প্রশান্ত চারিদিকে একবার চাহিল। এ গাঁয়ের নবীন বা প্রাচীন আর কেউ এ পথে আসিয়া পড়িলে তাহাকে দেখিয়াও দেখিবে না, অথবা চাহিলেও একটা বিশেষ করুণার দৃষ্টিতে তাকাইবে, ইহা সে চায় না। বিশেষত তাহারা যখন দেখিবে এক ঝাঁক কঙ্কালসার মানুষের মধ্যে একটি মেদবহুল মাংসল পুরুষ।
প্রশান্ত বলিল: তোমার ঘরে চলো কালু।
ঘরের চালখানা প্রায় মাটিতে নামিয়া আসিয়াছে। উঠানে একটা ছোট নারকেল গাছ।
ঘুটঘুটে অন্ধকার। একেবারে কাছে না গেলে কিছুই চোখে পড়ে না।
উপুড় হইয়া প্রশান্ত ঢুকিল দাওয়ায়। তাহাকে বসিতে একখানা সিঁড়ি দিয়া কালু আলো আনিতে চলিয়া গেল। একটু পরেই কুপি হাতে ফিরিয়া আসিল। অগ্নিশিখাকে মধ্যবর্তী করিয়া এখন সবই স্পষ্ট দেখা যাইবে। কালু প্রশান্তর দিকে একদৃষ্টে চাহিয়া রহিল। অন্ধকারে অনর্গল বকিয়াছে সত্য, কিন্তু এখন বোবা হইয়া গেল।
প্রশান্ত বলিল: কালু, একী অবস্থা দেখছি।
-কী?
এদিক-ওদিক চাহিয়া প্রশান্ত বলিতে দ্বিধা বোধ করিল, বলিতে পারিল না।
কিন্তু কালু কিছুই বুঝিতে পারে নাই, এমন নয়। দুই হাঁটু একত্র করিয়া তার উপর হাত রাখিয়া সে ধীরে ধীরে বলিল : বন্ধু, তোমার ঘর ভাঙা গেছে, ধন আছে কিনা জানি না, আমার জন আছে এই একরকম, ধনের খোঁজও রাখি না, সবই নসিব, এই নসিবের খেলা।
কপালে আঙুল ঠুকিতে লাগিল কালু।
প্রশান্ত হাসিল।–হাস কেন?
প্রশান্ত আবার হাসিল, কিন্তু এবারও নিরুত্তর।
বারে মুখ টিপা-টিপা খালি হাস কেন?
কালু অধীর হইয়া উঠিল।
হাসি থামাইয়া প্রশান্ত বলিল : কি বলছিলে? নসিব, সবই নসিবের খেলা না?
-হ।
–কালু অমন কথা আর বোল না। দশজনের ভেতর নয়জন আমরা ভাল খেতে পরতে পাচ্ছিনে—কেউ না কেউ শুধু একবেলা খাচ্ছি, কারুর কোনরকমে দিন যাচ্ছে, আমাদের সকলের নসিব তাহলে খারাপ, তুমি এই মনে করো?
কালু স্তব্ধ হইয়া গেল। বাহিরের দিকে চাহিয়া কী ভাবতে লাগিল। কিছুক্ষণ পরে আবার হঠাৎ ডাকিয়া উঠিল: বাবা অলি, ও বাবা অলি। ডাকের সঙ্গে সঙ্গেই বাহিরের বিপুল অন্ধকার ঠেলিয়া একটি দশ-এগারো বছরের ছেলে আসিয়া হাজির হইল। খালি গা, পেট মোটা, হাত-পাগুলি সরু সরু পরনে শুধু একখানা গামছা; প্রশান্ত লক্ষ করিল, তাহার হাঁটায় কেমন একটা জড়তা; একদিকে নিবদ্ধ চোখের দৃষ্টি।
তাহার চোখে বিস্ময়ের চিহ্ন দেখিয়া কালু তাড়াতাড়ি বলিল : পোলা আমার অন্ধ, জনম হইতেই— তারপর ছেলের দিকে চাহিয়া—কিছু তামুক আইনা দে তো বাবা?ছেলে চলিয়া গেল।
প্রশান্ত বলিল, আর ছেলে নাই?
উত্তরে কালু জানাইল, আর দুই ছেলে ভিন্ন গ্রামের দুই বাবুদের বাড়িতে কাজ করে; বড়ো-ছোটো দুইজনে যথাক্রমে তিনটাকা আর আড়াই টাকা মাসে পায়।
কোনোরকমে উত্তরটা কালু মনে মনে ভাবিল, নসিব কিছুই নয়?
কিন্তু প্রশান্তর খাওয়ার ব্যবস্থা তো করিতে হইবে। ব্যবস্থা সহজেই হইল। মুড়ি চিড়া-গুড়, দুইটি পাকা আম, কিন্তু আশ্চর্য, খাওয়ার জল নাই। প্রশান্ত একরকম চেঁচাইয়া উঠিল, বারে জল কোথায়?
কালু এতটা ভাবিতে পারে নাই। তাহার কথা শুনিয়া এমনভাবে তাকাইল যেন—অর্থাৎ কুয়া সামনেই আছে, নিজ হাতে তুলিয়া খাও।
দারুণ প্রতিবাদ করিয়া প্রশান্ত বলিল : না না, ওসব না, তুমিই এনে দাও, আমার জাত মারা যাবে না, আমাদের কোনো জাত নেই।
কালু অবাক হইল। লোকটা চিরকালই এমনি, কৈশোরেও এমনি অল্পবিস্তর পাগলামি করিয়াছে, আজও সেই স্বভাব বদলায় নাই।
কিন্তু বিস্ময়ের ভাব অল্পক্ষণেই কাটিল। আবার মনে মনে সে ভাবিল, নসিব কিছুই নয়?
লোকটার কথামতো খড় দিয়া বিছানা পাতিয়া দেওয়া ছাড়া উপায় কী। কালু উপর হইতে বহু দিনের সঞ্চিত একটা নতুন কাঁথাও আনিয়া পাতিয়া দিল, বিচিত্র খড়ের বিছানায় পরম পরিতৃপ্তিতে শুইয়া প্রশান্ত ভাবিল, দীর্ঘ পঁচিশ বছরের অভিজ্ঞতায় মাটির শয্যাও তাহার কাছে মনোরম, সুখের সময়ে পরম অখাদ্যই শ্রেষ্ঠ খাদ্য—এখবর কালু রাখে কী!
খাওয়া-দাওয়া শেষ করিয়া একটু রাত করিয়াই কালু আবার আসিল। দাওয়ায় অনেকক্ষণ বসিয়া তামাক টানিল। ভিতরে তখনও জাগিয়া ছিল প্রশান্ত, শুইয়া শুইয়া তামাক খাওয়ার শব্দ শুনিতেছিল।
শেষে ভিতরে আসিয়া কালু আস্তে আস্তে ডাকিল, বন্ধু।
-বলো।
অন্ধকারে বিছানার পাশে বসিয়া কালু কী যেন একটু ভাবিল : তুমি আজকালও স্বদেশি কর?
প্রশান্ত মনে মনে হাসিল।সেদিন বড়ো ভুল করিয়াছিলাম বন্ধু, একলা পথ চলিয়াছিলাম। তোমাদের কথা কখনো ভাবি নাই, আজ আর সেই ভুল হইবে না। স্বদেশি করা কাকে বলে তা কালুই জানে।
প্রশান্ত কিছু না বলিয়া তাহার হাতটি শুধু ধরিল। কিছুক্ষণ চুপচাপ। চারিদিকে নিস্তব্ধ, মাঝে মাঝে কেবল নারকেল গাছে শব্দ, হাওয়ার দোলায়। এ ছাড়া টুঁ শব্দ শোনা যায় না।
প্রশান্ত বলিল : তুমি তখন বলেছিলে, আমার ঘর নাকি ভেঙেছে— কালু, বাবা-মার মৃত্যুর খবর আমি জানি, না জানলেও পঁচিশ বছর পরে ফিরে এসে তাঁদের দেখা পাওয়ার আশা করা উচিত নয়। কিন্তু আর মানুষ কোথায়? আমার পিসিমা, তার ছেলেমেয়েরা, ঠাকুরমা?
—তাঁরা! পিসীমারা তো তোমার বাবা যেই মইরা গেল তার কয়দিন পরেই চম্পট, এই শূন্যপুরীতে কে আর পইড়া থাকতে চায় কও? কিন্তু পইড়া রইল তোমার ঠাকুরমা, শূন্যি ঘর আগলাতে একা পইড়া রইল। বুড়ির শকুনির পরমায়ু, তা না অইলে আর এখানে আসিয়া কালুর গলার স্বর হঠাৎ থামিয়া গেল, যেন অন্ধকারে আস্তে আস্তে মিশিয়া গেল।
