—অনেক কিছু। কিন্তু তুমি কী সে সব দেখবে? যেন সেখানে তারা ইতিমধ্যে চলে গেছে এভাবে সুব্রত বললে।
—না।—স্পষ্ট এই বলে মালতী তার কাপড়ের আঁচল এমনি পাকাতে লাগল।
সুব্রত তার হাতের দিকে চেয়ে রইল। সুন্দর, নিটোল, ফর্সা, অনেকগুলি চুড়িতে ভরতি আঙুলগুলো সরু, শীর্ণ-কথার সঙ্গে এঁকে বেঁকে নড়ছে।
সে বললে, ভারী সুন্দর তো! দেখি তোমার হাতখানা। মালতীর চোখে বিস্ময় নেমে এল। ধীরে হাত বাড়িয়ে দিয়ে ক্ষণেক পরে সে অনুভব করল : একটি আলোর রেখা যেন তার হাতের লোমকূপ দিয়ে প্রবেশ করে শরীরের অণু-পরমাণুতে উচ্ছ্বসিত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
এখন বোধ হয় শ্বাস-প্রশ্বাসের যন্ত্রীকে আক্রমণ করেছে, নইলে শ্বাস ফেলতে কষ্ট হয় কেন? সে স্তব্ধ হয়ে তার দিকে পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। সুব্রত বলেল, তুমি খেয়েছো? যাও—
বিছানার উপর হাত দুটো আরও ছড়িয়ে আরও চেপে বসে মালতী বললে, মার সঙ্গে খাব—আপনার এখন ঘুম আসবে না আমি জানি।
–সেটা তো তোমারই আগে জানবার কথা।
কিছুমাত্র অপ্রতিভ না হয়ে মালতী হেসে বললে, বারে আপনি আবার তা জানলেন কেমন করে?
সুব্রত সে কথার কোন উত্তর না দিয়ে বিছানায় গিয়ে গা এলিয়ে বললে, মালতী, আমার সত্যি বড়ো ঘুম পাচ্ছে। তুমি এনে দেবে তাতে একটা স্বপ্ন?
হে মালতী!
স্বপ্নাঞ্চল মেলে ধরো আমার চোখেতে!
মালতীর দু-চোখ কী এক স্নিগ্ধতায় নিবিড় হয়ে উঠল। সে একুট ঝুঁকে পড়ল।
কোনো এক অলিখিত কাব্য টুকরো টুকরো হয়ে সেই ঘরের বাতাসে শূন্যতায় গভীরভাবে মিশে গেল।
আলোর রেখাগুলো যেন কাঁপতে লাগল।
–মালতী—ও মালতী–
লীলাবতী এসে ভয়ানক চমকে উঠলেন। মালতী তার রেশমের মতো হালকা, মসৃণ খোলা চুলগুলি খোঁপায় ঠিক করতে করতে মার কাছে এসে মুখ নীচু করে দাঁড়াল।
বাইরের দুরন্ত বাতাস ঘরে এসেও মাতামাতি করছে। সুব্রত একা নিদ্রাহীন বাইরের অন্ধকারের দিকে চেয়ে রইল। তার মনে হল : ব্রজকিশোর বাবুর মতো সেও যেন আজ কোন আর এক পদ্মার প্রবল কলোচ্ছ্বাস শুনতে পাচ্ছে।
যখন সে জাগল তখন একটু বেলা হয়ে গেছে। অনেকখানি রোদ ছড়িয়ে পড়েছে বিছানার। সে ব্রজকিশোরবাবুর উঁচু গলায় স্পষ্ট মন্ত্রোচ্চারণ শুনতে পাচ্ছে।
লীলাবতী গম্ভীর প্রকৃতির মেয়ে। কিন্তু চিরকালই ঠিক এমনি ছিলেন কি না তা অজ্ঞাত। আজ কতোদিন হয় কে জানে—আশ্চর্য ব্যাপার-স্বামীর সঙ্গে তাঁর এতটুকু কথা পর্যন্ত হয় না। ছোটো চৌধুরী পরিবারে এ নিয়ে কোনো অসুবিধে বড়ো দেখা যায়নি। এবং এত সহজ যে, যে কেউ প্রথম এলে তার চোখে এটা ধরা পড়বে না, যে পর্যন্ত না কেউ বলে!
এমনিও দেখা যায়, লীলাবতীর আত্মমর্যাদাবোধ বড়ো প্রখর। বোধ হয় তাতে কোনোদিন কোনো আঘাত লেগেছিল এবং সেইজন্য তিনি তাঁর নিজের স্বামীকেও সইতে পারেননি।
কিন্তু এতদিন সাংসারিক সব কিছু অভাব-অভিযোগ, ত্রুটি একা নিজের মনেই বিচার করে সফল হয়েও আজ সত্যি জটিলতায় পড়ে পথ হারিয়ে ফেললেন, তারপর সারারাত ভেবে কোনো কুলকিনারাই পেলেন না।
এখন অনেক বেলা হয়েছে। লীলাবতী কাজের ফাঁকে কেবল ভাবতে লাগলেন। এরকম মানসিক দ্বন্দ্বে সারাজীবনে আর পড়েননি।
শেষে একটা উপায় স্থির হল।
তখন দুপুরবেলা। বাইরে রৌদ্র খাঁ-খাঁ করছে। চারিদিকে অখন্ড নিস্তব্ধতা।
লীলাবতী যেভাবে সাধারণত থাকেন সেভাবেই ঘোমটা দিয়েই ব্রজ কিশোরবাবুর ঘরে ঢুকলেন। কতোদিন পর এই প্রথম তাঁর এ ঘরে আসা এবং কথা বলা!
কিন্তু ব্রজকিশোর বাবু আশ্চর্য হলেন না। যেন সব সময়েই কথাবার্তা হয় এমন ভাবে অথচ গাম্ভীর্য বজায় রেখে বললেন, কোনো কথা আছে?
–হ্যাঁ। লীলাবতীর কোনো ভূমিকার প্রয়োজন ছিল না, তিনি সহজভাবেই বললেন, মালতীর বিয়ের তো কিছুই করা হচ্ছে না?
-পেলে তো হবে।
—আমি বলি সুব্রতর সঙ্গে—
ব্রজকিশোর বাবুর চোখদুটি বড়ো হয়ে উঠল।-কী বললে? নলহাটির চৌধুরীদের মেয়ের বিয়ে হবে একটা সামান্য…তোমার আত্মীয় বলে জাত খোয়াতে যাব? অর্থ-অসামর্থ্যের সুযোগ নিচ্ছ? মেয়েকে জলে ভাসিয়ে দিলেও তা হবে না, কক্ষনো না, মরে গেলেও না। অতিথিকে আদরযত্ন করা মানেই কী তার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেয়া?
–দেয়ার কারণ ঘটেছে বলেই বলছি।
ব্রজকিশোরবাবু প্রথম একটু আহত হয়ে পরে আবার কঠিন স্বরে বললেন, যা ইচ্ছে ঘটুক, তুমিই একমাত্র সেটা জানো, লোকের মধ্যে রটে গেলে তুমিই সেজন্য দায়ী থাকবে। কিন্তু তাও যদি হয় তবু ওর সঙ্গে আমি মেয়ের বিয়ে দিতে পারব না, দেব না জেনো। রায়চৌধুরী বংশের এমন অপমান করলে পূর্বপুরুষেরা অভিশাপ দেবেন। আমি ঠিক জানি তাঁদের মৃত আত্মা শান্তি পাবে না।
লীলাবতী সেখানে আর এক মুহূর্ত না থেকে নিজের ঘরে এসে দরজা দিলেন। মেয়ের কথা মনে করে আজ অনেক দিন পরে এই প্রথম তাঁর দুচোখ ছাপিয়ে কান্না এল।
পরদিন।
সুব্রত ঠিকই চলে যাচ্ছিল। জিনিসপত্র সঙ্গে তেমন কিছু নেই। যা আছে, ঠিক করা হয়েছে।
বারোটায় গাড়ি।
লীলাবতীর কচিৎ সাক্ষাৎ মিলেছে। আর মালতীর তো একেবারেই নয়। খাওয়া দাওয়ার পর সে ব্রজকিশোর বাবুর ঘরে এল।
তিনি বললেন, এখনও তো সময় আছে। বসো।
সুব্রত বসল।
—আমার ইচ্ছে তুমি পুজো পর্যন্ত থাকো।
-সে তো অনেক দেরি?
-তা হোক না। বাঙালির ছেলে পুজো না দেখতে পারলে তার চেয়ে দুর্ভাগ্য কী আছে? তা ছাড়া আমরা তোমার পর নই। তুমি থাকলে কত আনন্দ হত। পূর্বপুরুষেরা যা রাজসিকভাবে করেছেন তাই কোনো রকমে চালিয়ে নিই আর কী! তখনকার দিনে যা হত তা শুনলে আশ্চর্য হবে, বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হবে না, এখন তো তার শতাংশের একাংশও নয়। আর একটা ব্যাপার শুনলে অবাক হবে–আমার বাবা এবং তাঁর পূর্বপুরুষেরা সকলে নিজেরাই দুর্গাপুজো করেছেন, কোনো বামুন পুরুত লাগেনি, আর এমন মন্ত্র জানতেন যা অনেক সংস্কৃতজ্ঞ পন্ডিতেরাও জানেন না। অথচ আমি তাঁরই ছেলে। বংশানুক্রমিক গৌরব অর্জন না করার ধৃষ্টতা আমার আছে!
