তিনদিন বাদে ক্যামেরা টেস্টেও রমণীমোহন দিব্যি উতরে গেলেন।
এরপর একটা দিন ঠিক করে বস মুস্তাফি মশাইকে সঙ্গে নিয়ে রমণীমোহনের বাড়ি গিয়ে তার সঙ্গে চুক্তি সই হয়ে গেল। পঞ্চাশ হাজার টাকা পাবে রমণীমোহন, আর পাঁচ হাজার অ্যাডভান্স। তখনকার দিনে একজন নতুন অভিনেতার পক্ষে এটা অঢেল টাকা, আজকের দশলাখের সমান। পয়লা বৈশাখ মহরত; তাতে কোনও অভিনয়ের ব্যাপার নেই, কিন্তু রমণীমোহনকে মেক-আপ নিয়ে, কস্টিউম পরে আসতে হবে। এইখানে রমণীমোহন একটি বায়না করলে। সে বললে যে স্টুডিওর মেক-আপ রুম তার জানা আছে, সে অতি রদ্দি, তাতে সে মেক-আপ করবে না। মেক-আপম্যান যেন সকাল সকাল তার বাড়িতে চলে আসে, সে বাড়িতেই মেক-আপ নিয়ে কস্টিউম পরে স্টুডিওতে হাজির হবে। মুস্তোফিমশাই দেখলাম এতে রাজি হয়ে গেলেন, যদিও একজন নবাগতের পক্ষে আবদারটা একটু বাড়াবাড়ি রকমের। বুঝলাম নতুন হিরোকে খুবই পছন্দ হয়েছে কতামশাইয়ের।
পয়লা বৈশাখ ভারত মাতা স্টুডিওতে আলমগীরের মহরত হয়ে গেল। লোকে লোকারণ্য, ফিল্ম লাইনের কেউ বাদ যায়নি, খানাপিনার বন্দোবস্ত ছিল, নতুন তারকাকে মোগল বাদশার মেক-আপে দেখে সকলেই খুব তারিফ করে গেলেন। ইতিমধ্যে রমণীমোহন নাকি আলমগীরের ডায়ালগ পেয়ে গেছেন, এবং সবই তাঁর মুখস্থ হয়ে গেছে। আচকান জোব্বা পরচুলা দাড়ি গোঁফ তলোয়ার নাগরা সব রেডি, প্রথম শুটিং-এর তারিখ স্থির হয়েছে পনেরোই বৈশাখ।
এদিকে আমি তখন পুরোদস্তুর প্রোডাকশন ম্যানেজারের কাজ করছি। উদয়াস্ত খাটছি, দম ফেলার ফাঁক নেই। কিন্তু এতেও যে আপত্তি নেই তার কারণ হল যে স্টুডিওর পরিবেশে একটা জাদু আছে। এটা স্বীকার করতেই হবে। বিশেষ করে ঐতিহাসিক ছবিতে যারা কাজ করবে–সে অভিনেতা-অভিনেত্রীই হোক আর সাধারণ কর্মীই হোক–তাদের সকলেরই মেজাজে যেন একটা আমীরী ভাব চলে আসে। স্টুডিওর ভিতরে সেট তৈরি হচ্ছে প্রাসাদের–তার খিলেন, থাম, ঝাড়লণ্ঠন, দেয়ালগিরি, গালিচা, মসনদ, ফরাস, তাকিয়া–সমস্ত আবহাওয়াটাই যেন গেছে পালটে। মাঝে মাঝে কথা বলতে যে উর্দু-ফারসিও বেরিয়ে পড়ছে না তা নয়।
দেখতে দেখতে ১৫ই বৈশাখ এসে গেল। আলমগীরকে দিয়েই কাজ শুরু; বাপ শাজাহানের সঙ্গে দৃশ্য। ঠিক সাড়ে দশটার সময় তাঁর নিজের লাল শেভ্রোলে গাড়িতে আলমগীরের বেশে এসে হাজির হলে রমণীমোহন।
ক্যামেরাম্যানের আলো করা প্রায় শেষ, দু-একটা খুচরো রিহার্সেলও হয়ে গেল, এবং তাতে শাজাহান-বেশি পেশাদারি অভিনেতা জয়নারায়ণ বাগচির বিপরীতে নিউকামার রমণীমোহন বেশ ভালই অভিনয় করলেন। কেবল, পাখা সত্ত্বেও তিনি যে এত ঘামছেন, সেটা বোধহয় প্রথম দিনের উত্তেজনা ও কিঞ্চিৎ নাভাসনেসের জন্য। শট-এর সময়ে এটা না হলেই আর কোনও চিন্তার কারণ থাকবে না।
এবার ডিরেকটার সাহেব লাইটস! বলে চেঁচাতেই সেটের প্রয়োজনীয় সব আলোগুলো জ্বলে উঠল; অভিনেতা দুজন তাঁদের নিজেদের নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে হেঁটে চলে দেখে নিলেন যে আলো ঠিক আছে। ঠিক আছে বলছি অবিশ্যি বাংলা ছবির কথা ভেবে। প্রাসাদের দেয়াল যে চটের তৈরি সেটা বিশ হাত দূর থেকেই বোঝা যাচ্ছে, মেক-আপ আর পোশাক একেবার যাত্রামাকা। তবে এটুকু জানি যে রমণীমোহন যদি উতরে যায় তা হলে এ ছবি হিট হবার সমূহ সম্ভাবনা।
সব রেডি? হাঁক দিয়ে প্রশ্ন করলেন পরিচালক জগদীশ নস্কর। নস্কর সাহেব হচ্ছেন সেই জাতের পরিচালক যিনি যার যার কাজ তাকে তাকে দিয়ে নিজে পরম নিশ্চিন্ত বোধ করেন। কেবল পরিচালনার সময়টুকুতেও তাঁর ব্যক্তিত্বে একটা পরিবর্তন আসে। তাও সেটা বেশি না। আর এঁর আরেকটি অভ্যাস হচ্ছে যে ইনি কাজের মধ্যে সামান্যতম ফাঁক পেলেই একটু বসে নেন, এবং আরামকেদারা পেলে কক্ষনও মোড়া বা কাঠের চেয়ারে বসেন না।
সব্বাই রেডি ছিল, কাজেই শট নেওয়ায় কোনও বাধা নেই, কিন্তু রমণীমোহন দেখছি ঘেমেই চলেছেন। মেক-আপ অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রতি তিন মিনিট অন্তর তোয়ালে দিয়ে তাঁর মুখ প্যাড করে দিচ্ছে, কিন্তু তাও ঘামের অন্ত নেই। স্টুডিওতে বৈশাখ মাসে গরম ঠিকই, কিন্তু এখন তো চতুর্দিকে বিরাট বিরাট পাখা চলছে; শট-এর সময়ে সেগুলো বন্ধ হয়ে গেলে কী অবস্থা হবে?
শুটিং-এ একটা রেওয়াজ আছে যে প্রথম দিনের প্রথম শটটা একবার উতরে গেলে সবাই হাততালি দেয়। বিশেষ করে নতুন অভিনেতা হলে তো কথাই নেই।
কিন্তু অত্যন্ত আক্ষেপ ও বিস্ময়ের ব্যাপার যে পর পর সাতবার চেষ্টার পরেও হাততালির সুযোগ এল না, এবং তার জন্য দায়ী স্বয়ং আলমগীর বাদশা। তাঁর ডায়ালগ ছিল অতি সহজ। বাপকে তিনি বলবেন, আমি তো আগেই বলেছি, আমার পথে কোনও বাধা আমি সহ্য করব না। এই কয়েকটি কথা পর পর আমার পথে কোনও বাধা আমি সহ্য করব না–এটা একবার হল আমার বাধা আমি কোনও পথে সহ্য করব না, তারপর হল, আমার সহ্যের পথে আমি কোনও বাধা দেব না, তারপর হল, আমি কোনও পথেই আমার সহ্যে বাধা দেব না, আর চতুর্থবার পরিচালক হুঙ্কার দিয়ে অ্যাকশন বলার পরে আওরঙ্গজেবের মুখ দিয়ে কোনও কথাই বেরোল না। আমি দেখি তার পা ঠকঠক করে কাঁপছে। সে তার কাছেই একটা সিংহাসন গোছের গদির চেয়ার ছিল, তাতে বসে মাথার পাগড়িটা খুলে ফেলল। তারপর বলল যে তার ব্লাড প্রেশার নাকি মাঝে মাঝে অত্যন্ত বেশি নেমে যায়, সম্ভবত এখনও তাই হয়েছে, তাই একজন ডাক্তারের ব্যবস্থা করতে পারলে ভাল হয়।
