লাবণ্যলতা বলিয়া চলিলেন, কিন্তু যে রাতে আলো হাতে রান্নাঘর থেকে বার হবার সময় দরজার চৌকাঠে ঠেকে উঠোনে আছাড় খেয়ে পড়লাম, তখন ভারী কান্না পেল, ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করল। কিন্তু সই, যা পেয়ে তখনকার কান্না পেল, আমি ভুলেছি, সে-কথা ভাবলে আজও ভারী আশ্চর্য মনে হয়। কার হাতের স্পর্শ টের পেয়েই চমকে মুখ তুলে দেখি, তোর ঠাকুরদা! বড় আরামে তার হাতে ভর দিয়ে ঘরে এসে, অনেকক্ষণ কাঁদলাম। সেদিন মনে হল, এ সংসারে আমি আর একা নই, এমন একজন কেউ আছে যে আমাকে ভালোবাসে। শুনে তোর হাসি পাবে জানি, বিয়ের পর প্রায় সারাটা জীবন কাটিয়েও যখন কারোর এই প্রথম ভালোবাসার কথা মনে হয়! কিন্তু বুড়ো বয়েসে এমন এক ভীমরতি হল। সমস্ত লাঞ্ছনা-গঞ্জনা আমি ভুলে গেলাম, বুড়ো বয়সে এমন এক রাজ্যের রানি আমি হলাম, যে রাজ্যে ঢোকবার অধিকার কারোর ছিল না। সে বলল, ওগো, তুমি আগে আমায় জানাওনি কেন? তোমার শরীর এমন খারাপ, এভাবে বিনে চিকিৎছেতে দিন কাটালে যে একেবারে অন্ধ হয়ে যাবে। আর কোন চিকিচ্ছের কথা তো জানিনে বউ, যাকে খুব বড়ো চিকিচ্ছে বলে তখন মনে ভেবেছিলাম, সেই কথা বলি। রাতে যখন কোনো কারণে বাইরে যাবার দরকার হয়েছে, তোর ঠাকুরদা হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, সেই হাতে ভর দিয়ে আমি কোথায় যে যেতে হবে সে-কথা ভুলেছি। শুনে হাসবি, শুধু বাইরে যাবার জন্যে সেই বুড়ো বয়সে মিথ্যে কথা বলার লোভ সামলাতে পারিনি। রাত্তিরে জল তেষ্টা পেলে তার হাতে জল খেয়ে এমন স্বাদ পেয়েছি, রোজই জল তেষ্টা পেয়েছে। খাওয়ার সময় কাছে বসে থেকে খাওয়ানোর কী যে আনন্দ হয়েছে, তা বলতে পারিনে।
সতী চুপ করিয়া শুনিতেছিল। লাবণ্যলতা বলিতে লাগিলেন, এমনি করে অনেকদিন কাটল, তিন-চার মাসের কম নয়। সেদিন জ্যোৎস্না রাত। গভীর রাতে কী কারণে যেন বাইরে বার হলাম, তোর ঠাকুরদা কাঁধে হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করলে, কী সুন্দর জ্যোৎস্না, তুমি দেখতে পাচ্ছ বউ? আমি সবই দেখতে পাচ্ছিলাম, কিন্তু কিছু আবছা, কিছু অস্পষ্ট। হঠাৎ তোর ঠাকুরদা, আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললে, তুমি আমায় দেখতে পাও বউ? বোন, শুধু সেই রাতটিতেই সবচেয়ে বেশি করে আমি আমার মহিমা টের পেয়েছিলাম। তারপর চোখও ভালো হল, শরীরও সারল, কিন্তু যা আবার হারালাম, তা আর কিছুতেই সারবার নয়? তার ভয়ানক জ্বর হল, মাত্র তিনদিনের জ্বরে তাকে আমার ঘোমটার আড়াল থেকে বিদায় দিলুম। তারপর কত বছর আজ হয়েছে, শকুনের আয়ু নিয়ে আজও বেঁচে আছি, কিন্তু সারা জীবনে—শুধু তোর কাছেই বলি বউ, সারাজীবনে সেই ক-টা দিনের কথা কখনো ভুলতে পারিনে।
গল্প শেষ করিয়া লাবণ্যলতা সতীর গায়ে হাত রাখিয়া ডাকিলেন, ওরে বউ ঘুমিয়ে পড়লি?
সতী নিরুত্তর, ঘুমাইয়াছে কিনা বোঝা গেল না।
সেদিন অবনী রক্ষিতের মৃত্যুবার্ষিকী। সেই উপলক্ষ্যে কিছু লোক খাওয়ানো হয়। সবাই অতি সম্রান্ত আত্মীয়স্বজন। এইদিনে মনোরমাকে কচিৎ ঘরের বার হইতে দেখা যায়। রুদ্ধ ঘরে মৃত স্বামীর কথা স্মরণ করিয়া অচিরে নিজের মৃত্যু কামনাই করেন তিনি। পুত্র সৌভাগ্যের গর্বটা সজোরে চাপা দিয়া কোনো অদৃশ্য দেবতার পায়ে মাথা ঠুকিতে থাকেন। বন্ধুদের ভিতর শুশ্রুষার প্রতিযোগিতা আরম্ভ হয়। সমস্ত কাজ ফেলিয়া সেদিন তাহারা তাঁহাকে ঘিরিয়া থাকে। কিন্তু চারদিকে শূন্যদৃষ্টিতে চাহিয়া মনোরমার ক্লান্ত চোখের দৃষ্টি আরও অর্থহীন হইয়া আসে। সেজোবউ নাই যে! ক্ষীণস্বরে বলেন, সুলেখা কোথায়?
সুলেখাকে তৎক্ষণাৎ খবর দেওয়া হয়। সে আসিলে মনোরমা আবার কাতরস্বরে বলেন, তোমাদের বাসার সবাই এসেছে তো? তোমার মা-বাবাকে অনেকদিন দেখিনি। ওঁদের ঠিকমতো আদর-যত্ন করা হচ্ছে তো।
লোকটা মস্ত বড়লোক। কন্ট্রাকটারি করিয়া বিস্তর পয়সা করিয়াছেন, অতি সজ্জন সুলেখা তাঁহারই মেয়ে তো! এতক্ষণ পরে সেই সুলেখাকে হাতের কাছে পাইয়া মনোরমার দুই চোখে বিপুল বন্যা ছুটিল।
সন্ধ্যার পরে স্বল্প অন্ধকারে এক নীরব ছায়ামূর্তির মতো সতী বারান্দার রেলিং ধরিয়া দাঁড়াইয়া আছে। আকাশে অজস্র তারা। মাঝে মাঝে মিষ্টি বাতাসের ঝলক আসিয়া চোখেমুখে ছড়াইয়া পড়ে, দুই পাশের ভাঙা চুলগুলি গালের পাশে কাঁপিতে থাকে। রাস্তার ওই পাশের বাড়িটিতে ইউক্যালিপ্টাস গাছের সারি, মস্ত লম্বা—যেন আকাশ ছুঁইতে আর বাকি নাই। সেই গাছের চারিদিকে গাঢ়তর অন্ধকারের আবরণ। বাড়ির প্রতি জানালায় উজ্জ্বল আলো, কোথাও দীপ্তকক্ষের আভাস। এই দালানের অভ্যন্তরেও লোকজন আর ছোটো ছেলেমেয়েদের চেঁচামিচি। চারদিকে বিশৃঙ্খল দৃষ্টিতে চাহিয়া চাহিয়া কোন সময় সতীর দুই চোখ জলে ভরিয়া আসিল। পাশের আনন্দ-কোলাহল হইতে বিচ্ছিন্ন সতীর এই ঘরের নিঃশব্দতাটুকু স্পষ্ট ধরা পড়ে। ঘরের আলো নিবাইয়া বারান্দার রেলিং-এ ভর দিয়া সতী দাঁড়াইয়া আছে। চারপাশ শূন্যতায় খাঁ খাঁ করে। নিস্তব্ধ এই অন্ধকারের পটভূমিকায় কাহারও মূর্তি আজ চোখে পড়ে না। এই অন্ধকারের প্রসন্নতায় কেউ আসিয়া মুখোমুখি দাঁড়ায় না। সতী আঁচল মুখে চাপিয়া ধরিল।
কতক্ষণ সেইভাবে সে দাঁড়াইয়াছিল, ঠিক খেয়াল নাই, চমক ভাঙিল নীলার ডাকে–এখানে দাঁড়িয়ে কেন ভাই বউদি?
