–তা না হলে কী? বল?
কালু আর কিছুতেই বলিতে চায় না, কোন ভুলে একবার আরম্ভ করিয়া হঠাৎ তাহার জিহ্বা আড়ষ্ট হইয়া গিয়াছে, প্রশান্ত অনেক পীড়াপীড়ি করিয়া তবে যা জানিতে পারিল তা সংক্ষেপে এই: বুড়ির শকুনির পরমায়ু, একথা কালু আগেই বলিয়াছে। তা না হইলে আর শূন্যগৃহে পাহারা দিতে অতগুলি বছর বাঁচিয়া থাকে! আহা মৃত্যুর সময় বুড়ি যা কষ্ট পাইয়াছে তা নাকি মর্মান্তিক। শেষের দিকে তো কেউ তাহার বাড়ির ত্রিসীমানায়ও যাইতে পারে নাই, কেউ ভুলেও তাহার কাছে গিয়া উপস্থিত হইলে সে যা-তা করিয়া গাল দিত, আর অভিশাপের তো অন্ত নাই। হয়তো মাথা খারাপ হইয়া গিয়াছিল। তাই কালুও শেষ পর্যন্ত খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করিয়াও আর পারে নাই। শেষে হঠাৎ একদিন শুনিল, বুড়ি মরিয়া গিয়াছে এবং বড়ো কষ্টেই নাকি মরিয়াছে। রান্নার কিছু নামাইতে গিয়া হয়তো পা-দুটি একেবারে পুড়িয়া গিয়াছিল। তাহাই পাকিয়া-ফুলিয়া একদিন জ্বর হইয়াছে এবং তারপরেই—
প্রশান্তর চোখে জল আসিল। মৃত্যুর কথা তো নয়, মানুষ মরিলেও অনেক সময় শান্তি পায় এবং অন্যকে দেয়। কিন্তু পৃথিবীর বুক হইতে শেষ নিশ্বাস গ্রহণ করিতে মৃত্যুকে লইয়া জীবনের এমন বিশ্রী কাড়াকাড়ি, যার শেষ দৃশ্য আরও নিষ্ঠুর আরও বিকট। সেই দৃশ্যের এমন তীব্র হীনতা যে চোখে জল আনিবে, এটা বিচিত্র নয়। কিছুক্ষণ পরে কালু হঠাৎ বাহিরে চলিয়া গেল, বলিল–
-বন্ধু, তুফান আইল!
–তুফান?
-হ! কী বাতাস ছাড়ছে গো! দেইখা যাও, দক্ষিণের আকাশটা কেমন লাল! লাল না, যেন আগুন?
—আগুন?
–হ বন্ধু, আগুন? কালু চেঁচাইয়া বলিতে লাগিল,—সামাল তরী, সামাল মাঝি ভাই, সামাল তরী, সামাল। গাছে-গাছে শোঁ শোঁ আওয়াজ করিয়া ভীষণ হাওয়া বহিতেছে, আকাশে চিড়-চিড়ে বিদ্যুৎ আর মেঘের ডাক, ঘরের খুঁটির সঙ্গে-সঙ্গে চালখানাও কাঁপিয়া উঠিল, পৃথিবীর কাতর প্রার্থনা যেন ঝড়ের পায়ে দারুণ কুটোপুটি খাইতেছে।
প্রশান্ত জড়োসড়ো হইয়া পড়িয়া রহিল।
ঘুম ভাঙিল আবার কালুর ডাকেই। বোধহয় সকাল হইতে আর বাকি নাই। মুরগির ডাক শোনা যায়। কী আশ্চর্য, এখন আকাশ একেবারে পরিষ্কার। প্রথম রাতের ঝড়ের কথা এখন স্বপ্ন বলিয়াই মনে হয়। দূরের আকাশে মধ্য রাতের চাঁদ উঠিয়াছে। কালু বলিল, বন্ধু, মাছ ধরিতে যাই।
কেন?
–বারে, তোমারে খাওয়ামু না? তুমি আমার অতিথি।
–এমন সময়?
–বারে, এই তো সময়। রাইতে তুফানের কথা ভুইলা গেছ বুঝি?
কালু একটা গান ধরিয়া দ্রুত চলিয়া গেল।
প্রশান্ত বাহিরে আসিল। চারিদিকে ফুটফুটে জ্যোৎস্না। আর কেমন একটা ভিজা গন্ধ।
প্রশান্ত হাঁটিতে লাগিল। ঝিরঝিরে বাতাসে তাহার চোখমুখ ভিজিয়া আসিল। ভোর না হইতেই নানারকম পাখির কলরব শুরু হইয়াছে, দুইপাশে পাট খেতের সারি; পাশে ঝুঁকিয়া সরু আলের পথটিকে প্রায় ঢাকিয়া ফেলিয়াছে। কিন্তু একী?
প্রশান্ত দেখিল, সেপাইর মতো খাড়া শুধু কয়েকখানা খুঁটি। মাটির স্তূপ, গভীর জঙ্গল, বট গাছের গাম্ভীর্য, ভয়াবহ নির্জনতা, অথচ সব জ্যোৎস্নায় উজ্জ্বল।
প্রশান্তর দুই চোখ যেন বুজিয়া আসে। এই কঙ্কালের দিকে সন্ধ্যাবেলা তাকাইতে পারিয়াছিল, অথচ এখন আর তাকাইতে পারে না। বুড়ির কাতর গোঙানি কি কেউ শোনে নাই? শেয়াল কুকুর আজও ঘুরিয়া বেড়ায়!
পূর্বদিকের আকাশ কি স্বচ্ছ হইয়া আসিতেছে?
প্রান্তর
রক্ষিতরা সম্পন্ন, অর্থে এবং পরিবার সভ্য সংখ্যাতেও।
রান্নাঘরে উনান রেহাই পায় না,—শিশুদের কলরবে দেয়াল রেহাই পায় না। প্রতিধ্বনি করিয়া ক্লান্তি আসে। যেন একটি ছোটো কারখানা। এ বাড়ির গুঞ্জনের সঙ্গে ভোরবেলা যেকোনো লোকের এমনি হঠাৎ পরিচয় হইলে মনে হয়, রাত থাকিতেই যেন এখানকার দিন-মানের কোলাহলের তোড়জোড় চলিতেছে। কোনো ছেলের ভোরে ইস্কুল, তাহার খাওয়ার ব্যবস্থা, বা কোনো শিশু রাত্রিশেষ কাঁদিয়া উঠিলে আর উপায় নাই। তারপর আস্তে আস্তে ভোর হয়, তাড়া খাইয়া চাকর বাকর ওঠে, সঙ্গে বাড়ির অন্যান্য ঘুমকাতর ছেলেমেয়েরাও। বাড়ির গৃহিণীকেই অতি সকালে উঠিতে দেখিয়া বধূরাও অতিকষ্টে আয়নার কাছে আসিয়া দাঁড়ায়, অবিন্যস্ত চুল অথবা কপালের সিঁদুর ঠিক করিয়া লয়।
মনোরমার পাঁচ ছেলে, চার মেয়ে। সবকটি ছেলেমেয়েরই বিবাহ হইয়াছে। মেয়েরা বেশির ভাগই থাকে দূর বিদেশে, কেবল ছোটো মেয়েটির এই শহরে বাস। ছেলেদের মধ্যে চারটি উপযুক্ত, অর্থাৎ যথেষ্ট অর্থ বহন করিয়া আনে। তারপর ছোটো ছেলেটির সম্বন্ধে বলিতে এইরূপ কোনো অশুভ প্রভাতে বাড়ি ঘিরিয়াছিল পুলিশ, তারপর কী হইয়াছিল মনোরমা জানেন না, জ্ঞান হইলে দেখেন, বাড়ি ঘিরিয়া পুলিশ নাই, ছোট ছেলে অজয়ও নাই। ছেলেটা মাত্র এম. এ. পাস করিয়াছিল,—নিজের ইচ্ছায় একটি গরিবের মেয়েকে বিবাহ করিয়াছে। এখানেই মনোরমার দুঃখ। ছেলেকে লইয়া অনেক আশা তিনি করিয়াছিলেন, বিলাত যাওয়ার খরচ সুন্ধু কত ডানাকাটা পরীর বাপও ঘোরাঘুরি করিতেছিল তাঁহার কাছে। তার উপর জেলে যাওয়া! দৈনিকপত্রের বহু বিজ্ঞাপিত ব্যাপার শেষে তাঁহারই ঘাড়ে আসিয়া চাপিল!
তারপর একটি বছর কাটিয়া গিয়াছে। এখন সবই আগের মতো সহজ। কক্ষের অভ্যন্তরে শিশুদের দাপাদাপি, কোলাহল, বধূদের চাপা হাসি, চুড়ির শব্দ চাকর বাকরের চেঁচামেচি, মনোরমার ব্যস্ততা—স্বামীর মৃত্যুতিথির উৎসব দিনেও এক ফোঁটা চোখের জল ফেলিবার সময় নাই।
