রিহার্সাল মোটামুটি ঠিক হয়েছিল বলে সকলে আরও অবাক, কিন্তু আমি তো জানি যে শট নেবার ঠিক আগে যে মুখের সামনে খটাস করে ক্ল্যাপস্টিক মারা হয়, তাতে অনেক পাকা অভিনেতাও টসকে যায়। এখানেও তাই হয়েছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
ডাক্তার এসে বললেন প্রেশার নামলেও তেমন কিছু নয়, কিন্তু অভিনেতাকে দিয়ে আজকে আর কাজ না করানোই ভাল।
রমণীমোহন বাড়ি চলে গেলেন। পরিচালক একা শাজাহানকে নিয়ে গোটা পাঁচেক শট নিয়ে তিনটের মধ্যে কাজ শেষ করে দিলেন।
কিন্তু বাকি কাজ কবে হবে?
আর এই রমণীমোহনকে দিয়ে আদৌ কাজ চলবে কি? নাকি, শেষ মুহূর্তে অন্য অভিনেতা দেখতে হবে?
আমার বস মিঃ মুস্তোফি আমায় ডেকে বললেন, তুমি একবারটি ওই ছোঁকরার বাড়িতে গিয়ে সঠিক খবরটা নিয়ে এসে তো। সে নিজে কী মনে করে সেটা জানা দরকার। সে ফ্র্যাঙ্কলি বলুক সে পারবে কি না। যদি কদিন সময় চায় তাও দিতে রাজি আছি, কারণ চেহারার দিক দিয়ে ওকে মানিয়েছিল চমৎকার। হয়তো জড়তাটা টেম্পোরারি। অবিশ্যি দ্বিতীয় দিনেও এই একই ব্যাপার ঘটলে অন্য লোক নিতেই হবে।
মুস্তোফি সাহেব যেন একবার ভুরু কুঁচকে আমার দিকে চাইলেন, ভাবটা যেন–একে দিয়েও তো কাজটা চলতে পারত। কিন্তু তারপর আর কিছু বললেন না, আর আমিও চেপে গেলুম।
.
দুদিন পরে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে রমণীমোহনের ট্যাপোর কাসল রোডের বাড়িতে গিয়ে হাজির হলুম। বেয়ারা আমায় বৈঠকখানায় বসানোর এক মিনিটের মধ্যে বাবু এসে ঢুকলেন। দেখলুম এই কদিনে ওর বয়স যেন বেড়ে গেছে দশ বছর। বললুম, কী ব্যাপার বলুন তো? এরকম হল কেন?
ভদ্রলোক গভীর আক্ষেপের ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বললেন, কী আর বলব বলুন, শুটিং-এর তিনদিন আগে আমার এক বন্ধু এক জ্যোতিষী এনে হাজির করে বলল-নতুন কাজে হাত দিতে যাচ্ছ, এঁকে দিয়ে একবার ভাগ্যটা যাচাই করে নাও। আমিও আপত্তি করলুম না, কারণ ওসবে আমার বেশ আস্থা আছে। আর এঁর নাকি জ্যোতিষার্ণব-টার্ণব উপাধি আছে, চেহারাও বেশ ইমপ্রেসিভ। কিন্তু মশাই, হাত দেখার আগেই আমার মাথার দুদিকের রগ বুড়ো আর কড়ে আঙুলে। টিপে লোকটা কী বললে জানেন? বললে, এ লাইন তোমার নয়। অভিনয়ের দিকে যেও না; গেলেই হোঁচট খেতে হবে।–ভেবে দেখুন তো কী কথা! তিনদিন বাদে শুটিং, পার্ট মুখস্থ হয়ে গেছে, আর লোকটা বলে কি না আমায় দিয়ে অ্যাকটিং হবে না? সাধে কি ডায়ালগ গোলমাল হয়ে যাচ্ছিল? যেই মুখ খুলতে যাব অমনি জ্যোতিষীর মুখটা মনে পড়ে যাচ্ছে, আর কে যেন গলার ভেতর পাথর গুঁজে দিচ্ছে। ওফ! সে যে কী অবস্থা, সে আর আপনাকে কী করে বোঝাব? রাজ্যি সুন্ধু লোক জেনে গেছে আমি আলমগীর করছি আর সেই সময় অকেজো বলে বাদ হয়ে যাওয়া–এর চেয়ে বেশি অপমান আর কী হতে পারে বলুন?
আমি আর কী করি? যথাসাধ্য সহানুভূতি দেখালুম। জিজ্ঞেস করলাম, কী করলে পরে এই বিভীষিকা আপনার মন থেকে দূর হতে পারে? কারণ আপনার মধ্যে যে অ্যাকটিং আছে সে তা আমরা রিহার্সেলেই দেখেছি।
রমণীমোহন মাথা নাড়ল। ঘাড় হেঁট ছিল, এবার মুখ ভোলাতে দেখলুম চোখে জল। আমার হাত দুটো ধরে অত্যন্ত করুণ সুরে বললে, কতদিনের যে স্বপ্ন সিনেমায় অভিনয় করে নাম করব। আর সেই সুযোগ এসেও গ্রহের ফেরে বানচাল হয়ে গেল! এখন আপনি যদি কোনও রাস্তা বাতলাতে পারেন। আমার নিজের মাথায় একটা রাস্তা এসেছে কিন্তু সেটা সভয়ে বলব না নির্ভয়ে বলব বুঝতে পারছি না।
আমি বললুম, নির্ভয়ে বলুন।
রমণীমোহন কয়েক মুহূর্ত আমার দিকে চেয়ে থেকে বলল, আপনার অভিনয় আসে?
হঠাৎ এ প্রশ্ন কেন?
কারণ আমার সঙ্গে আপনার চেহারার মিল আছে। সে কথা আমার বেয়ারা প্রসন্নও বলছিল। ভাবছিলুম, আমার বদলে আপনি যদি আমার বাড়ি থেকে মেক-আপটা করে নিয়ে পোশাকটা পরে। আমার হয়ে অভিনয়টা করে দিয়ে আসতেন। অবিশ্যি, কিছু লোককে ব্যাপারটা বলতেই হবে। যেমন মেক-আপম্যান যতীন, তার সহকারী হাবুল, আর ড্রেসার তারাপদ। তাদের হাতে কিছু খুঁজে দিলে তারা কখনওই ব্যাপারটা ফাঁস করবে না।
আমি বললাম, তার মানে অভিনয় করবেন তারিণী বাঁড়জ্জে আর নাম হবে রমণী চ্যাটুজ্যের?
এ-ছাড়া আর রাস্তা আছে কি?
আর প্রোডাকশন ম্যানেজারের কাজটা কে করবে?
সেটার একটা অন্য ব্যবস্থা করবে ওরা। আপনি বলে দেবেন বোম্বাই থেকে একটা ভাল অফার পেয়েছেন, তাই চলে যাচ্ছেন।
কথাটা মন্দ বলেননি। কিন্তু যদি অভিনয় আমার ভাল হয়, আর তার জন্য যদি কোনও সংস্থা পুরস্কার ঘোষণা করে, তা হলে সেটাও তো আপনিই নেবেন?
তা তো নিতেই হবে। তবে আপনাকে পারিশ্রমিক ছাড়াও আমি একটা জিনিস দিতে রাজি আছি।
কী জিনিস?
আমার এই মোগলাই আংটি। আজকের বাজারে এর দাম কত জানেন তো?
পুরনো ভাল জিনিসের উপর আমার মোহ আছে সেটা তো তোরা জানিস। সেটা তখনও ছিল। বলে দিলুম ঠিক হ্যায়। আমি আপনার প্রস্তাবে রাজি। কিন্তু সবচেয়ে আগে আপনার চিত্রনাট্যটি চাই। ডায়ালগ মুখস্থ করতে হবে তো।
রমণীমোহন তৎক্ষণাৎ তাঁর ফাইলটা এনে আমায় দিলেন।
সেইদিনই বিকেলে মিঃ মুস্তাফির কাছে গিয়ে বললুম যে রমণীমোহন আরেকটা চান্স চাইছে। বলছে, এবার না হলে যেন তাকে বাদ দেওয়া হয়। মুস্তাফি মশাই রাজি হয়ে গেলেন, ওদিকে পরিচালক মশাইকেও খবরটা দিয়ে দেওয়া হল।
