এবং ইহার কয়েকদিন পরেই দেখা গেল নদীর পারে একটা চমৎকার খোলা জায়গা বাছিয়া সেখানে নবকিশোর দুটি বট অশ্বথের চারা একসঙ্গে পুঁতিয়া দিলেন,
তারপর সেই গাছে অনেক সিঁদুর মাখাইয়া নূতন কাপড় পরাইয়া বিরাট সমারোহে পূজা করিলেন, আশেপাশের বিভিন্ন গাঁ হইতে হাজার হাজার প্রজা আসিয়া তাঁহার সেই পূজা দেখিল, অজ্ঞাত নিরুদ্দেশ দেবতার উদ্দেশে ভক্তিভরে প্রণাম করিল। ধূপের ধোঁয়ায় আর মানুষের কোলাহলে কত ছাগশিশুর চীৎকার আর কান্না শুনিয়াও শোনা গেল না, ধুসর মাটি রক্তে ভাসিয়া গেল, নবকিশোর মাটিতে গড়াগড়ি দিয়া মা মা করিয়া অনেক ডাকিলেন… বটগাছের জন্মের ইতিবৃত্ত মোটামুটি এই। কিন্তু এটুকু জানিবার চেষ্টাও জনসাধারণের নাই, গাছের মধ্যে দেবতার অংশ আছে, ইহা জানিতে পারিয়াই তাহারা খালাস।…
তারপর বিখ্যাত ১৭৫৭ সাল। পলাশির যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলা অথবা ভারতবর্ষের ভবিষ্যৎ ভাগ্য নিরূপিত হইয়া গেল। বাংলার ধনীরা ইংরেজের জয়লাভের আনন্দে আত্মহারা হইয়া গেলেন।
অথচ পলাশির যুদ্ধক্ষেত্রে কত নিরীহ দরিদ্রের রক্তে ভাসিয়া গেল। পীরপুরের একটি ছেলেও যে হতভাগ্য সিরাজের পক্ষে প্রাণপণে যুদ্ধ করিয়াছিল অশেষ বীরত্ব দেখাইয়াছিল, ইহা ইতিহাসের পাতায় লেখা না তাকিলেও পীরপুরের ছেলে-বুড়ো কে না জানে?
তাহার নাম অজুন।
সেবার কোথা হইতে এক বাঘ আসিয়া সারাটা গ্রামে ভয়ানক উৎপাত শুরু করিয়া দিল, আজ এ বাড়ির ছাগলটা, কাল ও বাড়ির বাছুরটা প্রায়ই পাওয়া যাইতে লাগিল না। বৃদ্ধ এবং শিশুরা ভয়ে ভয়ে আর সন্ধার পর বাহির হইত না। গভীর রাত্রে কোনো গভীর সমস্যায় পড়িলেও কেহ ভুলেও দরজাটা একটু ফাঁক করিত না। হয়তো কখনো একটা বাছুর ভীষণ আর্তনাদ করিয়া উঠিত। গরুগুলি প্রত্যুত্তরে মা মা করিয়া চীৎকার করিতে থাকিত, তারপরেই সব শেষ, এমন দৃশ্যের অভাব রহিল না। গ্রামের ভিতর একটা আতঙ্কের ছায়া নামিয়া আসিল। যে পথে বাঘের পায়ের ছাপের মতো কিছু চোখে পড়িত, সে-পথ আর কেউ মাড়াইত না। কিন্তু এই দুঃসময়েও অর্জুনের সাহস দেখিয়া সকলে অবাক হইয়াছিল বাস্তবিক এমন অসীম সাহসের পরিচয় খুব কমই পাওয়া যায়। সে একদিন সেই দুর্ধর্ষ বাঘটাকে সকলের পায়ের সামনে আনিয়া হাজির করিল। ব্যাপার দেখিয়া বৃদ্ধরা ধন্য ধন্য করিতে লাগিলেন এবং এমন ভবিষ্যৎবাণীও করিলেন যে, সে কালে একটা কিছু হইবে।
মেয়েরা আড়ালে থাকিয়া তাহার চেহারার দিকে চাহিয়া বিস্ময়ে হতবাক হইল। আশে-পাশের দু-চারখানা গ্রামেও এমন বীরত্বের কাহিনি মুহূর্তের মধ্যে প্রচার হইতে বাকি রহিল না। এমন কি স্বয়ং জমিদার মহাশয়ও দারুণ খুশি হইয়া কিছু পুরস্কার দিলেন তাহাকে। কিন্তু সকলের প্রশংসাবৃষ্টির আড়ালে অর্জুনের জীবনে আর একটি ব্যাপার যা ঘটিল, তার তুলনা নাই। অর্থাৎ অর্জুন প্রেমে পড়িল। তাহার অথবা সেই মেয়েটির প্রেমের আসরে নামিবার প্রথম দৃশ্যটি এই — রাজকুমার মন্ডলের বাড়ির সামনেই একটা পোড়োবাড়ির উঠানে মরা বাঘটাকে ফেলিয়া রাখা হইয়াছিল। রোজই সেখানে কিছু না কিছু লোক জমিয়াই থাকিত। রাজকুমারের বড় মেয়ে চম্পক একদিন সেখানে গিয়া হাজির হইল, বাঘটার চারদিকে চরকির মতো কয়েকবার পাক খাইয়া, নাকে কাপড় দিয়া এখানে-সেখানে থু-থু ফেলিয়া অত্যন্ত ঘৃণাভরে বলিল, বারে, বাঘের গায়ে অমন গন্ধ কেন?
কাছেই ছিল অর্জুন। ব্যাপার দেখিয়া সে কিছুতেই হাসি চাপিয়া রাখিতে পারিল , ফিক করিয়া হাসিয়া ফেলিল। হাসি থামিলে শেষে আবার দারুণ গম্ভীর হইয়া এমন একটা তুচ্ছ বিষয়ও অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে বুঝাইয়া দিল যে চম্পক তো অবাক ! এমন দরদভরা স্বরে কেউ অনেক কাল তাহার সঙ্গে কথা বলে নাই। সে আগেও তাহাকে দেখিয়াছে বটে কিন্তু ভালো করিয়া দেখে নাই, আজ নতুন করিয়া দেখিল, যুদ্ধে জয়লাভ করিয়া বীর আসিয়াছে, তাহার চুল এলোমেলো মুখভরা হাসি, হাতে খোলা তরবারি আর ঢাল, এখন শুধু বরণ করিতেই বাকি। বীর যুবককে বরণ করিবার লোক এখন কেথায়? চম্পক হাঁ করিয়া চাহিয়া রহিল, কোনো হরিণশিশুর মতো তাহার চোখের দৃষ্টি।
তারপর প্রেমের দ্বিতীয় দৃশ্যের কথাও বলিতে হয়। রাজকুমারের বাড়িতে একদিন কীর্তনের আয়োজন করা হইয়াছে, গ্রামের অনেকেই আসিয়া কীর্তনে যোগ দিয়াছে। অর্জুন আসিয়াছে। চম্পক আর স্থির থাকিতে পারিল না, চুপিচুপি কখন কীর্তন আসরের কাছে গিয়া হাত নাড়িয়া ইঙ্গিতে অর্জুনকে ডাকিল, অর্জুন আসিল—কিন্তু কাছে আসিলে পর চম্পক আর কিছু বলিতে পারে না, মাটির দিকে চাহিয়া নিঃশব্দে দাঁড়াইয়া থাকে। এখানে বলিয়া রাখা ভালো চম্পকের মাথায় কিছু ছিট আছে, সে হ্যাঁ বলিলে মাঝে-মাঝে তাহার অর্থ হয় না। না বলিলে অর্থ হয় হ্যাঁ। অনেকসময় ভুলেও সে চুল বাঁধিত না, আবার একসময় যখন-তখন চুল বাঁধিত। বছর চারেক আগে স্বামী তাহার জলে ডুবিয়া মারা গিয়াছে। স্বামী জলে ডুবিয়া মরিলে স্ত্রীকে কপালে সিঁদুর মাখিয়া বারো বছর অপেক্ষা করিতে হয়, চম্পকও অপেক্ষা করিতেছিল। এখন বয়স তাহার সতেরো। স্বামীর মৃত্যুর সংবাদ পাইয়া সে পাগলামি করিয়া এখানে-সেখানে আছাড় খাইয়া অনেক কাঁদিয়াছিল কিন্তু অর্জুনের ছায়ার আশ্রয়ে এই পাগলামি এখন অনেক কমিয়াছে। সে যেন নতুন পৃথিবীতে পা ফেলিল, জলের আয়নায় নিজের চেহারা দেখিয়া নিজেরই এখন আর বিশ্বাস হয় না, চোখের দৃষ্টি আচ্ছন্ন হইয়া আসে, গাছের নীচে শুকনো পাতার মর্মর ধ্বনি সে প্রাণ ভরিয়া শোনে।
