প্রায় দুই-শ বছর আগে চলিয়া যাইতে হয়। তখন ১৭৫০ সাল। তখনও সমগ্র ভারতবর্ষের কেন, কেবলমাত্র বাংলাদেশের শাসনভারও জনকতক হিন্দু শ্ৰেষ্ঠীর চেষ্টায় ইংরেজ বণিকের হাতে চলিয়া আসে নাই, তাহাদের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি তখনও প্রকৃত শাসনপ্রতিষ্ঠান হইয়া উঠিতে পারে নাই, এমন দিনে এক রাত্রে পীরপুরের বৃদ্ধ জমিদার নবকিশোর চৌধুরী তাঁহার শয্যা-সঙ্গিনী তৃতীয়পক্ষের সুন্দরী যুবতী স্ত্রীকে লইয়া বড়ো বিব্রত বোধ করিলেন। একটা ভয়ানক উত্তাপে এক মুহূর্তে কী জানি কেন সমস্ত শরীরটা তাঁহার দারুণ অবশ হইয়া, আসিল, কেমন একটা অবসাদে ভরিয়া গেল, তিনি বড়ো অসহায় বোধ করিলেন, ইচ্ছা হইল দুই হাত দিয়া নিজের চুল ছিড়িতে থাকেন। অবশেষে গুটি শুটি মারিয়া তিনি পড়িয়া রহিলেন।
রাত তখন দুইটা। চারিদিক গভীর নিস্তব্ধ, কোথাও টুঁ শব্দ শোনা যায় না। সামনের জানালা দিয়া বাগান হইতে তীব্র ফুলের গন্ধ আসিতেছে। বিছানায় বালিশের পাশেও নানারকম ফুল, কিন্তু নবকিশোরের কাছে তাহা এখন বিষের মতো মনে হইল, তীক্ষ্ণ কাঁটার মতো, অথবা ছুঁচের মতো তাঁহাকে বিধিতেছে। পাশেই অরুন্ধতী তাহার প্রখর যৌবন আর চেহারার দীপ্তি লইয়া মুখ ফিরাইয়া শুইয়া আছে। নবকিশোরের ইচ্ছা হইল ডাক ছাড়িয়া কাঁদেন। তাঁহার মাথা ঘুরিতে লাগিল, তিনি ঘামিতে লাগিলেন। আস্তে আস্তে তিনটা বাজিয়া গেল, হয়তো রাতকে দিন ভাবিয়া কয়েকটা কাক বাইরে কা-কা করিতেছে, কাঁটার বিছানায় শুইয়াও নবকিশোর একসময় ঘুমাইয়া পড়িলেন। ঘুমাইয়া স্বপ্ন দেখিলেন, তাঁহার আশে-পাশে একদল নগ্ন নরনারী, চমৎকার তাহাদের চেহারা, যেন শ্বেতপাথরে খোদা মূর্তি, চমৎকার চোখ-মুখের ভঙ্গি, যেন অজস্র মানিক ঝরিতেছে, নবকিশোর দেখিলেন, খিলখিল করিয়া হাসিয়া তাহারা একজন আর একজনের সঙ্গে কথা বলিতেছে, অজস্র চুমা খাইতেছে, কেহ হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া কোন মেয়ের হাঁটুতে মুখ রাখিয়া কী সব বলিতেছে, কেউ বুকের উপর মুখ গুঁজিয়া পড়িয়া রহিয়াছে আর সেই একদল হাস্যমুখর, সৌন্দর্যদীপ্ত মানুষের মধ্যে তিনি যেন একটি ভেড়া! এমন সময় নবকিশোর হঠাৎ জাগিয়া উঠিলেন, অসহায়তার তুলনা তো নাই, শরীরটাকে আরও অবসাদগ্রস্ত বোধ করিলেন। ঘরের এককোণে বাতি জ্বলিতেছে, মিটমিট করিয়া চাহিয়া তিনি দেখিলেন, আশ্চর্য, বিছানা খালি, পাশে তাঁহার সুন্দরী স্ত্রী অরুন্ধতী নাই, ঘরের দরজা শাশা খোলা, হু হু করিয়া শেষরাত্রির ঠাণ্ডা বাতাস আসিতেছে। ব্যাপার দেখিয়া তাঁহার চোখের পাতা আর জ কুঁচকাইয়া আসিল, তিনি খাট হইতে নামিয়া দরজার কাছে আসিলেন, আস্তে ডাকিলেন— বউ?
কিন্তু কোনো উত্তর নাই। শুধু তাঁহার গলাটাকেই এই নিস্তব্ধতায় ভীষণ বিকৃত শুনাইল। আবার আরও জোরে ডাকিলেন বউ বউ?
তবু কোনো উত্তর নাই। নবকিশোরের প্রশস্ত কপাল আরও কুঁচকাইয়া আসিল, ঘর হইতে বার হইয়া তিনি এখানে-সেখানে অরুন্ধতীকে খুঁজিতে লাগিলেন, বাগানেও অনেক খুঁজিলেন, পুকুরের ঘাটের কাছে গিয়া ডাকিলেন, বউ? ও বউ?—কিন্তু অন্ধকারে কেবল প্রতিধ্বনিই ফিরিয়া আসিল। নবকিশোর ভাবনায় পড়িলেন। হঠাৎ চোখে পড়িল, ছেলে সুরেন্দ্রকিশোরের ঘরে আলো জ্বলিতেছে, আর সেখানে কোনো মেয়েলি স্বরে কথাবার্তার আওয়াজও শোনা যায়। ধীরে ধীরে তিনি অগ্রসর হইলেন, বুক তাঁহার দুরুদুরু কাঁপিতেছে। ঘরের ভিতর কথাবার্তার শব্দ আরও স্পষ্ট হইয়া উঠিল, আর কোনো সন্দেহ রহিল না, একবার উঁকি মারিয়া যা দেখিলেন, তাতে রাগে তাঁহার সর্বাঙ্গ জ্বলিতে লাগিল, হাত-পা কাঁপিতে লাগিল।
পীরপুরের চৌধুরী পরিবারের ভাগ্যে আজ এ কী অভিশাপ, হায়, আজ এ কী দুরপনেয় কলঙ্কের ইতিহাস তাহাকেই বিশেষ করিয়া দেখিতে হইল। তাহার তৃতীয়পক্ষের স্ত্রী সুন্দরী অরুন্ধতীর সঙ্গে এক বিছানায় শুইয়া তাহার বুকে মুখ রাখিয়া প্রেমালাপ করিতেছে তাঁহারই একমাত্র ছেলে সুরেন্দ্রকিশোর!
পরদিন অরুন্ধতী বা সুরেন্দ্র আর কাহাকেও ত্রিসীমানায় দেখা গেল না এবং পরেও আর কোনদিন দেখা যায় নাই। কেন এমন হইল, কিছুটা অনুমান করা যায় বটে, কিন্তু সম্পূর্ণ জানা যায় না। তবে জনশ্রুতি এই যে, নবকিশোর নাকি অরুন্ধতীকে রূপকথার রাজাদের মতো একেবারে মাটি চাপা না দিলেও এমন কিছু একটা করিয়াছেন যাতে সেই দুর্ভাগ্য মেয়ের মৃত্যু ঘটিয়াছে। মৃত্যুটা কল্পনা করিতে পারি এইরূপ : মস্ত বড় দালানের যেদিকটা বেশ একটু নির্জন, আর গাছপালার ছায়ায় বেশ গম্ভীর, সেখানে একটা সুন্দর ঘর আছে। ঘরটি চমৎকার সাজানো। মেঝেতে দামি ফরাস আর বালিশের ছড়াছড়ি, বাতাসে সুগন্ধ। চারিদিকে কেমন একটা নির্জন ভয়াবহতা, মাটিতে উঁচটি পড়িলে শোনা যায়।
এই ঘরের এক বিপুল ইতিহাস আছে। পঁয়তাল্লিশ বছর আগে হইতে সেই ইতিহাসের শুরু। নবকিশোর তাঁহার সারা রাজ্য জুড়িয়া একটি জাল তৈরি করিয়াছিলেন, সেই জালে যে মেয়েগুলি ধরা পড়িত, তাহাদের ধরিয়া আনা হইত এই ঘরে—সকলের চোখেই পাগলের মতো দৃষ্টি, নয়তো নিতান্ত ছেলেমানুষ হইলে সারামুখ চোখের জলে ভেজা, মাথার চুল আর পরনের কাপড় এলোমেলো, আত্মসমর্পণের ইচ্ছা মোটেই না থাকিলেও আত্মরক্ষায় নিশ্চেষ্ট। নবকিশোর তাহাদের কোনো কুলই রক্ষা করিতেন না, কেবল পথে বসাইতেন। সেই মেয়েগুলি তখন পথে পথে ঘুরিয়া বেড়াইত, না হয় গ্রামের হাটে-হাটে কোন বিশেষ পল্লিতে আশ্রয় লইয়া বাঁচিত। এভাবে অনেক মেয়ের কুমারী অথবা বধূজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটিয়াছে। কিন্তু তাহাদের মৃত্যু দেখিয়া নবকিশোর বিন্দুমাত্র বিব্রত হন নাই, তাহাদের অভিশাপ আর বেদনার রক্ত গায়ে মাখিয়া তিনি এতটুকু বিচলিত হন নাই, বরং তাহাদের দেহ লইয়া বারবার ছিনিমিনি খেলিয়াছেন, একদিকে সর্বনাশ করিয়া অন্যদিকে লাথি মারিয়া ছাড়িয়া দিয়াছেন। নবকিশোরের সুদীর্ঘ জীবন, আর সেই জীবনের সঙ্গে জড়িত এই ঘরের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস এই। এখন সেই ঘর তত ব্যবহৃত হয় না, মেঝেতে ধূলি পড়ে। তার মূলে একমাত্র কারণ হয়তো বার্ধক্যের অক্ষমতা এবং সেই কারণে আগের মতো প্রচুর উৎসাহের অভাব। কিন্তু সেদিন যে কান্ড ঘটিল তাকে সত্যই অদ্ভুত বলা চলে। ঘটনাটি গতানুগতিক পথ ধরিয়া ঘটে নাই। নবকিশোর সেই ঘরের কথা মনে করিয়াই স্ত্রীর জন্য উপযুক্ত শাস্তি খুঁজিয়া পাইলেন। অরুন্ধতী পরম গাম্ভীর্যে ঘরে ঢুকিল, নবকিশোর বাহির হইতে দরজা বন্ধ করিয়া দিলেন এবং অনেকদিন পর্যন্ত আর খুলিলেন না। অরুন্ধতী প্রথমে অনেক ধাক্কা দিয়াছিল, তারপর কাঁদিয়াছিল। বাগানের সেই নির্জন অংশ তাহার উচ্ছ্বসিত কান্নায় থমথম করিতে লাগিল। কিন্তু কাঁদিতে কাঁদিতেও ক্লান্তি আসে, তাহার গলার স্বর একদিন আর শোনা গেল না।
