খুব দ্রুত পদক্ষেপের মতো অনেকগুলি দিন কাটিয়া গেল। কিন্তু একসময় বিদায়ের পালা আসে। একদিন চমৎকার সাজিয়া এক বিদেশগামী নৌকায় অর্জুন চড়িয়া বসিল। দূর হইতে দারুণ চোখের জলে ভিজিয়া চম্পক দেখিল, বীরকুমার আবার যুদ্ধে যাইতেছে, এবারও সে জয়লাভ করিবে নিশ্চয়।
নদীর মাঠ হইতে কিছুদূরেই সেই বটগাছ। এখন কিছুটা বড়ো হইয়াছে। পাতাগুলি কচি, চমৎকার, চকচক করে। রোদ খুব তীব্র হইয়া উঠিলে ভাঙা ভাঙা ছায়া মাটিতে পড়ে। দু-একটি ডালের ভিতর দিয়া সুতার মতো সরু শিকড় বাহির হইয়া গিয়াছে। গাছের গোড়ার দিকটা সিঁদুরে লাল, আর সেই গোড়ার মাটিও প্রচুর দুধ আর তেল খাইয়া কালো রঙ ধরিয়াছে। মাঝে মাঝে দেখা যায়, এই গাছের নীচে একটি মেয়ে আসিয়া দাঁড়ায়, তাহার চুল এলোমেলো-চোখ দুটি কাহার প্রতীক্ষায় আকুল। সে চম্পক। চম্পক মাটিতে কপাল ঠেকাইয়া সেই দেবাংশী গাছের উদ্দেশে অনেক প্রার্থনা জানায়, বিড়বিড় করিয়া বলে, জয়ের মালা পরিয়া তাহার অর্জুন যেন শীগগিরই ফিরিয়া আসে, সে আবার তাহাকে বরণ করিয়া লইবে, তাহার বুকের ছায়ায় সেই বীরকে আশ্রয় দিবে। চম্পকের বুকের ভিতরটা হঠাৎ কেমন করিয়া উঠিল, স্তনের ভিতরও কেমন একটা যন্ত্রণা, দুই হাতে সে তাহার স্তন চাপিয়া ধরিল।
চম্পক নদীর পারে আসিয়া দাঁড়ায়, চোখ ছোটো করিয়া বহুদূর পর্যন্ত চাহিয়া থাকে, চোখের দৃষ্টি কখনো ভাঙিয়া আসিলেও সে নিজে কখনও ভাঙে না, বর্ষায় ক্ষিপ্ত নদীর ঢেউ পায়ের উপর আসিয়া আছাড় খায়, বর্ষা যায় শীত আসে, শীত যায় আবার বর্ষা আসে,তবু অর্জুন আসে না, বছরের পর বছর ঘুরিয়া গেল, বটগাছ আরও বাড়িয়া ডাল-পালা মেলিয়া মাটিতে দীর্ঘতর ছায়া বিস্তার করিল, গ্রামের কোথাও দারুণ জঙ্গলে ভরিয়া গেল, কোথাও মানুষের পদক্ষেপে পরিষ্কার হইল, গ্রামে আবার বাঘ দেখা দিল, অনেক ছাগল-বাছুর খাইল তবুও অর্জুন আসে না। পলাশির যুদ্ধক্ষেত্রে স্বাধীনতার লড়াই করিয়া সে প্রাণ দিয়াছে।
নদীর পারে দাঁড়াইয়া থাকিতে থাকিতে চম্পকের শরীরও একদিন ভাঙিয়া আসে, সে আর দাঁড়াইয়া থাকিতে পারে না। একদিন দেখা দিল, রাজকুমার মন্ডলের মেয়ে চম্পক নদীর বিক্ষুব্ধ জলে ঝাঁপাইয়া পড়িয়াছে, প্রাণপণে সে সাঁতরাইতেছে। নদীর ঢেউ-এর আঘাতে খোঁপা তাহার খুলিয়া গেল, জলের তালে তালে নাচিতে লাগিল, চম্পক সেই যে জলে নামিয়াছিল, আর ফিরিয়া আসে নাই।
তারপর ১৭৬৯ সাল। সেবার বাংলার আকাশে এক গভীর দুঃস্বপ্ন দেখা দিয়াছিল। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের কথা আজও লোকে অত্যন্ত ভয়ে ভয়ে স্মরণ করে। এই সভ্যতার দিনে এক যুদ্ধ ছাড়া আর কোনো উপায়ে এমন প্রাণহানি ঘটিয়াছে কি না সন্দেহ। না খাইতে পাইয়া সেবার বাংলার এক-তৃতীয়ংশ লোক মরিয়া গেল। শুধু মরিয়া গেল বলিলে মৃত্যুটা বড়ো সহজই শোনায়। সেই মৃত্যুর দৃশ্যগুলি এত করুণ আর এত ভয়াবহ যে শুনিলে শরীরে কাঁটা দিয়া ওঠে। তবু অত্যাচারের সীমা নাই। তখন রাজত্ব আদায়ের যাহারা মালিক, তাহারা আরও দ্বিগুণ উৎসাহে এবং পরিমাণে রাজস্ব আদায় করিতে লাগিল। তাহাদের অত্যাচারে লোকে ঘর ছাড়িয়া পালাইল, স্ত্রী-কন্যা বেচিয়া খাইল, অথবা আত্মহত্যা করিয়া বাঁচিল। সাধারণ কুকুরও সেদিন ক্ষুধায় কাতর হইয়া মানুষকে তাড়া করিতেছে। এমন দিনে পীরপুরের লোকগুলির অবস্থাও কম ভয়ানক নয়। সারা গাঁয়ে দিনের বেলায়ও টুশব্দটি শোনা যায় না। কারোর মুখে কোনো কথা নাই, সকলেই কেবল একে অন্যের দিকে হাঁ করিয়া তাকাইয়া থাকে, তাহারা আজ কাঁদিতেও ভয় পায়। মাঝে-মাঝে কেবল কুকুরের কাতর ডাক শোনা যায়। কুকুরের ডাক আজ মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ। সেখানকার বৃদ্ধরা তখন কেবল তাহাদের দীর্ঘ, শীর্ণ আঙুল দিয়া মাটিতে আঁক করিতেছে, প্রৌঢ়রা আর কোনো উপায় না দেখিয়া স্ত্রীর মাংসপিন্ডকেই জীবনের সার বলিয়া জানিল, যুবকেরা মাঠে মাঠে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। মেয়েদের বেণী রচনায় আর সাধ নাই, কপালে টিপ দিতে আর পায়ে আলতা পরিতেও ইচ্ছা জাগে না।
একদিন এই দুর্ভিক্ষপীড়িতের দল সেই বটগাছের নীচে আসিয়া সমবেত হইল, বড়ো বড়ো উস্কখুস্ক চুলেভরা অনেকগুলি মাথার সেই ভোলা জায়গাটি ভরিয়া গেল, সেই মাথাগুলি কোনো গভীর প্রার্থনায় নতমুখী। দেবাংশী গাছের দিকে চাহিয়া তাহারা অনেক প্রার্থনা করিতে লাগিল।
তারপর আরও অনেকগুলি বছর কাটিয়ে গিয়াছে, প্রায় একশ বছরের কাছাকাছি, এতদিনে পৃথিবীর অনেক পরিবর্তন ঘটিয়াছে, পীরপুরেরও। আগে যাহারা ছিল, এখন তাহারা নাই। এখন যাহারা আছে তাহারা আর একদল লোক! কিন্তু তাহাদের রক্তে একই মানুষের রক্তের প্রবাহ বহিতেছে। সেই বট গাছকেও আর চিনিবার জো নাই। একদিন যা ছিল নিতান্ত শিশু, সে এখন বড়ো হইয়া প্রকান্ড ছায়া বিস্তার করিতেছে। পাতাগুলি এত ঘন যে আকাশও অনেকসময় দেখা যায় না। এখানে-সেখানে মোটা-মোটা শিকড়, মাটির রস পান করিতে অতৃপ্তি নাই। গাছের ছায়া এত নিবিড় যে গ্রামের ছেলেরা ইহার নীচে বসিয়া আড্ডা মারে, শীতকালে এখানে বসিয়াই আগুন পোহায়, ধোঁয়ায় তাদের মুখ ধূসর হইয়া আসে। এ ছাড়া গাছের নীচে দু-একটি ঘর উঠিয়াছে। তার মধ্যে একটি মুদি-দোকান।
