দেখতে দেখতে পসার জমে উঠল। এরকম র্যাপিড সাকসেস হবে তা আশা করিনি। এক বছরের মধ্যে একটা বড় ফ্ল্যাটে উঠে যেতে হল, একটা বি.এ. পাশ ছোঁকরা সেক্রেটারি রাখতে হল। সারা ভারতবর্ষ থেকে হাতের ছাপ আসে, সেই ছাপ দেখে আমি ইংরিজিতে গণনা করি, সেক্রেটারি সেগুলো টাইপ করে যথাস্থানে পাঠিয়ে দেয়। বেশিরভাগ মক্কেলই হচ্ছে ব্যবসাদার, আর তাদের মধ্যে বেশিরভাগই মাড়োয়ারি। মাসে রোজগার তখন আমার প্রায় তিন হাজার টাকা, আর আমার বয়স তখন বত্রিশ। তা হলে কদ্দিন আগের কথা বুঝতেই পারছিস।
এর মধ্যে একদিন এক ভদ্রলোক এলেন, ফর্সা একহারা চেহারা, চোখে চশমা, পরনে বিলিতি পোশাক। বয়স আন্দাজ ত্রিশেক। তিনি তাঁর হাতটা দেখিয়ে বললেন, আমি শুধু একটা জিনিস জানতে চাই। আমি একটা নতুন চাকরিতে জয়েন করেছি। সে কাজটা ঠিক হচ্ছে না ভুল হচ্ছে?
আমি হাতের রেখা দেখে বললাম, যা করতে যাচ্ছ করো। তোমার নতুন চাকরিতে উন্নতি হবে।
ভেরি গুড, বললেন ভদ্রলোক। এবার আমি তোমাকে একটা জিনিস দেখাতে চাই।
আমি আগেই লক্ষ করেছিলাম যে ভদ্রলোকের কাঁধে একটা নকশাদার কাপড়ের ব্যাগ ঝুলছে। ভদ্রলোক তার মধ্যে থেকে একটা বেশ বড় খাম বার করে তার ভিতর থেকে এক শিট কাগজ টেনে বার করলেন। কাগজটা পুরনো, তা দেখলেই বোঝা যায়। সেই কাগজে রয়েছে কালো কালিতে একটা রেখা সমেত হাতের ছাপ। ভদ্রলোক সেটা আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। কাগজের উপর দিকে ডান কোনায় একটা তারিখ লেখা রয়েছে সেটা পনেরো বছর আগে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, এটা কার হাতের ছাপ?
আমার বাবার,বললেন ভদ্রলোক। একটা পুরনো বাক্স ঘাঁটতে ঘাঁটতে বেরিয়ে পড়ল। মনে হয় এটা উনি দিয়েছিলেন বম্বের গণৎকার পটবর্ধনকে পাঠানোর জন্য। কিন্তু ঘটনাচক্রে সেটা আর হয়ে ওঠেনি।
আমাকে কি এখন এই হস্তরেখা দেখে গণনা করতে হবে?
হ্যাঁ। বিশেষ কয়েকটা তথ্য।
আপনার বাবার বয়স তখন কত ছিল?
পঞ্চাশ।
আমি হাতের রেখা বিচার করে একটা অদ্ভুত তথ্য আবিষ্কার করলাম। ভদ্রলোকের মৃত্যু হয়েছে ওই পঞ্চাশ বছর বয়সেই। সেটা আমি বললাম আমার মক্কেলকে।
স্বাভাবিক মৃত্যু কি? জিজ্ঞেস করলেন মক্কেল।
আমি আবার ভাল করে দেখলাম ছাপটা। তারপর বললাম, রেখা স্পষ্ট বলছে অপঘাত মৃত্যু, স্বাভাবিক নয়।
এ বিষয় আপনি নিশ্চিত?
অ্যাবসোলিউটলি, আমি জোর দিয়ে বললাম।
তা হলে আপনাকে ঘটনাটা একটু খুলে বলি, বললেন ভদ্রলোক। আমার বাবার নাম ছিল প্রকাশচন্দ্র মাথুর। আমি বাবার একমাত্র সন্তান। আমার মা আমাকে জন্ম দিতে মারা যান; আমি মানুষ হই এক বিধবা পিসির কাছে। আমার নাম সুরেশ মাথুর। বাবা ব্যবসাদার ছিলেন। বাবার একজন অংশীদার ছিল, নাম গজানন আপ্টে। আজ থেকে পনেরো বছর আগে–তখন আমার বয়স সতেরো বাবা একটা বিশেষ কারণে খুব কষ্ট পান। বাবাকে এত বিচলিত হতে আমি কখনও দেখিনি। আমি কারণ জিজ্ঞেস করতে বাবা বলেন, যাকে আপনার জন বলে মনে করা যায়, সে যদি বিশ্বাসঘাতকতা করে তা হলে যত কষ্ট পেতে হয় তেমন আর কিছুতে হয় না। আমার স্বভাবতই বাবার বিজনেস পার্টনারের কথা মনে হয়; কিন্তু বাবা এই নিয়ে আর কিছু বলতে চান না। এর কিছুদিন পরেই একদিন বিকেলে আপিসে বাবাকে চেয়ারে বসা অবস্থায় তাঁর টেবিলের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। তখনই ডাক্তার ডাকা হয়। ততক্ষণে বাবা মারা গেছেন। ডাক্তার বলেন হার্ট অ্যাটাক। আমার ইচ্ছা ছিল পুলিশ ডাকার, কারণ আমার সন্দেহ হয়েছিল বাবাকে হত্যা করা হয়েছে। বাবা তাঁর অংশীদারের কীর্তি ধরে ফেলেছেন, তাই তাঁকে মেরে তাঁর মুখ বন্ধ করা হয়েছে। কিন্তু আমার তখন মাত্র সতেরো বছর বয়স–আমার কথা কে শুনবে? আজ আপনার গণনায় জানতে পারছি যে, আমার ধারণাই ঠিক ছিল, বাবাকে খুনই করা হয়েছিল।
আমি বললাম, যাই হোক, যা হওয়ার হয়ে গেছে। এতদিন আগের খুনের ব্যাপারে আজকে তো আর তুমি কিছু করতে পারবে না।
সুরেশ মাথুর ধন্যবাদ দিয়ে আমার পারিশ্রমিক চুকিয়ে দিয়ে চলে গেল।
এই ঘটনার প্রায় ছমাস পরে একদিন হঠাৎ আমার কাছে এক মক্কেল এসে হাজির, বছর ষাটবাষট্টি বয়স, ঘি খাওয়া চেহারা, বললেন তিনি একজন ব্যবসাদার, একটা নতুন ব্যবসায়ে টাকা ঢালতে যাচ্ছেন, তার ফলাফল কী হবে সেটা জানতে চান। সামনে তাঁর কোনও আর্থিক বিপর্যয় আছে কি?
আমি জিজ্ঞেস করতে বললেন তাঁর নাম গজানন আপ্টে। আমি তো শুনে অবাক!
যাই হোক, মক্কেল যখন, তখন তাঁকে অ্যাটেন্ড করতেই হবে। আমি তাঁকে আমার ফরাসে বসালাম। তারপর আমার একটা প্রশ্ন ছিল সেটা করলাম।
আপনার বয়স কত?
ভদ্রলোক বললেন, ছেষট্টি।
আমি হাতের রেখার দিকে মন দিলাম। দেখি যে নতুন ব্যবসা ফাঁদার কোনও প্রশ্ন আসছে না। এই বছরই ভদ্রলোকের মৃত্যু এবং সেটা অপঘাত মৃত্যু। সেকথা তো আর তাঁকে বলতে পারি না; বললাম, তোমার নতুন ব্যবসায়ে টাকা ঢেলে কোনও সুফল হবে না; তুমি যা করছ তাই করো।
তুমি ঠিক বলছ? ভদ্রলোক আবার প্রশ্ন করলেন। আমি কিন্তু অনেক ভেবেচিন্তে এই পন্থা স্থির করেছি।
আমি ভদ্রলোককে আবার বারণ করলাম। তাঁর হাতের তেলো আমার সামনে খোলা, আমি তখনও মনে মনে গণনা করে চলেছি। হঠাৎ একটা ব্যাপার দেখে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম।
