তাজ্জব মেনে বার বার তাকে জিজ্ঞেস করি, এ রকম মাতব্বরকে তুমি এ-দুনিয়ার রাজা না করে মানুষের হাতে সব কিছু ছেড়ে দিলে কেন?
