সতী তবু বলিল, আহা দেখিনা কোন রাজভোগ আপনি খাচ্ছেন?
—রাজভোগই বটে!
চমকিয়া সতী ফিরিয়া চাহিল, দেখিল তীব্র দৃষ্টিতে তাহার দিকে চাহিয়া মনোরমা বলিলেন, রাজভোগই বটে! কিন্তু তোমার না হয় খাওয়া দাওয়া সংসার ধর্মের ওপর বিতৃষ্ণা, সেজন্য তো আর কেউ না খেয়ে বসে থাকতে পারে না! রোজই এ কী ব্যাপার শুনি? আমরা এমন কী অপরাধ করেছি শুনি যে তোমার খেয়ালের বোঝা আমাদের বইতে হবে?
নিজের যা কিছু খাওয়ার আয়োজন, সেগুলি কোনরকমে ঢাকিতে ঢাকিতে লাবণ্যলতা বলিলেন, সেকী?
সতী বলিল, যাই। তারপর মনোরমার পেছনে পেছনে চলিল।
খাওয়া দাওয়ার পর বসিল মিটিং। চার বধূই বিনা উদ্দেশ্যে একত্রিত হইয়াছে। প্রধান বক্তা মনোরমা। শ্রোতার দল যার যার সন্তানরক্ষা কার্যে আর অধিক ব্যাপৃত থাকিয়া বক্তার প্রতি কান খাড়া করিল।
-বুঝলে সেজ বৌ? সেজ-বউর প্রতি মনোরমার টান একটু বেশি; তার বাপ মস্ত বড়োলোক। কনট্রাকটরি করিয়া পয়সা করিয়াছেন, মেয়ের খোঁজ বরাবর লইয়া থাকেন, ভারী অমায়িক লোক, তাহার তুলনায় তাহারা কী-ই বা। মনোরমা বলিলেন, বুঝলে সেজ-বউ, বলে কিনা কোন রাজভোগ খাওয়া হচ্ছে দেখি।
মেজ বউর উপর ঢলিয়া পড়িয়া, ঘোমটা ফেলিয়া সুলেখা ভয়ানক হাসিয়া উঠিল, বলিল, তাই নাকি?
মনোরমা ভ্রূ কুঁচকাইয়া বলিলেন, দ্যাখো কী সব বিশ্রী কথা। তাও কিনা আমার সামনে, যেন বুড়ি না খেয়ে থাকছে! আর উনি সেটা বরাবর লক্ষ করে আসছেন। ওঁর মতো হিতাকাক্ষী জগতের আর দুটি মেলে? কী দুর্বুদ্ধি পেটে দ্যাখো। আমি বলি কী—
সকলেই অবাক। সুলেখাই কেবল অনর্থক অতিরিক্ত হাসিতেছে।
—আমি বলি কী, রাজভোগ কাকে বলে সে তো আর জানা নেই, জানবার ভাগ্যিও কোনদিন হয়নি। এখানে এসে ধাঁধা লেগেছে।
সুলেখা তেমনি হাসিতে লাগিল : অর্থাৎ এ সম্বন্ধে আমি কোন মতামত প্রকাশ করিতে চাই না, আমার হাসি হইতে যা হয় বুজিয়া নাও। তাহার হাসি দেখিয়া চার বছরের শিশু মন্টুও ছোটো ছোট দাঁত বার করিয়া হাসে।
সন্ধ্যার পর সতী আবার গিয়া হাজির হইল।
লাবণ্যলতা তাহার খুপড়িতে তেলের প্রদীপটা জ্বালাইয়া এইমাত্র নিজের বিছানার উপর বসিয়াছেন। ইলেকট্রিক আলোর ব্যবস্থা থাকিলেও ব্যবহার করেন না, বলেন, বুড়ো চোখে অত আলো সয় না।
সতী বলিল, তখন খাওয়া হয়েছিল?
হঠাৎ একটা গলার স্বর শুনিয়া লাবণ্যলতা চমকাইয়া উঠিলেন, ভালো করিয়া দেখিয়া বলিলেন, তুই সতী?
ধপ করিয়া একপাশে বসিয়া সতী বলিল, হ্যাঁ, আমি! ঠাকুরমা, আপনি চোখে কম দেখতে পান বুঝি?-কত বয়েস হয়েছে আপনার?
—বয়েস? বয়েস, আমার..হ্যাঁ, কালো-গোরার যুদ্ধ কবে হয়েছিল জানিস? হিসাব করিয়া সতী আশ্চর্য হইল, সে তো আশি বছরের কাছাকাছি। আপনি তাহলে আজকের নন ঠাকুরমা?
লাবণ্যলতা হাসিলেন, কিছু পরে বলিলেন, আর একবার এমনি চোখ খারাপ হয়েছিল, সেবার ভীষণ খারাপ হয়েছিল, রাত্তিরে তো একেবারেই দেখতে পেতাম না, দিনে তবু কিছু পেতাম—কিন্তু সেই দুঃখের কথা স্মরণ করিয়া তাঁহার ঘোলাটে চোখের দৃষ্টি এক স্বপ্নের ছায়ায় ঘোর হইয়া আসিল। সতী তা লক্ষ করে নাই, কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল, তখন খাওয়া হয়েছিল?
তেলের প্রদীপ মিটমিট করিয়া জ্বলে, বিকীর্ণ আলোতে ছায়ার ভাগই বেশি, দুজনের মুখেই আলোর চেয়ে ছায়ার প্রলেপ বেশি।–খেয়েছিলাম। কারোর ওপর রাগ করে না খেয়ে থাকব এমন বোকা আমি নই। যাই বলিস, ছোঁড়াটার ওপর রাগ করে কখনো না খেয়ে থাকিসনে, পেটের কষ্ট বড়ো কষ্ট! নিজের রসিকতায় নিজেই হাসিয়া উঠিয়া লাবণ্যলতা আসল কথা চাপিয়া গেলেন, আসলে তিনি খান নাই।
সতী মুচকি হাসিয়া বলিল, সেই দুষ্টু ছোঁড়াটার কথা আর বলবেন না ঠাকুরমা, সে তো এখন জেলে পচছে!
–ষাট ষাট, ষাট, কী যা মুখে আসে তাই বলিস, তোর কী এতটুকু মায়া-দয়া নেই বাছা?
সতী তবুও মুচকিয়া হাসিতে লাগিল। একটু পরে হঠাৎ তাঁহার কোলের কাছে শুইয়া পড়িয়া বলিল, একটা গল্প বলুন না, ঠাকুরমা!
—আহা, আবার এখানে কেন? এই ছেঁড়া, ময়লা বিছানায়–
-তা থাক, সতী অন্য কথা পাড়িল, আচ্ছা বুড়ো আপনাকে খুব জ্বালাতন করত, না?
লাবণ্যলত্য অন্যদিকে নিঃশব্দে চাহিয়া রহিলেন, কিছুক্ষণ পরে শুধু বলিলেন, ছাই!
সতী তাঁহার মুখের দিকে হাঁ করিয়া চাহিয়া রহিল, একটু পরে শুনিতে পাইল লাবণ্যলতা বলিতেছেন: জ্বালাতন না ছাই! সময় কোথায়? রোজ রাত বারোটা একটার পর খেয়ে দেয়ে শুলেও রাত থাকতে উঠতে হবে, নইলে রক্ষে নেই। তারপর আবার আড়াইটে-তিনটে অবধি বাড়িশুদ্ধ সকলের খাওয়া-দাওয়া সেরে নিজেদের খাওয়া, চান করে খেতে-খেতে চারটে বাজত, আবার সন্ধ্যে হতে না হতেই রান্না ঘরে ঢোকা। এক রাত্তির ছাড়া বুড়োর মুখ আর কখনো দেখিনি। এর মধ্যে আবার জ্বালাতন করা, মাঝে মাঝে কথা বলা গলায় দড়ি দিতে আর বাকি থাকবে। কোনোদিন অসুখ-বিসুখ হলে তোর ঠাকুরদা একটিবার কাছে এসে বসলে চারিদিক থেকে কতরকমের কথা এসে তীরের মতো বিধত-ওমা গো, এত করেও যশ নেই, নিজের চোখে না দেখলে বুঝি বিশ্বেস হয় না! অবিশ্যি অসুখ-বিসুখ হলে তোর ঠাকুরদা একবারের জন্যেও কাছে এসে বসেনি, জ্বর ছাড়তে না ছাড়তেই আবার ভোর থেকে মধ্যরাত সমানে হাঁড়ি ঠেলতে হয়েছে! অসুখ হওয়াটাই যেন অপরাধ! প্রায় চিরকাল এমনি কেটেছে, কাজ করেও একটু আনমনা হবার উপায় নেই, কারোর আশায় বাইরের দিকে তাকাবার সাহস নেই। কিন্তু দিদি, সারাজীবনে এমন কয়েকটা দিনের কথাও জানি—তাঁহার চোখের দৃষ্টি আবার আচ্ছন্ন হইয়া আসিল, গলার স্বর বদলাইয়া গেল—সেসব দিনের কথা ভেবে আর সব দুঃখকে ভুলেছি। সেসব দিনের কথা ভাবলে আমার নিজেরই একসময় আশ্চর্য মনে হয়। তাহলে শোনো বলি। চোখ যখন আমার খারাপ হল, তখন পঁয়ত্রিশ পার হয়ে আমি প্রায় বুড়ি হতে চলেছি। শরীর ভয়ানক ভেঙে পড়েছে, অত খাটনি আর সয়না। তবু মুখ ফুটে বলতে সাহস নেই। আর বললেই বা কী হত? তাহলেও কোন উপায় ছিল না। চোখ খারাপ হলে পর সেই ভাঙা শরীর আর খারাপ চোখ নিয়েই কিছুদিন সমস্ত কাজ করেছি, কিছুতেই কাউকে বোঝাতে পারিনি যে, আমার কখনো অসুখ হয়েছে। কোনো সময় হয়তো কথাচ্ছলে জানালে তাঁরা বলতেন, তোমার আবার অসুখ কী গো, বেশ তো আছ, খাওয়া-দাওয়া তো বেশ হচ্ছে!—তবু কিছু বলিনি, চোখে না দেখার ভান করছি, —এই অজুহাতে সকলের হাসির কারণ হয়েও চুপ করে থেকেছি।
