আমার তখন তেইশ বছর বয়স, তবে একটা তেকোনা ফ্রেঞ্চকাট গোছের দাড়ি রেখেছিলাম বলে মনে হত তেত্রিশ। বেয়াল্লিশ সালের কথা বলছি। তখন যুদ্ধ চলেছে পুরোদমে, কলকাতার রাস্তাঘাটে খাকি পরা জি. আই. সেনা ঘোরাফেরা করছে, শহরের চেহারাটাই পালটে গেছে। জোড়া জোড়া মার্কিন মিলিটারি পুলিশ চৌরঙ্গিতে টহল দিয়ে ফেরে, তাদের জামার আস্তিনে কুনুই-এর ওপর লেখা এম. পি.। সিনেমা হাউসগুলো খালি পড়ে থাকে না কখনও; ম্যাটিনি-ইভনিং-নাইট তিনটেই হাউস ফুল, সব ছবিই হিট, তা সে দিশিই হোক আর বিলিতিই হোক। আমাদের টলিউডের
স্টুডিওগুলো গমগম করছে, কুইক মানির লোভে রোজই টাকাওয়ালা নতুন নতুন প্রোডিউসার। আসছে। তারা জানে ছবি একবার লেগে গেলে কোনও ব্যবসাতে চটজলদি এত লাভ হয় না। আমার মেজোমামার এক সহপাঠী, নাম পরেশ মুস্তোফি, তিনি ভারত মাতা স্টুডিওর মালিক। আমাকে ডেকে পাঠিয়ে যেচে একটা চাকরি দিলেন প্রোডাকশন ম্যানেজারের। কাজটা নেহাত ফেলনা নয়; একটা ছবি হলে পরে সবাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, খরচের হিসেব রাখা, আর্টিস্ট আর কর্মীদের পেমেন্ট করা, এমন কী উঁচ থেকে হাতি পর্যন্ত যা কিছু একটা ছবিতে লাগবে সব কিছু জোগাড় করার ভার আমার উপর। তখন বয়স কম, তা ছাড়া টুপাইস রোজগার হচ্ছে, খাটনি হলেও কাজটা ভালই লাগছিল।
সেই সঙ্গে এটাও বলা দরকার যে ভেতরে ভেতরে আমার অভিনয়ের একটা শখ ছিল। আমার চেহারাটা যে এককালে ভাল ছিল, সেটা তো তোমাদের বলেইছি। তা ছাড়া আমি ছিলাম হলিউডের ছবির পোকা। বাংলা ছবিতে তো আর অভিনয় হত না, হত রঙ তামাশা। আমি দেখি পৃথিবীর সব সেরা স্টারের অভিনয়, যাকে দেখে অভিনয় বলেই মনেই হয় না। অবিশ্যি সেই সঙ্গে ভাল বাংলা পেশাদারি থিয়েটারও বাদ দিই না, কারণ শিশির ভাদুড়ী, যোগেশ চৌধুরী মনোরঞ্জন ভট্টাচায্যি–এঁরা সব ছিলেন বাঘা বাঘা অভিনেতা। কিন্তু যেচে গিয়ে বলব আমায় একটা পার্ট দিন, তেমন সাহস তখনও হয়নি। তবে স্টুডিও পাড়ায় থাকলে কোনও প্রযোজক বা পরিচালকের চোখে পড়ে গিয়ে সুযোগ যে আসবে না, এমনই বা কে বলতে পারে?
একদিন জানতে পারলাম যে আলমগীর ছবি হচ্ছে আমাদের এই ভারত মাতা স্টুডিওতেই, আর স্টুডিওই টাকা ঢালছে সে ছবিতে। বস মুস্তাফি সাহেব আমাকে ডেকে সব ডিটেল বললেন। তখনকার নামকরা পরিচালক জগদীশ নস্কর পরিচালনা করবেন, সেরা অভিনেতারা সব অভিনয় করছেন। তবে নাম ভূমিকায়–অর্থাৎ আলমগীরের চরিত্রে–একটি নতুন লোককে নেওয়া হচ্ছে। এর নাম রমণীমোহন চ্যাটার্জি, সুন্দর চেহারা, উচ্চবংশের ছেলে, অনেক পয়সা। মুস্তাফিমশাই নিজেই নাকি ছেলেটিকে এক বিয়ে বাড়িতে দেখে সোজাসুজি অফারটা দেন, এবং ছেলে নাকি এককথায় রাজি হয়ে যায়।
রমণীমোহন চ্যাটার্জি নামটা চেনা চেনা লাগছিল কেন বুঝতে পারছিলাম না, শেষটায় হঠাৎ মনে পড়ল যে শ্যামবাজারের একটা ক্লাবে আমারই স্কুলের সহপাঠী ব্রতীন থিয়েটার করে, তার কাছে শুনেছি এই রমণীমোহবে কথা। চেহারা ভাল–অনেকটা তোর মতো দেখতে বলেছিল ব্রতীন, আর অ্যাকটিংটাও নাকি ভালই করে। তবু মনে একটা খটকা ছিল তাই ব্রতীনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করলাম, আর করে জানলাম যে এ সেই একই রমণীমোহন। বললাম, পারবে তো এত বড় দায়িত্ব কাঁধে নিতে? ব্রতীন বললে, সাদা নুন খেয়ে উঠে পড়ে লেগেছে তো ছোঁকরা। শখ। প্রচণ্ড। আর, ও একটা আংটি পরে সেটা নাকি মুঘল আমলের; ওর ঠাকুরদাদার ছিল; খুব পয়া। আলমগীর সাজলে ওটা আঙুলে পরবে, আর তা হলে নাকি আর দেখতে হবে না। আসলে, রমণী আবার তুকতাকে বিশ্বাস করে, পুজো আচ্চা করে। বড়লোক বাপের একমাত্র ছেলে, বুঝতেই তো পারিস, পয়সার জন্য যে করছে তা তো নয়, শখ হয়েছে চিত্রতারকা হবার।
পয়লা বৈশাখ মহরতের দিন স্থির হয়েছে, এখন মার্চের মাঝামাঝি, তাই হাতে কিছুটা সময় আছে। ইতিমধ্যে পরিচালক জগদীশ নস্কর একদিন বলে বসলেন যে নতুন ছেলেটিকে একবার বাজিয়ে দেখবেন। শুধু চেহারাতে তো হবে না, তাকে ডায়ালগ বলতে হবে, তাই অভিনয় ছাড়াও কণ্ঠস্বর, উচ্চারণ ইত্যাদি ভাল হওয়া চাই। আর একমাত্র সেই যখন নতুন, তখন তাকে একবার পরীক্ষা করে দেখা উচিত। এই পরীক্ষায় উতরোলে তারপর একটা ক্যামেরা টেস্ট নিলেই চলবে।
আমারই উপর ভার পড়ল রমণীমোহনকে টেলিফোন করে তারই বাড়িতে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করা। রবিবার সকাল দশটায় টাইম ঠিক হল। আমি আর পরিচালকমশাই যাব। টেস্টে পাশ করলে পর মুস্তাফির সঙ্গে বাকি কথা হবে।
রবিবার এসে পড়ল। জগদীশ নস্কর সময়ানুবর্তিতায় বিশ্বাসী, ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায় দশটায় গিয়ে। রমণীমোহনের বাড়ি সদর দরজার বেল টিপলেন। বেয়ারা আমাদের বৈঠকখানায় নিয়ে গিয়ে বসাবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই রমণীমোহনের আবিভাব হল। চেহারা ভাল তাতে সন্দেহ নেই, আর এতেও সন্দেহ নেই যে আমার সঙ্গে একটা মিল আছে। দুজনেরই হাইট ছ ফুট, দোহারা চেহারা, ফরসা রং, চোখা নাক, পাতলা ঠেটি। আমার তেকোনা দাড়ির জন্য মিলটা হয়তো অতটা ধরা পড়ে না, কিন্তু আমি জানি, দাড়ি বাদ গেলেই পড়বে।
পরিচালকমশাই সঙ্গে আলমগীরের ডায়ালগ এনেছিলেন। তারই একটা অংশ পড়তে দিলেন। রমণীমোহনকে। ছোঁকরা বেশ ভালই পড়ল। বলল ও নাকি ভাদুড়ীমশাইকে গুরু বলে মানে, আর হলিউডের তারকাদের মধ্যে রোনাল্ড কলম্যান। নস্কর মশাই বেশ খুশি, আমাকে বললেন অবিলম্বে দরজি এনে রমণীমোহনের পোশাকের মাপ নিতে। এই ফাঁকে রমণীমোহনও তাঁর আংটিটা দেখিয়ে দিলেন। দেখলাম সত্যি খাসা জিনিস; সোনার আংটির মাঝখানে হিরেকে ঘিরে গোল করে পান্না বসানো। নস্করমশাই বললেন আলমগীর গালে হাত দিয়ে বসে থাকলে আংটিটা ক্লোজ-আপের সৌন্দর্য অনেক গুণে বাড়িয়ে দেবে।
