তখন সন্ধ্যা হইয়াছে। কিছুক্ষণ নীচতলার পেছন দিকের বারান্দার গলায় আঁচল জড়াইয়া সতী একাকী ঘুরিতেছিল। একপাশে একটি ছোটো ঘরের দরজার কাছে দেয়াল ঘেঁসিয়া বৃদ্ধা লাবণ্যলতা বসিয়াছিলেন। বংশের মধ্যে সকলের ঊর্ধ্বতন দৃষ্টান্ত তিনি, মনোরমার শাশুড়ি। কিন্তু সাংসারিক রীতি অনুযায়ী আপন নন, সৎ; মনোরমার মৃত স্বামী তাঁহার নিজের ছেলে নয়, আগের পক্ষের। কিন্তু শোনা যায়, সেই ছেলে অনেক বড়ো হইয়াও নাকি জানিতে পারে নাই, লাবণ্যলতা তাহার মা। নয়। যা-হোক, সেই ছেলে অবশেষে মানুষ হইয়াছে, শহরে বাসা বাঁধিয়াছে, অজস্র টাকা উপার্জন করিয়াছে, আবার নিজের সন্তানদের মানুষ করিয়াছে, তারপর হঠাৎ একদিন মারা গিয়াছে। সেও খুব অল্প দিনের কথা নয়, তবু আজও সেই লাবণ্যলতা বাঁচিয়া আছেন। চোখে কম দেখিতে পান, নিজে রাঁধিয়া খান।
কপালে কুঁচকানো চামড়া আরও কুঁচকাইয়া লাবণ্যলতা বলিলেন, তুই কে?
উত্তর আসিল, আমি।
–আমি? আমি কে?
সতী কাছে গেল, ইচ্ছা করিয়া কানের কাছে মুখ নিয়া বলিল, অজয় নামে একটা ছেলে আছে না? আমি তারই বন্ধু, নাম হল সতী।
লাবণ্যলতা নিজের মুখ সরাইয়া নিলেন, ঠোঁট উল্টাইয়া বলিলেন,
-ওমা—তোদের সব কান্ড! সোয়ামীর নাম মুখে আনা যেন হেলা খেলা, দিনে দিনে আরও কত দেখতে হবে। আবার বলা হচ্ছে বন্ধু, বন্ধুই যদি, তবে বন্ধুর বিহনে একবারও চোখের জল ফেলিসনে কেন শুনি? অমন তাজা সোয়ামিটাকেও ঘরে আটকে রাখতে পারলিনে কেন শুনি? তোদের ভালোবাসায় ছাই!
হাসিতে হাসিতে সতী বলিল, আমাদের তো কিছুই নয়, কিন্তু সেকালে আপনাদের ভালোবাসার নমুনা দু-একটি বলবেন শুনি?
-না, না, বাপু, অত বকবক করতে আমি পারিনে। একটু চুপ করিয়া থাকিয়া আবার বলিলেন, হুঁ আবার নাম রাখা হয়েছে সতী!
দীর্ঘ বারান্দার ওই পাশে ইলেকট্রিক আলো জ্বলিতেছে। উপরে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার শব্দ শোনা যায়। নীচে মনোরমা অথবা মেজছেলের ডাকাডাকি, ঝি চাকরদের কলরব। এদিকে কোনো সাড়া না পাইয়া লাবণ্যলতা মুখ ফিরাইয়া দেখিলেন, সতী নীরবে কাঁদিতেছে। —ওকি, কাঁদছিস? ওতে কাঁদবার কী হল? আমি ঠাট্টা করেছি বৈ তো নয়! হতভাগী, কাঁদিসনে তোর কান্না দেখে আমারও যে কান্না পায়। মুখটি কোলের মধ্যে টানিয়া লাবণ্যলতা তাহার মাথায় হাত বুলাইয়া দিতে লাগিলেন, একি, কুঁচবরণ রাজকন্যের অমন মেঘবরণ চুল কোথায় গেল? এযে খড়ের আঁটি। আর কদিন পরেই একদম নেড়া হয়ে যাবি যে। আমাদের সময় কেমন ছিল জানিস? চুলের ভারে গড়াগড়ি যেতাম মাটিতে।
এবার সতী মুখ তুলিয়া চাহিল, কিছুক্ষণ তাহার দিকে চাহিয়া শেষে হাসিয়া ফেলিল, লাবণ্যলতা হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিলেন, অনেকক্ষণ পরে ঝি দামিনী আসিল, ভাঙা বাসনের মতো বাজিয়া উঠিয়া বলিল, খাওয়া দাওয়া আপনার হবে না গো বৌঠান? সবাই তো খেয়ে উঠল।
যাওয়ার সময় লাবণ্যলতা সতীকে বলিয়া দিলেন, এবার এলে আমার ওষুধ নিয়ে যাস, স্বামীকে বশ করবি।
পরদিন দুপুরবেলা। বারোটা বাজিতে না বাজিতেই সমস্ত বাড়িটা একেবারে নিস্তব্ধ। মনোরমার চার ছেলে গিয়েছে কর্মস্থলে, বাড়ির ছেলেমেয়েরা যার যার ইস্কুলে অথবা কলেজে; আর মনোরমার মেজছেলের এক শালী লীলা, এখানে থাকিয়া কলেজে পড়ে। সেও কলেজে গিয়াছে।
সতী আস্তে আস্তে লাবণ্যলতার পেছনে গিয়া দাঁড়াইল, ডাকিল,-ঠাকুমা? তিনি ফিরিয়া চাহিলেন, তাহাকে দেখিয়া হাসিয়া ফেলিলেন। এইমাত্র স্নান করিয়া আসিয়াছে সতী। ভ্র জোড়া, চোখের পল্লব আর পক্ষে এখনও যেন জল লাগিয়া রহিয়াছে। ভিজা চুলগুলি খোলা, মাথায় ঘোমটা নাই। সিঁথি আর কপালে সিঁদুর।
—আমি যদি পুরুষ হতাম, তাহলে তোকে ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করতাম , বউ!
সতী হাসিয়া উঠিল, হাসিতে হাসিতে লাবণ্যলতার গায়ে ঢলিয়া পড়িল; তিনি চেঁচাইয়া উঠিলেন, উঃ, মাগো। বউ, তোর মতো আর একটিও দেখিনি। তোর মতো দস্যি নাকি আমি! ব্যাথা পাইনে?
হঠাৎ তাঁহার মুখে দুই হাত চাপিয়া সতী বলিল, চুপ, বউ নয়, সতী।
লাবণ্যলতা দুই চোখ কপালে তুলিলেন-সে কী! তুই কী এ বাড়ির বউ নয়? তোর আমি দিদিশাশুড়ী নই?
—না, না আমি আপনার বোন, বুঝলেন?
লাবণ্যলতা হাসিয়া বলিলেন, বুড়ো বেঁচে থাকলে সে সর্বনাশটা আজ হত বটে। বোন না হয়ে তার কাছাকাছি তো হতিস।
আজ একাদশী। লাবণ্যলতা খাওয়ার আয়োজন করিতেছিলেন। কিন্তু আয়োজনটা ভাতের দেখিয়া সতী আশ্চর্য হইয়া বলিল,-ওকি, ভাত-তরকারি যে?
–এ ছাড়া আরও খাওয়ার আছে কিছু বলিস?
সতী বোকার মতো বলিয়া ফেলিল, আজ না একাদশী!
উপরে সে একাদশী উপবাস-ক্লিষ্টা মনোরমার জন্য খাওয়ার বিপুল আয়োজন। দেখিয়া আসিয়াছে।
লাবণ্যলতা ফিরিয়া চাহিলেন। তাহার দিকে একদৃষ্টে কিছুক্ষণ চাহিয়া হঠাৎ হাসিয়া ফেলিলেন, বলিলেন, না বাপু আর পারিনে, ওসব আর সয় না। আমি মনে মনে হিসেব করেছিলাম কাল, ওরা কেউ আমায় বলেনি—সে যাক, ভালোই হয়েছে ওসব কী আর এখন সয়? এবার সহজ হওয়ার চেষ্টায় সতী সামনের দিকে ঝুঁকিয়া বলিল, দেখি কী রাঁধছেন?
সব আড়াল করিয়া লাবণ্যলতা বলিলেন, না না দেখে কাজ নেই। নিজের চরকায় তেল দাওগে বাপু।
—তাড়িয়ে দিচ্ছেন?
—হ্যাঁ। সই, তুই আমার কাছ থেকে যা, তোকে দেখে আমার হিংসে হয়।
