এই ছবি চলার সময় দেখবার জিনিস হত রক্ষিত মশাইয়ের হাবভাব। নিজের ভাঁড়ামো দেখে তিনি নিজেই হেসে গড়িয়ে পড়তেন। কোনও কমিক অভিনেতা যে নিজের অভিনয় দেখে এত হাসতে পারে, এটা বিশ্বাস করা কঠিন। তাঁর দেখাদেখি অবিশ্যি আমাকেও হাসতে হত। রক্ষিত মশাই বলতেন, জানো তারিণী, এইসব ছবি যখন করেছি, তখন এগুলো দেখে মোটেই হাসি পায়নি। বরং নির্লজ্জ ভাঁড়ামো দেখে বিরক্তই লাগত। কিন্তু এতদিন পরে দেখছি এর মধ্যে একটা নির্মল হাস্যরস আছে, যেটা আজকের হাসির ছবির তুলনায় অনেক ভাল।
একটা প্রশ্ন কিছুদিন থেকে আমার মাথায় ঘুরছিল, একদিন সেটা রক্ষিত মশাইকে জিজ্ঞেস করে ফেললাম। বললাম, একটা ব্যাপারে আমার একটু কৌতূহল হচ্ছে; আপনি তো বিশু সাজতেন, কিন্তু শিবু যিনি সাজনে সেই শরৎ কুণ্ডুর কী হল? তাঁর সঙ্গে আপনার কোনও যোগাযোগ নেই?
রক্ষিত মশাই মাথা নেড়ে বললেন, আমি যতদূর জানি, শরৎ কুণ্ডু সাইলেন্ট যুগের পর আর ছবিতে অভিনয় করেনি। আমরা যখন একঙ্গে কাজ করেছি তখন আমাদের দুজনের মধ্যে যথেষ্ট হৃদ্যতা ছিল। ভেবে ভেবে নানারকম ভাঁড়ামোর ফন্দি বার করতুম দুজনে। ডিরেক্টর যিনি ছিলেন তিনি নামকাওয়াস্তে। ছবির সঙ্গে মালমশলা সব আমরাই জোগাতুম। তারপর একদিন কাগজে দেখলুম হলিউডের ছবিতে শব্দ যোগ হচ্ছে, পাত্র-পাত্রীরা এবার থেকে কথা বলবে, আর সেই কথা দর্শকে শুনতে পাবে। সেটা ছিল ১৯২৮ কি ২৯ সাল। যাই হোক, হলিউডে সত্যিই টকি এসে গেল। আমাদের এখানে আসতে লাগল আরও তিন-চার বছর। সে এক হইহই ব্যাপার। সিনেমার খোলনলচে পালটে গেল। তার সঙ্গে অভিনয়ের রীতিও। আমার কিন্তু একটা থেকে আরেকটায় যেতে কোনও অসুবিধা হয়নি। গলার স্বরটা ভাল ছিল, তাই টকি আমাকে হটাতে পারেনি। তখন আমার বয়স ত্রিশ-বত্রিশ। বাংলা ছবিতে সুকণ্ঠ হিরোর দরকার। সেই হিয়োর পার্টে আমি অনায়াসে খাপ খেয়ে গেলুম। বিশ মিনিটের ভাঁড়ামোর যুগ শেষ হয়ে গেল। আমি হয়ে গেলাম ছবির নায়ক। কিন্তু সেই সময় থেকেই শরৎ কুণ্ডু কেমন যেন হারিয়ে গেল। যদূর মনে পড়ে, দু-একজনকে জিজ্ঞেসও করেছিলুম ওঁর কথা, কিন্তু কেউ সঠিক জবাব দিতে পারেনি। লোকটার অকালমৃত্যু হয়েছিল কিনা কে জানে।
তাই যদি হয়, তা হলে অবিশ্যি অনুসন্ধান করার কোনও মানে হয় না। কিন্তু আমার মনে তাও একটা খটকা থেকে গেল। ঠিক করলুম যে শরৎ কুণ্ড সম্বন্ধে খোঁজখবর চালিয়ে যেতে হবে। সত্যি বলতে কি, বিশ মিনিটের ছবিগুলো দেখে একটা জিনিস বুঝতে পারছিলাম যে, কমিক অভিনেতা হিসেবে রতন রক্ষিতের চেয়ে শরৎ কুণ্ডু কোনও অংশে কম ছিলেন না।
টালিগঞ্জ পাড়ায় ঘোরাঘুরি করে জানলুম যে নরেশ সান্যাল বলে এক ভদ্রলোক বাংলা ফিল্মের আদিযুগ নিয়ে রিসার্চ করছেন। ইচ্ছে, একটা প্রামাণ্য বই লেখার। ভদ্রলোকের ঠিকানাটাও জোগাড় হল। তারপর এক রবিবার সকালে তাঁর বাড়িতে গিয়ে হাজির হলুম। ভদ্রলোক বললেন যে, হ্যাঁ, শরৎ কুণ্ড সম্পর্কে কিছু তথ্য তাঁর জানা আছে। বছর পাঁচেক আগে একবার অনেক খোঁজ করে তাঁর বাড়িতে গিয়ে শরৎ কুণ্ডুর একটা সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন সান্যাল মশাই। সে বাড়ি কোথায়? আমি জিজ্ঞেস করলুম। গোয়াবাগানের এক বস্তিতে, বললেন সান্যাল মশাই। ভদ্রলোকের তখন চরম দুরবস্থা।
আমি জিজ্ঞেস করলুম, আপনি কি সাইলেন্ট যুগের অভিনেতাদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন নাকি?
খুব বেশি তো বেঁচে নেই, বললেন সান্যাল মশাই। যে কজন রয়েছেন তাঁদের নিতে চেষ্টা করছি।
আমি রতন রক্ষিতের কথা বলে দিলাম, আর বললাম যে, তাঁর সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা আমি করে দিতে পারি। ভদ্রলোক তাতে বেশ উৎসাহ প্রকাশ করলেন।
এর পর আমি আসল প্রশ্নে চলে গেলুম।
টকি আসার পর কি শরৎ কুণ্ডু আর ছবিতে অভিনয় করেননি?
আজ্ঞে না, বললেন নরেশ সান্যাল। ভয়েস টেস্টেই ভদ্রলোক বাতিল হয়ে যান। তারপর যে কী করেছেন সেটা ভদ্রলোক খোলাখুলি বললেন না। মনে হল খুবই স্ট্রাগল গেছে, তাই নিজের কথা বেশি বলতে চান না। তবে সাইলেন্ট যুগ সম্বন্ধে অনেক তথ্য আমি ভদ্রলোকের কাছে পেয়েছি।
এর পর টালিগঞ্জ পাড়ার আরও কয়েকজন পুরনো কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানলুম যে, টকি আসার পরেও বেশ কয়েক বছর শরৎ কুণ্ডু সিনেমা পাড়ায় নিয়মিত যাতায়াত করতেন। সে-সময় ওঁর অবস্থা নাকি খুব খারাপ। টালিগঞ্জেরই মায়াপুরী স্টুডিওর ম্যানেজার ধীরেশ চন্দর সঙ্গে কথা বলে জানলুম যে, শরৎ কুণ্ডু নাকি মাঝে মাঝে ছবিতে একার পার্ট করে পাঁচ-দশ টাকা করে রোজগার করতেন। এইসব পার্টে অভিনেতা সাধারণত ভিড়ের মধ্যে মিশে থাকে; তার কথা বলার কোনও দরকার হয় না।
এই মায়াপুরী স্টুডিওতেই দ্বারিক চক্রবর্তী বলে এক বৃদ্ধ প্রোডাকশন ম্যানেজার আমাকে বললেন, বেনটিঙ্ক স্ট্রিটে নটরাজ কেবিনে গিয়ে খোঁজ করুন। কয়েক বছর আগে পর্যন্ত সেখানে আমি শরৎ কুণ্ডুকে দেখেছি।
শরৎ কুণ্ডুকে বিস্মৃতির অন্ধকার থেকে টেনে বার করার জন্য নটরাজ কেবিনে গিয়ে হাজির হলাম। এর মধ্যে–একথাটা বলা হয়নি–গোয়াবাগান বস্তিতে গিয়ে খোঁজ করে জেনেছি যে শরৎ কুণ্ডু আর সেখানে থাকেন না। এটাও বলা দরকার যে, আমার উৎসাহের সঙ্গে তাল রেখে চলেছেন রক্ষিত মশাই। ছোঁয়াচে ব্যারামের মতো তাঁরও এখন ধ্যান জ্ঞান চিন্তা হল শরৎ কুণ্ডু। তাঁদের দুজনের মধ্যে যে কত সৌহার্দ্য ছিল সেটা এখন মনে পড়েছে রক্ষিত মশাই-এর। যুবা বয়সের স্মৃতি, আর দুজনে তখন ডাকসাইটে জুটি। লোকে আসল ছবির কথা চিন্তাই করে না; ছবির আগে বিশু শিবুর দু রিলের কীর্তিকলাপই হল তাদের কাছে আসল। সেই জুটির একটি রয়েছে, একটি উধাও। এমন হলে কি চলে?
