গলারস্বর যথাসম্ভব অবিকৃত রাখিয়া সতী বলিল, এমনি।
এমনি? নীলা কাছে আসিয়া তাহার গা ঘেঁষিয়া দাঁড়াইল। কিন্তু এত ঘনিষ্ঠতায় ধরা পড়িবার ভয়ে সতী চকিতে পাশ কাটাইয়া সরিয়া আসিল। একটা কাজ সেরে আসি ভাই, এখুনি আসছি,—এই বলিয়া দীর্ঘ বারান্দা দ্রুত অতিক্রম করিতে লাগিল।
নীলা তো অবাক! সতীর স্বর-বিকৃতি তাহার কাছে ধরা পড়ে নাই এমন নয়।
সিঁড়ি দিয়া নামিবার সময় পেছন হইতে বড়-বউ বলিল, ছোটো বউ শোন
কিন্তু সতীর কোনদিকেই খেয়াল ছিল না, তরতর করিয়া সিঁড়ি বাহিয়া সে তখন নীচে নামিয়া গিয়াছে।
ছেলে বুকে করিয়া বড়বউ নাক সিটকাইলেন।–আহা, দেমাক দ্যাখো মেয়ের!
লাবণ্যলতার ঘরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। ধীরে অগ্রসর হইয়া সতী ডাকিল, ঠাকুরমা?
কোনো উত্তর নাই। কেবল একটা ক্ষীণ প্রতিধ্বনি ফিরিয়া আসিল।
সতী আবার ডাকিল, ঠাকুরমা?
তবুও উত্তর নাই।
ভয়ে-ভয়ে আরও কিছুটা অগ্রসর হইয়া বিছানার উপর হাত রাখিয়া সতী দেখিল, না, লাবণ্যলতা শুইয়াই আছেন। মুখের কাছে মুখ লইয়া আবার ডাকিল,—ঠাকুরমা কত ঘুমুচ্ছেন?
তবুও কোনো উত্তর নাই। সভয়ে লাবণ্যলতার চোখে-মুখে-বুকে দুটি শিথিল হাত বুলাইয়া সতীর সারাদেহ হিম হইয়া আসিল। চারপাশে জমাটবাঁধা সারি সারি অন্ধকারের ভয়গুলি যেন তাড়া করিয়া আসিল তাহাকে। চীৎকার করিয়া আবার ডাকিতে গেল—ঠাকুরমা, কিন্তু পারিল না, কে যেন খুব চাপিয়া ধরিয়াছে তাহার গলা। ভয় আর দুর্বোধ্য বিস্ময়ে তাহার দীর্ঘায়ত চোখ বেদনায় বুজিয়া আসিল। সতী বৃদ্ধ লাবণ্যলতার কুঞ্চিত হিমশীতল দেহের উপর পড়িল।
পরদিন অনেক চেঁচামিচি, নতুন বিষয়ে এক নতুন কোলাহল। কথায় কথায় উঠিল : বুড়ির জ্বর হইয়াছে, পরদিন নাকি ইহা কার মুখে শোনা গিয়াছিল। মনোরমা বলিলেন, আহা, এতখানি বয়সে বুড়ী কী সুখেই না মরল! এবং নিজের কপালে করাঘাত করিলেন, আর শুধু তাঁহার বেলায়ই কী মৃত্যুর দেবতা পথ ভুল করিয়াছেন।
সতী তাহার রুদ্ধ গৃহাভ্যন্তরে কতক্ষণ জাগিয়াছিল, আর কতক্ষণই বা শুইয়াছিল, সে নিজেও জানে না। তখন রাত বারোটার কম হইবে না। কাপড়টি সর্বাঙ্গে ভালো করিয়া জড়াইয়া (যেন শীতার্ত কোনো রাত্রি) সতী ঘরের বাহির হইয়া আসিল। চারদিকে থমথম করে, টুশব্দও শোনা যায় না। দীর্ঘ বারান্দা পার হইয়া সে সিঁড়ির কাছে আসিয়া দাঁড়াইল। উজ্জ্বল আলোকিত সিঁড়িপথ। সতী নামিতে লাগিল।
বউদি?
সতী ফিরিয়া তাকাইল : তাহার ঘরের কাছে বারান্দায় এই রাত্রে একাকী পায়চারি করিতেছে নীলা।
নীলা বলিল, কোথায় যাচ্ছ ভাই, বউদি?
–ঠাকুরমার জ্বর হয়েছে, সে কি জানো না? বোধহয় জ্বরে ছটফট করছে এখন, একটু দেখতে যাই।
নীলা তাড়াতাড়ি তাহার কাছে গিয়া দুই হাতে তাহাকে জড়াইয়া ধরিল, বলিল, চলো, আমার ঘরে শোবে চলো।
সতী তাহার দিকে হাঁ করিয়া চাহিয়া রহিল।
নীলা দেখিল, তাহার দুই চোখে জল, ইলেকট্রিক আলোয় চিকচিক করিতেছে।
বনস্পতি
এত বড় বটগাছ সচরাচর দেখা যায় না। পীরপুরের হাটকে যদি চিনিতে হয়, তবে যেকোনো অশীতিপর ক্ষীণদৃষ্টি বৃদ্ধকে জিজ্ঞাসা করিলেও ইহার উত্তর মিলিবে। দূরে, সে যত দূরেই হোক না কেন, যেন আকাশেরও প্রায় অর্ধেক ছাইয়া আছে, এমন একটা দৈত্যের মতো প্রকান্ড গোলাকার গাছের দিকে দারুণ তৎপরতায় শীর্ণ হাতটি উঠাইয়া সে বলিবে, আরে তুমি কি কানা? ওই দৈত্যিটার বারাবর চলে যেতে পারো না? যাহাকে বলা হইবে, সে যেন কোনো ব্যবসায়ী, ওই হাটের দিকেই যাইতেছে, আর কোনো উদ্দেশ্য তাহার নাই! পীরপুর গ্রামটি গ্রামের মতো নয়, সেখানে কেউ ঘর বাঁধিয়া বাস করিতে পারে একথা কেউ ভুলেও কল্পনা করিতে পারে না। কেবল একটি হাট লইয়াই যেন সারাটি গ্রাম। কেবল সারি-সারি টিনে ছাওয়া ছোটো ছোটো ঘর, মাঝখানে সরু ক্ষতবিক্ষত পথ, বটগাছের আশ্রয়ে চারিদিক চমৎকার ছায়াচ্ছন্ন, হাটবার আসিলে রাত থাকিতেই নৌকার পর নৌকার ভিড়, তারপর সারাদিন আর সারারাত কেবল জনসমুদ্রের কলোচ্ছাস। সেই কলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে কিছুমাত্র পরিচয় যাহাদের নাই, অথবা যেকোনো উপায়ে হোক সেই জনসমুদ্রের কিছুমাত্র আভাস যাহারা পায় নাই, তাহাদের পক্ষে তেমন দৃশ্যের কল্পনা করা সুকঠিন।
আশেপাশে দশ-বারোটা গ্রাম হইতে পীরপুরের এই হাট চোখে পড়ে। সেই গ্রামগুলি আর এই হাটের মাঝখানে প্রায় দুইমহলব্যাপী একখানা নদী আর সারি সারি অনেকগুলি বিল। বর্ষাকালে এই বিলগুলি আর নদীতে মিলিয়া, যে অবস্থা হয়, সেকথা মনে করিতে হইলে, কেবল কোনো সমুদ্রের সঙ্গেই তুলনা করা চলে। ওপারকে মনে হয় কোনো রহস্যময়, কুয়াশাচ্ছন্ন পৃথিবী, বিপুল রহস্যের ফেনা সারা গায়ে মাখিয়া এপারের পৃথিবীর সন্তানদের চোখে ধাঁধাঁ লাগাইতেছে। ইহাও মনে হয়, আকাশের সীমারেখায় তাহা কোনো ধূসর বর্ণের পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘের রাশি —অন্যান্য মেঘের মতো যাযাবর নয়। সেই দুই পারের মাঝখানে বিস্তীর্ণ জলরাশি আরও দুর্বোধ্য। সারাক্ষণ কেবল দুই পারের মানুষকে ভীষণ শাসাইতেছে। তারপর বাতাস বহিতে থাকে, বিশাল জলরাশিতে এখানে সেখানে বিক্ষিপ্ত নৌকাগুলি সাদা এবং আরও নানারকমের রঙিন পাল মেলিয়া যেন পাখায় ভর দিয়া উড়িয়া আসিতে থাকে, বটগাছের শত শত ডালের ভিতর রক্তের জোয়ার আসে, কোটি কোটি পাতা মৃদু কাঁপিতে থাকে। তারপর কোনো এক সময় হয়তো শীতের আবির্ভাব, মাথার উপরে কাঠফাটা রৌদ্র, সমুদ্রের বুক দেখা যায়, আর বটগাছের নীচে অজস্র শুকনো পাতার রাশি। একটা মুসলমান বুড়ি মাঝে মাঝে সেই পাতাগুলি ঝাঁট দিয়া নেয়।
