আরও অনেক কিছু বললেন ব্রজকিশোরবাবু। কতোক্ষণ পরে সুব্রত প্রণাম করে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এল।
লীলাবতীকে পাওয়া গেল। কিন্তু কোনো রকমেই মালতীর দেখা পাওয়া গেল না।
সুব্রত স্টেশনে এল। টিকেট করে একটা নির্জন কামরা বেছে নিল। তারপর হুইসল দিয়ে গাড়ি ছাড়ল, শহরের সীমা ক্রমে বিলীন হয়ে গেল।
সুব্রত জানালায় মুখ রেখে বাইরের দিকে চেয়ে রইল। দু-পাশে তখন মাঝে মাঝে জলচিহ্নাঙ্কিত খোলা মাঠ, ধু ধু করে। আরও দূরে একটানা গাছের সারি, মধ্যে উঁচু তালগাছ।
মাঠ ভরা মধ্যাহ্নের প্রখর রৌদ্র ঝিম ঝিম করে।
সে এক টুকরো কাগজ নিয়ে লিখতে বসল। মালতীকে লিখতে লিখতে চোখে জল ভরে এল। সে কাগজটা তুলে জানালা দিয়ে হাত গলিয়ে ছেড়ে দিল।
প্রবল বাতাসের বেগে সেই চিঠি পড়ল গিয়ে এক বাবলা গাছের ছায়ায়। প্রান্তর পার হয়ে সেখানে গভীর বনানী-অজস্র বুনো ফুলের গন্ধ, তার মাদকতা, বাঁশঝাড়ে কিচ কিচ আওয়াজ, পাখীর ডাকে মুখরিত আকাশ, হিংস্র প্রাণীদের নির্ভয় বিচরণ, আর নির্জনতার গন্ধে ভরপুর।
গাড়ি চলে গেল।
আর মালতীকে লেখা সেই চিঠি বাবলা গাছের ছায়ায় বসে বুনোফুলের গন্ধ শুকতে লাগল।
প্রত্যাবর্তন
দীর্ঘ পঁচিশটা বছর পরে।
বিকালের রোদের নীচে সরু আলোর পথ দিয়া হাঁটিতে হাঁটিতে প্রশান্ত ভাবিল, দীর্ঘ পঁচিশটা বছর পরে আবার এই প্রথম সে গ্রামের দিকে পথ চলিতেছে। সেই পরিচিত পথ। সেই বুনোফুল-ঘাস-লতাপাতার গন্ধ, শুকনো পাতার স্কুপে, কোনো অদৃশ্য প্রাণীর খস খস শব্দ, হঠাৎ কখনো সারি সারি আকাশ-ছোঁয়া তালগাছের সামঞ্জস্যহীন অবস্থিতি, সেই খেয়াঘাটের নৌকা ও মাঝি। বছরের পর বছর, মুহূর্তের পর মুহূর্ত কত পরিবর্তন চলিতেছে, কত স্বেচ্ছাচারীর চোখেমুখে উল্লাস, কত ডাকাত পরের অন্নে মাথা ঠোকাঠুকি করে, অথচ এখানে তার ছোঁয়াটুকু নাই। পঁচিশ বছর আগের পুরুষরা একদিন আকাশের দিকে চাহিয়া নিরুপায়ে কাঁদিয়াছে, তার বংশধরেরা আজও কাঁদিতেছে, তাহাদের চোখমুখ ফুলিয়া গেল। আকাশে কি একটা পাখি চমৎকার ডাকিয়া গেল। কিন্তু সেদিকে চাহিতে প্রশান্তর ভয় হয়। যে আকাশের দিকে চাহিয়া তাহারা কপালে হাত ঠুকিয়াছে, সেই আকাশের দিকে প্রশান্ত তাকাইতে পারে না।
পথের একপাশে পাটখেতের ভিতর বসিয়া কয়েকটা লোক নিঃশব্দে খেত নিড়াইতেছে। হঠাৎ কখনো কোনো শহুরে চেহারার লোক দেখিলে পঁচিশ বছর বা তারও আগে তাহারা যেভাবে তাকাইত, আজও সেইভাবে তাকায়। চোখ ছোট করিয়া একজন বলিল, বাড়ি?—বাড়ি! প্রশান্ত মনে মনে একবার হাসিল। বাড়ি তাহার কোথায়! ভারতবর্ষের কোন গ্রামে বা শহরে বাড়ি?
পৌঁছিতে প্রায় সন্ধ্যা হইয়া গেল। প্রশান্ত দেখিল, একটি ঘর প্রায় ধসিয়াই গিয়াছে, আর একটা ঘরের চাল নাই, কেবল কয়েকটি খুঁটি—একটা বট গাছ। ঘরের উপর দিয়া একেবারে ঝাঁপাইয়া পড়িয়াছে, উঠান-ভিটা সমস্ত জঙ্গলে ভরা।
এই বাড়ি! এই বাড়ির ঠিকানাই প্রশান্ত পথের পাশের লোকদের বলিয়াও বলে নাই। পঁচিশ বছরের দীর্ঘ অজ্ঞাতবাসে সে বাঁচিয়া আছে বটে কিন্তু তাহার ছোটবেলার ক্রীড়াভূমি আত্মহত্যা করিয়াছে। কৈশোরের এই প্রাঙ্গণ হইতেই সে তাড়িত, কি একটা কারণে সংসারে একটা ভীষণ অনর্থ সৃষ্টি করায় শান্তিপ্রিয় বাবার চক্ষুশূল হওয়া, আর আজ এতকাল পরে তাহাকে আমন্ত্রণ করিতে একটি প্রাণীও নাই। প্রশান্ত ভাবিল, এখনো কেউ তাহার দিকে সন্দেহের চোখে চাহিতেছে কেন? লোকগুলি কি রাতারাতি মানুষ হইয়া গেল? সন্ধ্যার ঝাপসা আলোয় দুই-একজন যদি-বা তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাহার দিকে তাকাইয়াছে, প্রশান্ত তাহাদের কষ্ট করিয়াও চিনিতে পারে নাই। নিশ্চয় তাহারাও তাহাকে চেনে না।
কয়েকটা চামচিকা ঝটপট তাহার মাথার উপর দিয়া উড়িয়া গেল। আশেপাশে নানা রকম কীটপতঙ্গের অবিশ্রান্ত চেঁচামেচি শশানা যায়, বন্য লতাপাতার একটা
অদ্ভুত গন্ধও নাকে আসে।
বাঁদিকের একটা রাস্তা হইতে, প্রশান্ত যে পথে চলিতেছিল, সেই পথে পড়িয়া কে একটা লোক নিজের মনে গান গাহিতে গাহিতে সামনের দিকে চলিতেছে, তাহার পরনে লুঙ্গি, কাঁধে একখানা গামছাই হইবে, হাতে একটা নিড়ানি।
প্রশান্ত একেবারেই সামনে গিয়া পড়িল, বলিল, কালু মিঞা না?
লোকটা থামিল, গানও থামিল, ভ্রূ কুঁচকাইয়া তাহার দিকে তাকাইল।
সে যে কালু মিঞা ছাড়া আর কেহই নয়, ইহাতে নিশ্চিত হইয়া প্রশান্ত একবার হাসিল।-চিনতে পারলে না?
কালুর চোখের দৃষ্টি এবার সহজ হইয়া আসিল, ঠোঁটের দুইপাশে আস্তে আস্তে হাসি ছড়াইয়া পড়িল, তাহার দিকে একবার হাত বাড়াইয়া আবার কি মনে করিয়া আস্তে গুটাইয়া তাড়াতাড়ি বলিল : বন্ধু না?
হাত ধরিতে তাহার সঙ্কোচ দেখিয়া প্রশান্ত নিজেই হাত বাড়াইয়া দিল, হাসিয়া বলিল, হ্যাঁ।
কালু আবার বলিল, বন্ধু-মশয় না?
-হ্যাঁ কালু।
বিস্ময়ে আর আনন্দে এবার তাহার হাত জড়াইয়া ধরিয়া কালু বলিল : এতকাল কই আছিলা গো, বন্ধু-মশয়? সেই কোন কালে গেলা, আর এতদিন বাদে ফিরা আইলা, একটা দুইটা দিন নাকি? আহারে, যে বুড়া বইনা গেছে দেখছি!
-আর তুমি খুব জোয়ান না?
—আমরা গেরামে থাকি, রৈদে বিষ্টিতে, ভিজে খাটি-পিটি, আমাগোর কথা ছাড়ান দাও–
