এই রতন রক্ষিত কাগজে বিজ্ঞাপন দিলেন যে, তাঁর একজন সেক্রেটারি চাই। আমি তখন কলকাতাতেই ছিলাম, বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। সারাজীবন টো টো করে ঘুরে নানান রোজগারের পন্থা ট্রাই করে সবে ভাবছি এবার ঘরের ছেলে যখন ঘরে ফিরেছি তখন সেটল করা যায় কিনা, এমন সময় বিজ্ঞাপনটা চোখে পড়ল। দিলুম অ্যাপ্লাই করে। রতন রক্ষিতের নামের সঙ্গে যথেষ্ট পরিচয় ছিল, ভদ্রলোকের ছবিও দেখেছি বিস্তর। তা ছাড়া আমার যে সিনেমার প্রতি একটা স্বাভাবিক আকর্ষণ আছে। সেটা তো তোরা জানিস।
দরখাস্তের রিপ্লাই এসে গেল সাতদিনের মধ্যে। আমার ডাক পড়েছে ইন্টারভিউ-এর জন্য।
গিয়ে হাজির হলুম রক্ষিত মশাইয়ের বাড়িতে।
জানি ভদ্রলোকের শরীর খারাপ, কিন্তু চেহারা দেখে সেটা বোঝার কোনও উপায় নেই। বেশ টান-টান চামড়া, ঝকঝকে দাঁতগুলো ওরিজিন্যাল বলেই মনে হল। প্রথমেই আমাকে জিজ্ঞেস করলেন তাঁর ছবি দেখেছি কিনা। বললুম, পরের দিকের ছবি তো দেখেইছি, গোড়ার দিকেরও কিছু সাইলেন্ট ছবি দেখা আছে, যখন রক্ষিত মশাই কমিক ছবি করতেন।
উত্তর শুনে দেখলুম ভদ্রলোক খুশিই হলেন। বললেন, আমি গত কয়েক বছর ধরে আমার সব সাইলেন্ট ছবি সংগ্রহ করছি। আমার এই বাড়িতে একটি আলাদা ঘর আছে যেখানে এইসব ছবি দেখার জন্য একটা প্রজেক্টর বসিয়েছি এবং সে প্রজেক্টর চালাবার জন্য একটি লোকও রেখেছি। সাইলেন্ট ছবি আজকাল প্রায় পাওয়াই যায় না। জানেন তো, ফিল্মের গুদামে দুবার দুটি অগ্নিকাণ্ডে প্রায় সব বাংলা সাইলেন্ট ছবি পুড়ে যায়, ফলে সে সব ছবি এখন দুষ্প্রাপ্য। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। আমি কাগজে বিজ্ঞাপন দিই। তার ফলে জানতে পারি যে আমার অনেকগুলো সাইলেন্ট ছবি মীরচান্দানি নামে আমার এক প্রোডিউসারের গুদামে সযত্নে রাখা আছে। তার কারণ আর কিছুই না, মীরচান্দানি যে শুধু আমার প্রোডিউসার ছিলেন তা নয়; তিনি ছিলেন আমার ফ্যান। মীরচান্দানি মারা গেছেন বছর চারেক আগে; তার ছেলেকে বলে আমি ছবিগুলো কিনে নিই। এই ভাবে বার বার কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে আমি আমার সংগ্রহ তৈরি করি। অসুস্থতার জন্য আমাকে রিটায়ার করতে হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ফিল্মের জগৎ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখা অসম্ভব। এইসব পুরনো ছবি দেখে আমার সন্ধ্যাগুলো দিব্যি কেটে যায়। আপনার কাজ হবে আমার এই ফিল্ম লাইব্রেরির তদারক করা, ছবিগুলোর একটা ক্যাটালগ তৈরি করা, আর আমার সংগ্রহে নেই এমন ছবি খুঁজে বার করা। পারবেন তো?
আমি বললাম, চেষ্টার ত্রুটি হবে না। যেগুলো রয়েছে সেগুলোকে ক্যাটালগ করে ঠিক করে রাখা কঠিন কাজ নয়; যে ছবি নেই, তার সন্ধানের কাজটা অবিশ্যি সহজ নয়। রক্ষিত বললেন, আমি যে শুধু সাইলেন্ট ছবির কথা বলছি তা নয়, গোড়ার দিকের কিছু টকি ছবিও আমার সংগ্রহে নেই। আমার মনে হয় ধরমতলা পাড়ায় প্রযোজক-পরিবেশকদের অফিসে খোঁজ করলে সেসব ছবি নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। মোটকথা, আমার সংগ্রহে যেন কোনও ফাঁক না থাকে। বুড়ো বয়সে আমার অবসর বিনোদনের পন্থাই হবে আমার নিজের পুরনো ছবি দেখা।
চাকরি হয়ে গেল। অদ্ভুত মানুষ। ভদ্রলোকের স্ত্রী মারা গেছেন বছর পনেরো হল। দুই ছেলে আছে, দুজনেই থাকেন দক্ষিণ কলকাতায়। এক মেয়ে থাকে এলাহাবাদে, স্বামী সেখানকার ডাক্তার। নাতি-নাতনিরা মাঝে মাঝে আসে দাদুর সঙ্গে দেখা করতে; ছেলেরাও যে আসে না তা নয়, তবে ফ্যামিলির সঙ্গে তেমন যোগাযোগ নেই বললেই চলে। বাড়িতে থাকে দুটি চাকর, একটি রান্নার লোক, আর একটি খাস বেয়ারা, নাম লক্ষ্মীকান্ত! লক্ষ্মীকান্ত বাঙালি, বয়স ষাটের উপর এবং অত্যন্ত অনুগত। এমন একজন বেয়ারা পাওয়া খুব ভাগ্যের কথা।
এবং লক্ষ্মীকান্তের সাহায্যে কাজ করে আমি দিন দশেকের মধ্যে রক্ষিত মশাইয়ের সংগ্রহের একটা ক্যাটালগ করে দিলাম। তা ছাড়া ধরমতলায় ঘুরে উনি টকির আদি যুগে যে সব ছবি করেছিলেন তার অনেকগুলোর হদিস জোগাড় করে দিলাম। ভদ্রলোক সেগুলোর একটা করে প্রিন্ট কিনে নিজের। লাইব্রেরিতে রেখে দিলেন।
আমার কাজ দশটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত; কিন্তু মাঝে মাঝে সন্ধ্যাটাও রক্ষিত মশাইয়ের সঙ্গে কাটিয়ে যাই। সাড়ে ছটায় ভদ্রলোক ছবি দেখতে শুরু করেন, থামেন সাড়ে আটটায়। প্রোজেকশনিস্টের নাম আশুবাবু, বয়স পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন, কাজে কোনও ক্লান্তি নেই। দর্শক মাত্র তিনজন–রক্ষিত মশাই, বেয়ারা লক্ষ্মীকান্ত, আর আমি। বেয়ারাকে থাকতে হয়, কারণ বাবু গড়গড়ায় তামাক খান; সেই তামাক মাঝে মাঝে ফিরিয়ে দিতে হয়। তবে লক্ষ্মীকান্ত যে ছবিগুলো উপভোগ করে সেটা অন্ধকারে তার মুখের দিকে চেয়ে আমি বুঝেছি।
সবচেয়ে মজা লাগে যখন সাইলেন্ট যুগের ছবিগুলো দেখানো হয়। আগেই বলেছি যে রতন রক্ষিত সেই সময় হাসির ছবি করতেন। এইসব ছবির মধ্যে অনেকগুলো ছিল যাকে বলে শর্ট ফিল্ম। দু রিলের। ছবি, কুড়ি মিনিট ছিল তাদের দৈর্ঘ্য। এই ছবিতে দেখানো হত লরেল-হার্ডির মতো এক জুটির কীর্তিকলাপ। ছবিতে তাদের নাম ছিল বিশু আর শিবু। বিশু সাজতেন রতন রক্ষিত, আর শিবুর পার্ট করতেন শরৎ কুণ্ডু নামে এক অভিনেতা। দুই কমিক অভিনেতার হইহুল্লোড়ে বিশ মিনিট দেখতে দেখতে বেরিয়ে যেত। কখনও তারা ব্যবসাদার, কখনও জুয়াড়ি, কখনও সার্কাসের ক্লাউন, কখনও জমিদার আর মোসাহেব–এইরকম আর কি? কুণ্ডুরক্ষিতের এই জুটি তখন খুব পপুলার হয়েছিল এটা মনে আছে। বড় ছবির আগে এই কুড়ি মিনিটের শর্ট ফিল্ম দেখানো হত।
