নটরাজ কেবিনের মালিক পুলিন দত্তকে জিজ্ঞেস করাতে ভদ্রলোক বললেন, শরৎদা বছর তিনেক আগে অবধি এখানে রেগুলারলি আসতেন। তারপর আর আসেননি।
তিনি কি কোনও কাজ-টাজ করতেন?
সেকথা তাঁকে অনেকবার জিজ্ঞেস করেছি, বললেন পুলিন দত্ত, কিন্তু কোনও সোজা উত্তর কখনও পাইনি। কেবল বলতেন, পেটের দায়ে এমন কোনও কাজ নেই যা আমি করিনি।তবে অভিনয় যে ছেড়ে দিয়েছিলেন সেটা আমি জানি, আর সেইসঙ্গে ছবি দেখাও বন্ধ করে দিয়েছিলেন। টকিই যে তাঁর কাল হয়েছিল সেটা বোধহয় উনি কোনওদিন ভুলতে পারেননি।
এর পরে আরও মাসখানেক নানান জায়গায় খোঁজ করেও শরৎ কুণ্ডুর কোনও পাত্তা পেলাম না। লোকটা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। কথাটা রক্ষিত মশাইকে বলতে উনি সত্যিই মর্মাহত হলেন। বললেন, এমন একটা গুণী অভিনেতা, টকি এসে তার পসার মাটি করল, আর ক্রমে সে মানুষের মন থেকে মুছেই গেল। এখন আর তাকে কে চেনে? সে তো বেঁচে থেকেও প্রায় মরারই শামিল।
শরৎ কুণ্ডুর ব্যাপারে আর কিছু করার নেই বলে আমি কাজের কথায় চলে গেলুম। ভদ্রলোককে একটা প্রশ্ন করার ছিল। বললুম, আপনার একটি সাক্ষাৎকার দিতে কোনও আপত্তি আছে কি?
কে চাইছে সাক্ষাৎকার?
আমি নরেশ সান্যালের কথা বললুম। ভদ্রলোক সেদিনই সকালে ফোন করেছিলেন, আগামীকাল আসতে চান।
বেশ তো, সকালে দশটায় আসুক। তবে বেশি সময় যেন না নেয়।
নরেশ সান্যাল ফোন নম্বর দিয়ে দিয়েছিলেন, আমি তাঁকে খবরটা জানিয়ে দিলাম।
সেদিন সন্ধ্যায় প্রোজেকশন ঘরে রয়ে গেলুম। বিশু-শিবুর কীর্তিকলাপ দেখার জন্য। বিশু-শিবুর ছবি হয়েছিল সবসুদ্ধ বেয়াল্লিশটা। তার মধ্যে সাঁইত্রিশটা আগেই জোগাড় হয়েছিল, বাকি পাঁচখানা আমার চেষ্টায় জোগাড় হয়েছে। আজ এই নতুন পাঁচখানা দেখতে দেখতে আবার মনে হল যে, শরৎ কুণ্ডু সত্যিই বেশ জোরদার কমিক অভিনেতা ছিলেন। রক্ষিত মশাইকে দু-একবার চুকচুক করতে শুনলুম, তাতে বুঝলুম যে তিনি শরৎ কুণ্ডুর অন্তর্ধানের জন্য আক্ষেপ করছেন।
পরদিন সকালে আমি আসার দশ মিনিটের মধ্যেই নরেশ সান্যাল এসে পড়লেন। রক্ষিত মশাই তৈরিই ছিলেন; বললেন, আগে চা হোক, তারপর ইন্টারভিউ হবে। সান্যাল মশাই কোনও আপত্তি করলেন না।
সকালে দশটায় রোজই রক্ষিত মশাই চা খান এবং সেইসঙ্গে আমিও খাই। এই সময়টাতেই আমাদের যা কিছু আলোচনা করবার তা হয়ে যায়, তারপর আমি বসে পড়ি কাজে, উনি চলে যান। বিশ্রাম করতে। ক্যাটালগিং হয়ে যাবার পর আমি যে কাজটা করছি সেটা হল বিশু-শিবুর প্রত্যেকটি ছবির গল্পের সারাংশ তৈরি করা এবং তাতে কে কে অভিনয় করেছে, পরিচালক কে, ক্যামেরাম্যান কে–এই সবের একটা তালিকা তৈরি করা। একে বলে ফিল্মেগ্রাফি।
যাই হোক, আজ অতিথি এসেছেন বলে দেখি চায়ের সঙ্গে চুরি এসেছে। ট্রে সমেত চা টেবিলে রাখা হতেই সান্যাল মশাই হঠাৎ একটা কথার মাঝখানে খেই হারিয়ে চুপ করে গেলেন। তাঁর দৃষ্টি ভৃত্যের দিকে। ভৃত্য স্বয়ং খাস বেয়ারা লক্ষ্মীকান্ত।
আমার দৃষ্টিও চলে গেছে লক্ষ্মীকান্তের দিকে, এবং সেই সঙ্গে রক্ষিত মশাইয়েরও। এই নাক, এই থুতনি, এই চওড়া কপাল, চোখের এই তীক্ষ্ণ চাহনি–এ কোথায় দেখেছি? অ্যাদ্দিন তো এর মুখের দিকে ভাল করে চাইনি। কেন চাইব? অকারণে বেয়ারার দিকে কে চেয়ে থাকে?
প্রায় তিনজনের মুখ দিয়েই একসঙ্গে বেরিয়ে পড়ল একটা নাম–
শরৎ কুণ্ড!
হ্যাঁ, কোনও সন্দেহ নেই, শরৎ কুণ্ডু এখন হলেন তাঁর এককালের ফিল্মের জুটি রতন রক্ষিতের খাস বেয়ারা।
কী ব্যাপার হে শরৎ? এতক্ষণে চেঁচিয়ে উঠলেন রতন রক্ষিত। তুমি আমার বাড়িতে–?
শরৎ কুণ্ডুরও মুখে কথা ফুটতে সময় লাগল।
কী আর করি, অবশেষে কপালের ঘাম মুছে বললেন ভদ্রলোক, নেহাত ইনি চিনলেন বলেই তো তোমরা চিনলে; অ্যাদ্দিন তো বুঝতে পারোনি! আর চল্লিশ বছর বাদে দেখে বুঝবেই বা কী করে! একদিন মীরচান্দানির ওখানে চাকরির আশায় গিয়ে শুনি তুমি নাকি এসে আমাদের সেই আদ্যিকালের ছবির অনেকগুলো কপি কিনে নিয়ে গেছ নিজের সংগ্রহের জন্য। ভাবলাম তোমার এখানে এসে নিশ্চয়ই সেসব ছবি আবার দেখতে পাব। এমনিতে তো দেখার কোনও সুযোগ নেই। সেসব ছবি যে এখনও টিকে আছে তাই জানতাম না। তাই বেয়ারার চাকরির জন্য চলে এলাম তোমার কাছে। তুমি আমায় চিনলে না, চাকরিও হয়ে গেল। কুলিগিরিও করেছি, বেয়ারার কাজ তো তার কাছে স্বর্গ। আর ভালও লাগছিল। সে যুগের ছবিতে কথা না বলে অভিনয় করেছি, সে তো নেহাত নিন্দের নয়! অবিশ্যি সেসব দেখার সুযোগ বোধহয় এখন বন্ধই হয়ে গেল!
কেন, বন্ধ হবে কেন? রক্ষিত মশাই চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েছেন। তুমি এখন থেকে হবে আমার ম্যানেজার! তারিণীর সঙ্গে এক ঘরে বসবে তুমি; আমার এখানেই থাকবে, সন্ধেবেলা একসঙ্গে সে ছবি দেখব আমরা। এককালের জুটি ভেঙে গিয়েছিল দৈব দুর্বিপাকে, আবার এখন থেকে জোড়া লেগে গেল। কী বলো তারিণী?
আমি দেখছি নরেশ সান্যালের দিকে। তাঁর মতো এমন হতভম্ব ভাব আমি অনেকদিন কারুর মুখে দেখিনি। তবে তাঁর পক্ষে নির্বাক যুগের এই বিখ্যাত জুটির পুনর্মিলন যে একটা বড়রকম সাংবাদিক দাঁও হল, সে বিষয়ে সন্দেহ আছে কি?
আনন্দ বার্ষিকী, ১৩৯২
টলিউডে তারিণীখুড়ো
তাকিয়াটাকে কোলের উপর টেনে নিয়ে আরও জমিয়ে বসে ঝুঁকে পড়ে তারিণীখুড়ো তাঁর গল্প আরম্ভ করলেন। —
