এত দিন পীরপুরের এই বটগাছকে ঘিরিয়া কত ঘটনা ঘটিয়া গেল, আরও কত ঘটিবে কে জানে! এতকাল এই গাছ গ্রামের দুইপুরুষ দেখিয়াছে, আরও দেখিবে।
১৮৫৭ সালে কানপুরে সিপাহিবিদ্রোহের আগুন জ্বলিয়া উঠিল, ধীরেধীরে তাহা সারা ভারতবর্ষে ছড়াইয়া পড়িল, বাংলায়ও সে ঢেউ আসিয়াছিল। সেই বিপ্লবের আগুন এত তীব্র হইয়াছিল যে শাসনযন্ত্রের চাকাও নড়িয়া উঠিয়াছিল। ঐতিহাসিকগণ এমন কথাও বলেন, সেই বিপ্লবের যাঁরা পরিচালক ছিলেন, তাঁহাদের মধ্যে আর যা কিছুরই অভাব থাকুক আর নাই থাকুক শৃঙ্খলার অভাব যথেষ্টই ছিল; তাই আজও আমরা ইংরেজের আমল দেখিতেছি। সেই বিদ্রোহের ইতিহাসকে আজও লোকে কালা-গোরার যুদ্ধ বলিয়া স্মরণ করে। বিদ্রোহ দমনের দৃশ্য তাহারা অনেক দেখিয়াছে বটে কিন্তু মুখ ফুটিয়া বলিতে সাহস করে না। তখন সিপাহিদের কুকুরের মতো তাড়া করা হইত। অনেক ভারতবাসী তাহা প্রত্যক্ষ করিয়াছে।
একদিন একটা সিপাহি পীরপুরের বটগাছে আসিয়া আশ্রয় লইল। সে যেন কোনো পলায়নপর সিংহ, পলাইতেছে বটে, কিন্তু তবু তাহার চোখদুটি জ্বলজ্বল করে। মুখের রঙ গৌর, পেশিবহুল শরীর, হাত-পায়ে অপরিষ্কার কাদামাটির দাগ, পোষাক ক্ষতবিক্ষত, লোকটা একটা দিন সেই গাছের উপর লুকাইয়া রহিল। দুই একজন যাহারা তাহাকে দেখিয়াছে, অনেককাল তাহাকে ভুলিতে পারে নাই, সে ওইভাবে পলাইয়াও অত্যাচারীর হাত হইতে রেহাই পাইয়াছিল কি না জানা যায় নাই।
তারপর আরও কয়েকটা বছর কাটিয়াছে। চিরকাল একই রকম যায় না। গ্রামে একবার ভয়ানক বসন্ত দেখা দিল। এমন একটি ঘর রহিল না যেখানে অন্তত একটিও বসন্তের রোগী নাই। প্রায় কোনো রাত্রিশেষে বা সন্ধ্যার অন্ধকারে ঘন-ঘন হরিধ্বনি শোনা যাইতে লাগিল। হঠাৎ শুনিলে গায়ে কাঁটা দিয়া ওঠে। নদীর পারের জল আর আকাশ শ্মশানের অগ্নিশিখায় লাল হইয়া গেল।
এমন চরম অসহায়তার দিনে গ্রামের অধিষ্ঠিত দেবতার কাছে প্রার্থনা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নাই। গ্রামের সকলে আবার হাঁটু গাড়িয়া বসিল গাছের নীচে, প্রাণপণে প্রার্থনা করিতে লাগিল। কী কারণে দেবতা রাগ করিয়াছেন কে জানে। সমস্ত গ্রামবাসী মিলিয়া দেবতার পায়ে ধরিয়া ক্ষমা চাহিয়া বলিল, হে দেবতা ক্ষমা করো। কোনোদিন না বুঝিয়া কী ভুল করিয়া ফেলিয়াছি, তুমি পিতা হইয়া তাহা ক্ষমা করো।
দেবতার পায়ের কাছে শত শত পাঁঠা বলি দেওয়া হইল, মাটিতে রক্তের নদী বহিয়া গেল। দেবতাকে একবার রাগাইলে আর উপায় নাই, অনেক মূল্য দিয় তবে সেই রাগ থামাইতে হয়। এমন অনেক বিপদ-আপদে যিনি পাশে আসিয়া দাঁড়ান তাঁহাকে মাঝেমাঝে খুশি না করিলে চলে না।
এদিকে দিনের পর দিন কাটিতে থাকে। আজ যা অতি আড়ম্বরে ঘটে, কাল তা মনেও থাকে না। কিছুই ধরিয়া রাখিবার উপায় নাই।
ধীরে ধীরে দেশে বণিকদের নিজেদেরই প্রয়োজনে রেলপথের বিস্তার হইতে লাগিল। তাতে সাধারণ লোকেরও কিছু উপকার হইলে বটে কিন্তু সেই কিঞ্চিৎ উপকারের বদলে যতখানি অপকারের অভিশাপ আসিয়া দেখা দিল, সেই কারণে শুধু মালিকদেরই দোষ দেওয়া চলে। একটা যন্ত্রের কাছে যখন একটা ভয়ানক সুখের আশা করা অন্যায় নয়, সেখানে এই অভিশাপের ইতিহাস বড়োই করুণ! দেখা গেল, প্রতি ঘরে ম্যালেরিয়া বিরাজ করিতেছে এবং তাহার প্রতাপে প্রত্যেক মানুষকে হাতের মুঠায় প্রাণ লইয়া ফিরিতে হয়। এমনকী ইহাতে শঙ্করও যে গ্রামের সকলকে ফাঁকি দিয়া চলিয়া যাইবে, ইহা অভাবনীয় হইলেও অস্বাভাবিক নয়।
সম্প্রতি চোরের মতো চুপি চুপি লক্ষ করিলে দেখা যায়, সাদা কাপড় পরণে কে একটি মেয়ে প্রায়ই কোনো নির্জন সন্ধ্যায় অথবা গভীর রাত্রে সেই বটগাছের নীচে
আসিয়া মাথা ঠুকিয়া কাঁদিতে থাকে। খোঁজ করিলে জানা যায়, সে শঙ্কর ভুই মালীর স্ত্রী সুকুমারী।
শঙ্কর তো এই সেদিনও সশরীরে বাঁচিয়া ছিল। তাহার মতো জোয়ান শরীর হাজারে একটা মেলে। সকলেই তাহাকে ভয় করিয়া চলিত। এ ছাড়া ঘর তৈয়ারি করিতে এমন ওস্তাদ এ অঞ্চলে আর দ্বিতীয় নাই। সেদিন সে গিয়াছিল মাধবদি-র হাটে, সন্ধ্যার কিছু পরে হাট হইতে ফিরিয়া আসিয়াই সে লম্বা হইয়া পড়িল, বলিল বউ, একটা কাঁথা দে, জ্বর আইল বুঝি।
সুকুমারী ব্যস্ত হইয়া ঘরে ঢুকিয়া বলিল, আবার কী সর্বনাশ আইছে কে জানে। তোলা একখানা কাঁথা বাহির করিয়া সে শঙ্করের উত্তপ্ত শরীরে তাড়াতাড়ি বিছাইয়া দিল। হাত দিয়া কপাল পরীক্ষা করিয়া বলিল, ওগো মাগো গাও যে পুইড়া গেল।
জ্বরের ঘোরেও শঙ্করের দুষ্টামি বুদ্ধি যায় না। তাহার হাতখানা সরাইয়া সে বলিল, এমনে জ্বর দেখে না।
কেমনে? সুকমারী তাহার কপালে নিজের গাল রাখিয়া বলিল, এমনে?
শঙ্কর তাহার গরম ঠোট দুটি সুকুমারীর ঠাণ্ডা গালে ঘষিয়া জড়িতস্বরে বলিল
সুকুমারী হাসিয়া ফেলিল, তাহার গালে মৃদু একটা চড় মারিয়া বলিল, এই বুঝি জ্বরের রুগীর মতন কথা?
তারপর জ্বর আরও বাড়িয়া চলিল। সেদিনের রাত্রিটা মোটামুটি ভালোই গিয়াছিল। সুকুমারীকে বেশি জাগিতে হয় নাই। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দিনও ভালোই গেল। চারদিনের দিন বিছানা হইতে উঠিয়া শঙ্কর বলিল, বউ, তাড়াতাড়ি ভাত বসাইয়া দে, আমি আজই ভাত খামু। শঙ্কর সত্যই স্নান করিতে চলিল। ব্যাপার দেখিয়া সুকুমারীর দুই চক্ষু স্থির। সে তাহার হাত ধরিয়া বলিল, এমন করলে আমি গলায় দড়ি দিয়া মরুম। তাড়াতাড়ি যাও, শুইয়া থাক গিয়া, জ্বর অহনও ছাড়ে নাই।
