‘তবে?’
‘কালে!’
‘মানে?’
‘কালের মধ্যে ঘোরাফেরা। অতীত কালে পাড়ি, আগামী কালে সফর। ইচ্ছেমতো ভূত ভবিষ্যতে বিচরণ। বর্তমানে তো আছিই, তাই ওটা নিয়ে আর মাথা ঘামাই না।’
এতক্ষণে বদনবাবুর কাছে ব্যাপারটা পরিষ্কার হল। বললেন, এইচ. জি. ওয়েস-এর কথা বলছেন ত? টাইম মেশিন? সেই যে একটা সাইকেলের মতো জিনিসে চেপে একটা হ্যান্ডেল টানলেই অতীত যুগে, আর আরেকটা টানলেই ভবিষ্যতে চলে যায়? সেই যে-গল্পটা নিয়ে একটা বিলিতি বায়োস্কোপ হয়েছিল?
ভদ্রলোক একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন, ‘সে তো গল্প। আমি বলছি সত্যি ঘটনা। আমার ঘটনা। আমার অভিজ্ঞতা। আমার মেশিন। কোনও সাহেব-লিখিয়ের মনগড়া গাঁজাখুরি গল্প নয়।
কোথায় যেন একটা স্টিমারের ভোঁ বেজে উঠল।
বদনবাবু ঈষৎ চমকে হাত দুটোকে চাদরের ভিতর ঢুকিয়ে জড়সড় হয়ে বসলেন। কিছুক্ষণ বাদে নৌকোর বাতিগুলো ছাড়া আর কিছু দেখা যাবে না।
ঘনায়মান অন্ধকারে আরেকবার আগন্তুকের মুখের দিকে চাইলেন বদনবাবু। সন্ধ্যার আকাশের শেষ রঙটুকু তাঁর চোখের মণিতে।
আগন্তুক আকাশের দিকে মুখটা তুলে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘হাসি পায়। তিনশো বছর আগে, এইখানে, ঠিক এই বেঞ্চিটার জায়গায়, একটা কুমির ও তার মাথার উপর একটি বক বসে রোদ পোহাচ্ছিল। ওই খড়ের নৌকোটার জায়গায় একটা পাল-তোলা ওলন্দাজ জাহাজের ডেক থেকে এক নাবিক একটি গাদা বন্দুক দিয়ে কুমিরটাকে মারে। এক গুলিতেই কুমির শেষ। বকটি ঝটপটিয়ে উড়ে পালাবার সময় তার একটি পালক খসে আমার পায়ের সামনে পড়ে। এই সেই পালক।’
আগন্তুক থলির ভিতর থেকে একটা ধবধবে সাদা পালক বার করে বনবাবুর হাতে দিলেন।
‘লাল ছিটেফোঁটাগুলো কী?’
বদনবাবুর গলা ধরে এসেছে।
আগন্তুক বললেন, ‘কুমিরের রক্ত খানিকটা ছিটকে বকটার গায়ে পড়েছিল।’
বদনবাবু পালকটা ফেরত দিয়ে দিলেন।
আগন্তুকের চোখের আলো মিলিয়ে আসছে। গঙ্গার স্রোতে কচুরিপানা ভেসে যাচ্ছিল। এখন আর প্রায় দেখা যায় না। জল মাটি আকাশ সব ঘোলাটে একাকার হয়ে আসছে।
‘এটা বুঝতে পারছেন কী জিনিস?’
বদনবাবু হাতে নিয়ে দেখলেন–একটা লোহার ছোট্ট তিনকোনা ফলক, মাথাটা ছুঁচলো।
আগন্তুক বললেন, ‘দু’ হাজার বছর আগে, নদীর মাঝামাঝি–ওই বয়াটার কাছ দিয়ে একটা কমুখো জাহাজ বাহারের ফুলকাটা পাল তুলে সমুদ্রের দিকে চলেছে। সওদাগরি জাহাজ বোধহয়। বলিদ্বীপ-টলিদ্বীপ কোথাও বাণিজ্য করতে চলেছে। পশ্চিমের বাতাসে বত্রিশ দাঁড়ের ছপছপানি শুনতে পাচ্ছি এইখান থেকে।’
‘আপনি?’
‘হ্যাঁ। আমি না তো কে? এইখানে–ঠিক এই বেঞ্চিটার জায়গায়–একটা বটগাছের পাশে লুকিয়ে আছি।’
‘লুকিয়ে কেন?’
‘বাধ্য হয়ে। এত বিপদসঙ্কুল জায়গা, তা তো জানা ছিল না। ইতিহাসের পাতায় তো আর এসব লেখেনি।’
‘বাঘটাঘের কথা বলছেন?’
‘বাঘের বাড়া। মানুষ। আমার এই কোমর অবধি উঁচু নাকথ্যাবড়া মিশকালো বন্য মানুষ। কানে কড়ি, নাকে আংটা, গায়ে উলকি। হাতে তীরধনুক। তীরের ডগায় বিষাক্ত ফলা।’
‘বলেন কী?’
‘ঠিকই বলছি। একবর্ণ মিথ্যে নেই।’
‘আপনি দেখলেন?’
‘শুনুন না! বোশেখ মাস। ঝড় উঠল। আদিম ঝড়। এমন ঝড় আর ওঠে না। সেই মকরমুখো জাহাজ চোখের সামনে জলের তলায় তলিয়ে গেল।’
‘তারপর?’
‘তার থেকে একটি লোক ভাঙা তক্তায় চেপে হাঙর কুমিরের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে কপালজোরে ডাঙায় এসে–ওরে বাব্বা!…’
‘কী?’
‘সেই বন্য মানুষ তার কী দশা করল সে আপনি নিজের চোখে না দেখলে…অবিশ্যি আমিও শেষ পর্যন্ত দেখতে পারিনি। একটা তীর বটের গুঁড়িটায় এসে বিধেছিল। সেইটেকে নিয়ে সুইচ টিপে বর্তমানে ফিরে আসি।’
বদনবাবু হাসবেন, না কাঁদবেন, না অবাক হবেন, তা বুঝতে পারলেন না। ওই সামান্য যন্ত্র আর ওই দুটো নলের মধ্যে এত জাদু আছে নাকি? এও কি সম্ভব?
আগন্তুক বদনবাবুর মনের প্রশ্নটা হয়তো আন্দাজ করেই বললেন, এই যে দেখছেন যন্ত্রটি কানের ভিতর নল দুটো ঢুকিয়ে এই ডান দিকের সুইচ টিপলেই ভবিষ্যতে, আর বাঁ দিকের টিপলেই অতীতে চলে যাওয়া যায়। কোন যুগের কোন সময়টিতে যেতে চান সেটাও এই দাগকাটা সন-লেখা চাকার উপর কাঁটা ঘুরিয়ে ঠিক করে নেওয়া যায়। অবিশ্যি বিশ-ত্রিশ বছর এদিক-ওদিক হয়ে যায় মাঝে মাঝে কিন্তু তাতে বিশেষ এসে যায় না। সস্তার জিনিস তোতাই অত অ্যাকিউরেট নয় আর কি!
‘সস্তা বুঝি?’ এবার বদনবাবু সত্যিই অবাক।
‘সস্তা মানে অবিশ্যি কেবল পয়সার দিক দিয়েই। এর পিছনে রয়েছে পাঁচ হাজার বছরের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান, বিদ্যে, বুদ্ধি। আজকাল লোকে ভাবে বিজ্ঞানের যত কারসাজি সবই বুঝি পশ্চিমে, এদেশে আর কী হচ্ছে? আরে বাপু, এদেশে যা হচ্ছে তা কি আর ঢাক পিটিয়ে হচ্ছে? তা হচ্ছে সব গোপনে, অগোচরে, লোকচক্ষুর আড়ালে। নাম জাহির করার ব্যাপারটা আমাদের দেশে কোনওকালেই ছিল না। এখনও নেই। আসল যারা গুণী তাদের হয়তো দেখাই পাবেন না কোনওদিন। দেখুন-না ইতিহাসের দিকে। অজন্তা গুহার ছবি কে বা কারা এঁকেছেন তাঁদের নাম জানেন? হাজার বছরের পুরনো পাহাড়ের গা থেকে খোদা এলোরার মন্দির কে গড়ল তার নাম জানে কেউ? ভৈরবী রাগ কার সৃষ্টি? ঋগ্বেদ লিখল। কে? মহাভারত বেদব্যাসের নামে চলেছে–আর আমরা বলি বাল্মীকির রামায়ণ। কিন্তু এ দুটোর মধ্যে কত শতসহস্র নাম-না-জানা লোকের হাত আছে, মাথা আছে তার হিসেব রাখে কেউ? এই যে পশ্চিমের বৈজ্ঞানিকেরা বড় বড় অঙ্ক কষে ফরমুলা কষে সব বড় বড় আবিষ্কার করে নাম কিনছেন–এই অঙ্কের গোড়ার কথাটা জানেন?’
