রমণীমোহনকে সুস্থ হবার সময় দিয়ে পনেরো দিন পরে শুটিং রাখা হল। অন্যদের কাজের তারিখ আর স্টুডিওর বুকিংও সেভাবে বদলে দেওয়া হল। যাদের দলে টেনে নেবার কথা তাদের সকলকেই তালিম দেওয়া হয়ে গেছে। আমার জায়গায় নতুন প্রোডাকশন ম্যানেজার এসে গেছে। তাঁকেও দলে টেনে নিয়েছি, কারণ প্রোডাকশন ম্যানেজারের কাছে কোনও কিছু লুকোনো বড় কঠিন ব্যাপার। আমি মুস্তাফি মশাইকে অবিশ্যি জানিয়ে দিয়েছি যে একটা ভাল চান্স পেয়ে বোম্বে চলে যাচ্ছি, এ ছবিতে আর আমার কাজ করা সম্ভব হবে না।
যথারীতি শুটিং-এর দিন এসে পড়ল। সকাল দশটায় রমণীমোহনের লাল শেভ্রোলে এসে ঢুকল ভারত মাতা স্টুডিওতে। তার থেকে আলমগীরের বেশে নামলেন তারিণী বাঁড়জ্জে কার বাপের সাধ্যি ধরে যে অ্যাকটর চেঞ্জ হয়ে গেছে!
সেই একই দৃশ্য ভোলা হবে, সব তৈরি, সবাই তৈরি, স্টার্ট সাউন্ড বলে চেঁচিয়ে উঠলেন পরিচালক। সাউন্ডম্যানের কাছ থেকে উত্তর এল রানিং।
অ্যাকশন।
আলমগীর তাঁর বাবার সামনে এসে অত্যন্ত সাবলীলভাবে তাঁর কথা বলে গেলেন; শট-এর শেষে পরিচালক কাট বলতেই হাততালিতে স্টুডিও গমগম করে উঠল।
সারাদিনের তেরোটি শট-এর একটিতেও রমণী-তারিণী ঠেকলেন না।
ছবি শেষ হতে লাগল পাঁচমাস। তোরা তখন জন্মাসনি তাই তোদের খবরটা দিতে হচ্ছে যে আলমগীর হয়েছিল সুপারহিট, আর রমণীমোহন বছরের শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে তিনটে সংস্থা থেকে পুরস্কার পেয়েছিলেন। অবিশ্যি তাঁর কেরিয়ারের শুরু এবং শেষ এই একটি ছবিতে, কারণ তাঁর গুরু তাঁকে ফিল্মে অভিনয় করতে বারণ করায় সে প্লাস্টিকের ব্যবসায় চলে যায়। আর আমি হয়তো নিজের নামে ছবিতে একটা চান্স নিতে পারতুম, কিন্তু তখনই উদয়পুরে একটা ভাল চাকরি জুটে গেল। আমার কাছে তখন থেকেই নতুন দেশ দেখার চেয়ে বড় আর কিছু নেই, তাই আর দ্বিধা না করে পাড়ি দিলুম রাজস্থানে। অবিশ্যি সেটা আরেক গল্প।
তা হলে সেটাও হোক। বলল ন্যাপলা।
তা কী করে হবে, বললেন তারিণীখুড়ো, আগে যেটা বলছি সেটা শেষ হোক।
আমরা তো অবাক। এ গল্পে আর কী থাকতে পারে?
আমি যে দ্বৈত ভূমিকা বা ডবল পার্ট করেছিলুম সেটাই তো তোদের বলা হয় নি। বললেন তারিণীখুড়ো, তাঁর ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি।
কীরকম, কীরকম? আমরা সকলে একসঙ্গে বলে উঠলাম।
আমার বন্ধু ব্ৰতীনকে দিয়ে রমণীমোহনকে আমিই বলালুম যে নতুন কাজে নামার আগে একবার ভাগ্য গণনা করিয়ে নাও। তখন ব্রতীনই তো জ্যোতিষার্ণবকে নিয়ে যায় রমণীমোহনের কাছে। কে সেই জ্যোতিষার্ণব? হুঁ হুঁ–স্বয়ং তারিণীচরণ বাঁড়জ্জে। নিজের হাতে তৈরি মেক-আপ, নিজের হাতে লেখা সংলাপ। বাজিমাত না হয়ে যায় কোথায়?
সন্দেশ, বৈশাখ ১৩৯২
টেরোড্যাকটিলের ডিম
বদনবাবু আপিসের পর আর কার্জন পার্কে আসেন না।
আগে ছিল ভাল। সুরেন বাঁড়ুজ্যের স্ট্যাচুর পাশটায় ঘণ্টাখানেক চুপচাপ বসে বিশ্রাম করে তারপর ট্রামের ভিড়টা একটু কমলে সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় শিবঠাকুর লেনে বাড়ি ফিরতেন।
এখন ট্রামের লাইন ভিতরে এসে পড়ায় পার্কে বসার আর সে আনন্দ নেই। অথচ এই ভিড়ে গলদঘর্ম অবস্থায় ঝুলতে ঝুলতে বাড়ি ফেরাই বা যায় কী করে?
আর শুধু তাই নয়। দিনের মধ্যে একটা ঘণ্টা অন্তত একটু চুপচাপ বসে থেকে কলকাতার যেটুকু খোলামেলা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আছে সেটুকু উপভোগ করা–এ না হলে বদনবাবুর যেন জীবনই বৃথা। রোনি হলেও কল্পনাপ্রবণ তিনি। এই কার্জন পার্কেই বসে মনে মনে তিনি কত গল্পই কেঁদেছেন। কিন্তু লেখা হয়ে ওঠেনি কোনওদিন। সময় কোথায়? লিখলে হয়তো নামটাম করতে পারতেন এমন বিশ্বাস তাঁর আছে।
অবিশ্যি গল্পগুলো যে সবই মাঠে মারা গেছে তা নয়।
তাঁর পঙ্গু ছেলে বিলটু এখন বড় হয়েছে। সাত বছর বয়স তার। সে বিছানা ছেড়ে উঠতে পারে না। ফলে তার অনেকখানি সময় হয় মার কাছে না-হয় বাবার কাছে গল্প শুনে কাটে। জানা গল্প, ছাপা গল্প, ভূতের গল্প, হাসির গল্প, দেশবিদেশের রূপকথা, উপকথা, প্রায় সবই তার গত তিন বছরে শোনা হয়ে গেছে। কম করে হাজার গল্প। ইদানীং বদনবাবু তাকে রোজ রাত্রে শোয়ার আগে একটি করে নতুন গল্প বানিয়ে বলেছেন। এ গল্প তাঁর কার্জন পার্কে বসেই বানানো।
কিন্তু গত একমাসে এ নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটেছে অনেকবার। যেকটি গল্প বলেছেন তাও যে তেমন জমেনি তা বিলটুর মুখ দেখেই বোঝা গেছে। তা হবে না-ই বা কেন? একে তো এমনিতেই আপিসে কাজের চাপ, তার উপরে বিশ্রামের জায়গাটির সঙ্গে চিন্তার সুযোগটিও যে লোপ পেয়েছে।
কার্জন পার্ক ছাড়ার পর ক’দিন লালদিঘির ধারটায় গিয়ে বসেছিলেন। ভাল লাগেনি। টেলিফোনের ওই অতিকায় রাক্ষুসে বাড়িটা আকাশের অনেকখানি খেয়ে ফেলে সব মাটি করে দিয়েছে।
তারপরে অবিশ্যি লালদিঘির মাঠেও চলে এসেছে ট্রামের রাস্তা এবং বদনবাবুও বিশ্রামের অন্য জায়গা খুঁজতে বাধ্য হয়েছেন।
.
আজ তিনি এসেছেন গঙ্গার ধারে।
আউটরাম ঘাটের দক্ষিণে, রেললাইনের ধার দিয়ে পোয়াটাক পথ গিয়ে এই বেঞ্চি। ওই দেখা যাচ্ছে তোপের কেল্লা। লোহার শিকের মাথায় বলটা এখনও রয়েছে। যেন কাঠির ডগায় আলুর দম।
বদনবাবুর ইস্কুলের কথা মনে পড়ে গেল। একটা বাজলেই গুডুম করে তোপের শব্দ, আর টিফিনের ছুটি, আর হেডমাস্টার হরিনাথবাবুর ট্যাঁকঘড়ি মেলানো।
