জায়গাটা ঠিক নির্জন বলা চলে না। সামনেই নদীতে সার-সার নৌকো বাঁধা আর তার উপরে মাঝিমাল্লাদের কথাবার্তা। দূরে একটা ছাই রঙের জাপানি জাহাজ এসে নোঙর ফেলেছে। আরও দূরে, খিদিরপুরের দিকটায়, সন্ধ্যায় আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাস্তুল আর কপিকলের ঝাড়।
বাঃ, বেশ জায়গা।
বেঞ্চিটায় বসা যাক।
ওই যে শুকতারা, স্টিমারের ধোঁয়ার ভিতর দিয়ে আবছা আবছা দেখা যায়।
বদনবাবুর মনে হল যেন অনেকদিন তিনি এতখানি আকাশ একসঙ্গে দেখেননি। আহা, কী বিরাট, কী বিশাল! এমন না হলে কল্পনার পাখি ডানা মেলে উড়বে কী করে?
বদনবাবু ক্যাম্বিসের জুতোটা খুলে পা তুলে বাবু হয়ে বসলেন।
আজ তিনি, একটা কেন, অনেকগুলো গল্পের প্লট ফাঁদবেন এখানে বসে। এতদিনের অভাব মিটিয়ে নেবেন।
বিলটুর খুশি-ভরা মুখটা তিনি যেন চোখের সামনে দেখতে পেলেন।
.
নমস্কার!
এই রে! এখানেও ব্যাঘাত?
বদনবাবু ফিরে দেখলেন একটি লিকলিকে রোগা লোক, বছর পঞ্চাশেক বয়স, পরনে খয়েরি কোট-প্যান্ট, কাঁধে চটের থলি। সন্ধ্যার ফিকে আলোয় মুখ ভাল বোঝা যাচ্ছে না, তবে চোখের দৃষ্টি যেন অস্বাভাবিক তীক্ষ্ণ।
আর ওটা কী? স্টেথোস্কোপ নাকি?
ভদ্রলোকের বুকের কাছে একটি ঝোলায়মান যন্ত্র থেকে দুটি রবারের নল বেরিয়ে তাঁর কানের মধ্যে ঢুকেছে।
আগন্তুক মৃদু হেসে বললেন, ‘ডিসটার্ব করছি না তো? কিছু মনে করবেন না। আপনাকে এখানে আগে কখনও দেখিনি, তাই…’
বদনবাবু বেজায় বিরক্ত হলেন। বেশ তো নিরিবিলি ছিলাম রে বাপু! কেন মিছে গায়ে পড়ে আলাপ রা? সব মাটি হয়ে গেল। বেচারি বিলটুকে কী কৈফিয়ত দেবেন তিনি?
মুখে বললেন, ‘আগে আসিনি, তাই দেখেননি আর কি। এতবড় শহরে দেখার চেয়ে না-দেখার লোকের সংখ্যাই বেশি নয় কি?’
আগন্তুক বদনবাবুর শ্লেষ অগ্রাহ্য করে বললেন, আমি আসছি আজ চার বছর ধরে, সমানে।
‘ও।‘
‘ঠিক এইখানে। এই একই জায়গায়। এই বেঞ্চিতে। এটাই আমার এক্সপেরিমেন্টের জায়গা কিনা!’
এক্সপেরিমেন্ট? গঙ্গার ধারে খোলা মাঠে আবার এক্সপেরিমেন্ট কী? লোকটা ছিটগ্রস্ত নাকি?
কিংবা যদি অন্য কিছু হয়? গুণ্ডা-টুণ্ডা জাতীয় কিছু? কলকাতা শহর তো, কিছুই বলা যায় না।
সর্বনাশ! বদনবাবু আজ মাইনে পেয়েছেন। ট্যাঁকে রুমালে বাঁধা দু’খানা কড়কড়ে একশো টাকার নোট। তা ছাড়া পকেটে মানিব্যাগে নোট-খুচরো মিলিয়ে পঞ্চান্ন টাকা বত্রিশ নয়া পয়সা।
বদনবাবু উঠে পড়লেন। সাবধানের মার নেই।
‘সে কী মশাই? চললেন? রাগ করলেন নাকি?
‘না। না।’
‘তবে? এই তো বসলেন। এর মধ্যেই উঠছেন?’
সত্যিই তো! তিনি এমন ছেলেমানুষি করছেন কেন? ভয় কীসের? ত্রিশ গজ দূরে সামনের নৌকোগুলোতে অন্তত শখানেক লোক।
বদনবাবু তাও বললেন, ‘যাই, দেরি হল।’
‘দেরি? সবে তো সাড়ে-পাঁচটা।’
‘অনেকখানি পথ যেতে হবে।’
‘কতখানি?’
‘সেই বাগবাজারে।’
‘আরে রাম রাম। তাও যদি বলতেন শ্রীরামপুর কি চুচড়োকি নিদেনপক্ষে দক্ষিণেশ্বর।’
‘তাও কম কী? ট্রামে করে পাক্কা চল্লিশ মিনিট। তার উপর দশ মিনিটের হাঁটা তো আছেই।’
‘তা বটে!’
আগন্তুক হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলেন। তারপর বিড়বিড় করে বললেন, ‘চল্লিশ প্লাস দশ–পঞ্চাশ।…আমি আবার মিনিট-ঘণ্টার হিসেবটায় ঠিক অভ্যস্ত নই। আমাদের হচ্ছে…বসুন না! একটুক্ষণ বসে যান।’
বদনবাবু বসলেন।
আগন্তুকের গলার স্বর আর চোখের চাহনির মধ্যে কী জানি একটা আছে যার জন্য বদনবাবু তাঁর অনুরোধ উপেক্ষা করতে পারলেন না। মনে মনে ভাবলেন, একেই বোধহয় বলে হিপ্নটিজম।
আগন্তুক বললেন, আমি যাকে-তাকে আমার পাশে বসতে বলি না। আপনাকে দেখে মনে হল আপনি ভাবুক লোক। কেবলমাত্র টাকা-আনা-পাই-এর হিসেব নিয়ে পৃথিবীর মাটি আঁকড়ে পড়ে থাকেন না, যেমন আর নিরানব্বই পয়েন্ট নাইন রেকারিং পারসেন্ট লোকে থাকে।…কেমন, ঠিক বলিনি?’
বদনবাবু আমতা-আমতা করে বললেন, ‘আজ্ঞে মানে..’
আপনি বিনয়ীও বটে! সেও ভাল। বড়াই আমি পছন্দ করি না। বড়াই করতে চাইলে আমার চেয়ে বেশি কেউ করতে পারত না।
আগন্তুক থামলেন। তারপর কান থেকে নল দুটো খুলে যন্ত্রটা পাশে বেঞ্চির উপর রেখে বললেন, ভয় হয়। অন্ধকারে অসাবধানে সুইচে হাত পড়ে গেলেই কেলেঙ্কারি।
বদনবাবুর ঠোঁটের ডগায় একটা প্রশ্ন এসে আটকে ছিল, এবার বেরিয়ে পড়ল। —
‘আপনার ও যন্ত্রটা কি স্টেথোস্কোপ, না অন্য কিছু?’
ভদ্রলোক প্রশ্নটা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে গেলেন। ভারী অভদ্র তো! উত্তরের বদলে একটা অবান্তর প্রশ্ন করে বসলেন, আপনি লেখেন?
‘লিখি মানে–গল্প?’
‘গল্প হোক, প্রবন্ধ হোক, যা-ই থোক। ব্যাপারটা হচ্ছে, ও জিনিসটা আমার ঠিক আসে না। অথচ এতসব কীর্তি, এত অভিজ্ঞতা, এত গবেষণা–এগুলো সব ভবিষ্যতের জন্য লিখে যেতে পারলে ভাল হত।’
অভিজ্ঞতা? গবেষণা? লোকটা বলে কী?
‘পর্যটক ক’রকম দেখেছেন?’
লোকটার প্রশ্নগুলোর সত্যিই কোনও মাথামুণ্ড নেই। পর্যটক একটা দেখবারই বা সৌভাগ্য কতজনের হয়?
বদনবাবু বললেন, পর্যটক যে একরকমের বেশি হয় তাই তো জানতাম না।
‘সে কী! তিনরকম যে-কেউ বলতে পারে। জলচর, স্থলচর আর ব্যোমচর। প্রথম দলে ভাস্কো-ডা-গামা, ক্যাপ্টেন স্কট, কলম্বাস ইত্যাদি। স্থলে হিউয়েন সাং, মাঙ্গো পার্ক, লিভিংস্টোন, মায় আমাদের গ্লোব ট্রটার উমেশ ভটচায পর্যন্ত। আর আকাশেধরুন, প্রফেসর পিকার্ড, যিনি বেলুনে পঞ্চাশ হাজার ফুট উঠেছিলেন, আর এই সেদিনের ছোঁকরা গাগারিন। অবিশ্যি এগুলো সবই খুব মামুলি। আমি যে ধরনের পর্যটকের কথা বলছি সেটা জলেও নয়, মাটিতেও নয়, আকাশেও নয়।’
