ভদ্রলোক চাকতিটা চোখের সামনে ধরলেন। এবার আমি বুঝতে পেরেছি জিনিসটা কী।
এ তো অনেক পুরনো জিনিস দেখছি।
আজ্ঞে যা।
এ জিনিস তো আজকাল আর এত বড় দেখা যায় না।
এটা যদি একবারটি ওজন করে দেখে দেন।
বৃদ্ধ নিক্তিটা কাছে টেনে এনে তাতে কালসিটে পড়া চাকতিটা চাপালেন।
.
নেকস্ট্ স্টপ যোগেশ কবিরাজের বাড়ি। আমার মনের কোণে একটা সন্দেহ উঁকি দিচ্ছে, কিন্তু আদিত্যর মুখের ভাব দেখে তাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করলাম না।
কবিরাজ মশাইয়ের বাড়ির বাইরে দুটি বছর দশেকের ছেলে বসে মার্বেল খেলছিল। গাড়ি আসতে দেখে তারা গভীর কৌতূহলের সঙ্গে খেলা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তাদের জিজ্ঞেস করতে বলল সান্যাল মশাই থাকেন সদর দরজা দিয়ে ঢুকে বাঁ দিকের ঘরে।
সামনের দরজা খোলাই ছিল। বাঁয়ের ঘর থেকে আওয়াজ পাচ্ছিলাম। আরও এগোতে বুঝলাম সান্যাল মশাই আপন মনে আবৃত্তি করে চলেছেন। দেবতার গ্রাস। আমরা ঘরের দরজার মুখটায় গিয়ে দাঁড়াতেও সে আবৃত্তি চলল যতক্ষণ না কবিতা শেষ পংক্তিতে পৌঁছায়। আমরা যে এসে দাঁড়িয়েছি সেটা যেন তাঁর খেয়ালই নেই।
একটু আসতে পারি? আদিত্য জিজ্ঞেস করল আবৃত্তি শেষ হবার পর।
ভদ্রলোক ঘুরে দেখলেন আমাদের দিকে।
আমার এখানে তো কেউ আসে না।
ভাবলেশহীন কণ্ঠস্বর। আদিত্য বলল, আমরা এলে আপত্তি আছে কি?
আসুন।
আমরা ঢুকলাম গিয়ে ঘরের ভিতর। তক্তপোষ ছাড়া বসবার কিছু নেই। দুজনে দাঁড়িয়েই রইলাম। সান্যাল মশাই চেয়ে আছেন আমাদের দিকে।
আদিত্যনারায়ণ চৌধুরীকে আপনার মনে আছে? আদিত্য প্রশ্ন করল।
বিলক্ষণ, বললেন ভদ্রলোক। আলালের ঘরের দুলাল। ছাত্র ভালই ছিল, তবে আমাকে কোনওদিন টেক্কা দিতে পারেনি। হিংসে করত। প্রচণ্ড হিংসে। আর মিথ্যে কথা বলত।
জানি, বলল আদিত্য। তারপর পকেট থেকে একটা মোড়ক বার করে সান্যালের হাতে দিয়ে বলল, এইটে আদিত্য আপনাকে দিয়েছে।
ওটা কী?
টাকা।
টাকা? কত টাকা?
দেড়শো। বলেছে এটা আপনি নিলে সে খুশি হবে।
হাসব না কাঁদব? আদিত্য টাকা দিয়েছে আমায়? হঠাৎ এ মতি হল কেন?
সময়ের প্রভাবে তো মানুষ বদলায়। আদিত্য এখন হয়তো আর সে আদিত্য নেই।
আদিত্য বদলাবে? প্রাইজ পেলুম আমি। উকিল রামশরণ বাঁড়ুজ্যের নিজের হাতে দেওয়া মেডেল। সেটা তার সহ্য হল না। সে আমার কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে গেল তার বাপকে দেখাবে বলে। তারপর আর ফেরতই দিলে না। বললে পকেটে ফুটো ছিল, গলে পড়ে গেছে।
এটা সেই মেডেলেরই দাম। আপনার পাওনা।
সান্যালের চোখ কপালে উঠে গেল। ফ্যালফ্যাল করে আদিত্যর দিকে চেয়ে বলল, মেডেলের দাম কী রকম? সে তো বড় জোর পাঁচ টাকা। রুপোর মেডেল তো!
রুপোর দাম ত্রিশগুণ বেড়ে গেছে।
বটে? আশ্চর্য! এ খবর তো জানতুম না। তবে…
সান্যাল মশাই হাতের পনেরোটা দশ টাকার নোটের দিকে দেখলেন। তারপর মুখ তুলে চাইলেন আদিত্যর দিকে। এবার তাঁর চোখেমুখে এক অদ্ভুত নতুন ভাব। বললেন, এতে যে বড় চ্যারিটির গন্ধ এসে পড়ছে, আদিত্য!
আমরা চুপ। সান্যাল মিটিমিটি চোখে চেয়ে আছেন আদিত্যর দিকে। তারপর মাথা নেড়ে হেসে বললেন, তোমার ডান গালের ওই আঁচিল দেখে নগাখুড়োর চায়ের দোকানেই আমি চিনে ফেলেছি তোমায়। আমি বুঝেছি তুমি আমায় চেনোনি, তাই সেই প্রাইজের দিনের কবিতাটাই আবৃত্তি করলুম, যদি তোমার মনে পড়ে। তারপর যখন দেখলুম তুমি আমার বাড়িতেই এলে, তখন কিছু পুরনো ঝাল না ঝেড়ে পারলুম না।
ঠিকই করেছ, বলল আদিত্য, তোমার প্রত্যেকটা অভিযোগ সত্যি। কিন্তু এ টাকা তুমি নিলে আমি খুশি হব।
উঁহু, মাথা নাড়লেন শশাঙ্ক সান্যাল। টাকা তো ফুরিয়ে যাবে, আদিত্য। বরং মেডেলটা যদি থাকত তা হলে নিতুম। আমার ছেলেবেলার ওই একটি অপ্রিয় ঘটনা আমি ভুলে যেতুম মেডেলটা পেলে। আমার মনে আর কোনও খেদ থাকত না।
চিলেকোঠাতে ঊনত্রিশ বছর লুকিয়ে রাখা মেডেল যার জিনিস তার কাছেই আবার চলে এল। এতদিনেও তার গায়ে খোদাই করে লেখাটা ম্লান হয়নি–শ্রীমান শশাঙ্ক সান্যাল–আবৃত্তির জন্য বিশেষ পুরস্কার–১৯৪৮।
সন্দেশ, চৈত্র ১৩৮৭
জুটি
আজ আমি একজন ফিল্মস্টারের কথা বলতে যাচ্ছি, চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন তারিণীখুড়ো।
কে তিনি? তাঁর নাম কী? আমরা সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠলাম।
তাঁর নাম তোরা শুনিসনি, বললেন তারিণীখুড়ো। তিনি যখন রিটায়ার করেন তখন তোরা সবে জন্মেছিস।
তবু আপনি নামটা বলুন না, বললে নাছোড়বান্দা ন্যাপলা। আজকাল টেলিভিশনে অনেক পুরনো ফিল্মস্টারের ছবি আমরা দেখি।
তাঁর নাম হল রতনলাল রক্ষিত।
তা হলে তো ভালই হল, বললেন তারিণীখুড়ো। তাঁকে ছবিতে দেখে থাকলে গল্পটা আরও জমবে।
এটাও কি ভূতের গল্প? ন্যাপলা জিজ্ঞেস করল।
না, ভূত নয়। তবে ভূত বলতে তো শুধু প্রেতাত্মা বোঝায় না, ভূতের আরও মানে আছে। একটা মানে হল অতীত, অর্থাৎ যা ঘটে গেছে। ভবিষ্যতের উলটো। সেই অর্থে এটা ভূতের গল্প বলতে পারিস।
বেশ, তা হলে শুরু হোক।
তাকিয়াটাকে কোলের কাছে টেনে নিয়ে তারিণীখুড়ো শুরু করলেন তাঁর গল্প—
রতন রক্ষিত রিটায়ার করেন ১৯৭০-এ সত্তর বছর বয়সে। শরীরটা হঠাৎ ভেঙে পড়েছিল, তাই ডাক্তার বললেন কমপ্লিট রেস্ট। তার আগে পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে একটানা অভিনয় করে গেছেন রক্ষিতমশাই। তার মানে সেই সাইলেন্ট যুগ থেকে। অগাধ টাকা করেছিলেন ছবি করে, আর সেই টাকার সদ্ব্যবহার কী করে করতে হয় সেটাও জানতেন। তিনখানা বাড়ি ছিল কলকাতায়। নিজে থাকতেন আমহার্স্ট স্ট্রিটে, আর অন্য দুখানা ভাড়া দিয়ে দিয়েছিলেন।
