শঙ্করের স্বভাবটা চিরকালই এমনি। কেবল সুকুমারীর আশ্রয়েই সে যেন মানুষের মতো চলিতে পারে, নইলে কোথায় ভাসিয়া যাইত কে জানে!
মারা যাওয়ার আগের দিন এক কান্ড ঘটিল। রাত্রি তখন অনেক। শঙ্কর হঠাৎ চোখ মেলিয়া ডাকিল, বউ?
সুকুমারী তাহার মুখের উপর ঝুকিয়া বলিল, কও?
শঙ্কর আবার ডাকিল, বউ?
সুকুমারী বলিল, কী? কও না গো?
শঙ্কর তাহার কোলে মুখ গুঁজিয়া বলিল, উঁ।
সুকুমারী তবু বুঝিতে পারে না, সস্নেহে তাহার মাথায় হাত বুলাইয়া বলিল, কী অইছে গো?
তবু তাহার কোলের ভিতর মুখ গুঁজিয়া শঙ্কর গোঁঙাইতে থাকে, বিড় বিড় করিয়া একমনে কী বলে।
কী একটা কথা মনে হওয়ায় সুকুমারী হঠাৎ ফিক করিয়া হাসিয়া ফেলিল, তাহার মুখটি বুকের কাছে টানিয়া আনিয়া বলিল,-ছিঃ, এমুন পোলাপানের মতন করে না। তোমার যে জ্বর গো!
শঙ্কর বলিল, না, জ্বর না, আমার জ্বর না।
-তুমি একটা পাগল। গাও পুইড়া যায় জ্বরে, তবু,–
সুকুমারী কী করিবে ভাবিয়া পায় না, তাহাকে আরও জড়াইয়া ধরিয়া তাহার মুখের কাছে নিজের মুখটি লইয়া সে বলিল, এই লও, খালি চুমা দাও।
কিন্তু শঙ্কর তাহার মুখ ফিরাইয়া লইল, একেবারে পাশ ফিরিয়া শুইল। এবং পরদিনই সে মারা গেল।
সুকুমারী ইহার পর আর কী করিতে পারে? ঘরের এককোণে মুখ গুঁজিয়া সে পড়িয়া রহিল, কাঁদিতে কাঁদিতে চোখমুখ তাহার ফুলিয়া গেল, কেবলই মনে হইতে লাগিল, মৃত্যুর আগে শঙ্কর কী একটা জিনিস তাহার কাছে চাহিয়াছিল।
অথচ সে দেয় নাই, হায়, সে কেন রাজি হয় নাই? এমন কঠিন কিছু নয় তো যে কিছুতেই দেওয়া চলে না, হায়, কেন রাজি হয় নাই সে! কাঁদিতে কাঁদিতে সুকুমারীর যে দমবন্ধ হইয়া আসে, আর ভাবিতে পারে না সে।
ইহার পর হইতেই তাহাকে অনেক নির্জন সন্ধ্যায় অথবা গভীর রাত্রে সেই দেবাংশী বটগাছের নীচে মাথা কুটিয়া কাঁদিতে দেখিতে পায়। এমন সাদা কাপড় পরা একটা মূর্তিকে হঠাৎ দেখিলে মনে প্রথমে ভয়ই জাগে, কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই সে ভুল ভাঙে। একটা চাপা কান্নার শব্দ কানে আসিতে থাকে এবং তখন মনে হয়, ওই সাদা কাপড়-পরা মেয়েটি শঙ্করের সদ্যবিধবা স্ত্রী সুকুমারী ছাড়া আর কেহ নয়।
তারপর আরও অনেকগুলি বছর কাটে। অনেক পরিবর্তন এবং তার দ্বিগুণ সম্ভাবনা লইয়া বিংশ শতাব্দী দেখা দিল। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে বাংলার রাজনৈতিক জীবনে চেতনা আসিল, সুরেন্দ্রনাথ দেবতার আসনে প্রতিষ্ঠিত হইলেন, অনেক যুবক তাঁহার গাড়ি টানিয়া কৃতার্থ বোধ করিল। তারপর পৃথিবীতে মহাসমর বাধিতেও আর বাকি থাকে না। ভারতবর্ষে সেই যুদ্ধের যাহারা প্রতিবাদ করিল তাহারা জেলে গেল, আর যাহারা করিল না তাহারা এই বলিয়া আত্মপ্রসাদ লাভ করিল যে যুদ্ধের পর কিছু পাওয়া যাইবে।
কিন্তু বাহিরে যাহাই ঘটুক, পীরপুরের তার ছোঁয়াচটুকুও লাগে না, সে তার বটগাছের মতোই নির্বিকার, নির্বিকল্প।
এমনসময় এক সুদর্শন সুবেশ ভদ্রলোককে পীরপুরের নদীর ঘাটে আসিয়া নৌকা হইতে নামিতে দেখা গেল। তিনি এ গাঁয়ের বিশিষ্ট জামাই; বছর বছর স্ত্রী বাপের বাড়ি আসিলে তিনিও বছর বছর আসিয়া দেখা দেন। তাঁহার হাতে কী একখানা কাগজ, অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে তিনি তাহা পড়িতেছিলেন, নৌকা পারে লাগিতেই আবার গুটাইয়া লইলেন এবং লাফ দিয়া পারে নামিয়া পড়িলেন। কিছু দূরেই বটগাছের নীচে পনেরো ষোল বছরের এক বালক গভীর মনোযোগে ইহা লক্ষ করিতেছিল। সে এ গাঁয়েরই ছেলে। ভদ্রলোক কাছে আসিতে সে তাঁহার দিকে চাহিয়া মুচকিয়া একটু হাসিল, ভদ্রলোকও হাসিলেন, তারপর সে তাঁহার পিছু লইল।
ভদ্রলোক ডান হাতে ছড়ি ঘুরাইতে ঘুরাইতে যে বাড়িতে গিয়া প্রথম ঢুকিলেন, সে বাড়ির অবস্থা মোটের উপর ভালোই। তাঁহাকে দেখিয়া কয়েকটি ছেলেমেয়ে জামাইবাবু, জামাইবাবু, বলিয়া কলরব করিয়া উঠিল। কিছুক্ষণ পরে এক প্রৌঢ়া মহিলা ঘর হইতে বাহির হইয়া আসিলেন। এবং আরও লক্ষ করিলে দেখা যাইত, বাখারির বেড়ার ফাঁক দিয়া আঠারো উনিশ বছরের একটি মেয়েও চুপি চুপি চাহিয়া কী দেখিতেছিল।
সেই ছেলেটি হঠাৎ ঘরে ঢুকিয়া বলিল, মৃণালদি জামাইবাবু এসেছেন। আমি বলেছিলাম আজ আসবেন? মৃণাল হাসিয়া বলিল, হ্যাঁ, সতু, বলেছিলি।
ওদিকে জামাই-বেচারীকে নানারকম আদর-যত্নে রীতিমতো ঘায়েল করা হইতেছে।
একসময় চুপি চুপি সেখানে গিয়া সতু কাগজখানা খুলিয়া বসিল। কাগজখানা একটি পত্রিকা। সতু প্রথমেই দেখিল, কোনো এক জালিয়ানওয়ালাবাগ নামক জায়গায় এক ভীষণ হত্যাকান্ড হইয়াছে, বড়ো বড়ো অক্ষরে তারই বিশদ বিবরণ দেওয়া। কয়েক হাজার লোকের একটা মিটিং হইতেছিল, হঠাৎ দেখা গেল চারিদিকে সুসজ্জিত অশ্বারোহী সৈন্যে ভরিয়া গিয়াছে। তাহারা সেই বিপুল জনমন্ডলীর চারিদিকে ঘিরিয়া নির্মমভাবে গুলি চালাইল। চার-শ লোক সেখানেই মারা গেল, এ ছাড়া আরও কত লোক যে শুধুই আহত হইয়াছিল, তার ইয়ত্তা নাই।
ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত বিরল। পড়িতে পড়িতে সতুর গা-জ্বালা করিল, কখনো মুষ্টি দৃঢ় হইল, এমনকি সে কাঁদিয়া ফেলিল।
এবং ইহার কয়েক বছর পরেই দেখা গেল, এক শুভ অপরাহ্নে গ্রামের একমাত্র এবং শ্রেষ্ঠ পত্রিকাপাঠক শ্রীযুক্ত মনোহর চক্রবর্তী সমস্ত গ্রামজুড়িয়া শুধু এই কথাই প্রচার করিয়া বেড়াইতেছেন যে তাঁহাদেরই পীরপুর গাঁয়ের রাজেন মিত্তিরের ছেলে সতীন মিত্র শহরের কোন এক সাহেবকে মারিতে গিয়া নাকি ধরা পড়িয়াছে।
