ভদ্রলোক হেসে বললেন, সেটা হল আমার আজকের পরিচয়। মণীশ গঙ্গোপাধ্যায় আমার আসল নাম নয়। আমার আসল নামে আপনি আমাকে চিনতেন পঁচিশ বছর আগে। সে নাম হল গণেশ মুৎসুদ্দি।
ঠিক কথা, বলল সুখময়। আমি আপনার একটি পোর্ট্রেট করি–পঁচিশ বছর পরে আপনার যে চেহারা হবে সেটা অনুমান করে। সে ছবির কথা আমার এখন স্পষ্ট মনে পড়ছে। কিন্তু সে চেহারার সঙ্গে আপনার আজকের চেহারার কোনও মিল নেই। কাজেই আমি কৃতকার্য হইনি। হলে আপনি আমাকে পাঁচ হাজার টাকা দেবেন বলেছিলেন, কিন্তু সে টাকাও আমি দাবি করতে পারি না! কাজেই–
দাঁড়ান, আপনাকে সে ছবিটা দেখাই, বলে ভদ্রলোক মোড়ক খুলে ছবিটা টেবিলের উপর দাঁড় করালেন। তারপর বললেন, ভুলবেন না, আমি অভিনেতা। এবার দেখুন আমার দিকে।
সুখময় ভদ্রলোকের দিকে চাইল। ভদ্রলোক এক টানে তার গোঁফ আর মাথার চুল খুলে ফেললেন। সুখময় অবাক হয়ে দেখল তার সামনে হুবহু তার পোর্ট্রেটের চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন গণেশ মুৎসুদ্দি।
এটাই আমার আসল চেহারা, বললেন গণেশ মুৎসুদ্দি। এই চেহারা আপনি অদ্ভুত ক্ষমতাবলে পঁচিশ বছর আগেই অনুমান করতে পেরেছিলেন। আমি তখন ছিলাম ইনশিওরেন্স কোম্পানির চাকুরে। কিন্তু অভিনয়ের শখ আমার তরুণ বয়স থেকেই। একবার এক বন্ধু পরিচালকের অনুরোধে পড়ে একটা বাংলা ছবিতে অভিনয় করি। প্রচুর সুনাম হয়। সেই থেকেই আমি অভিনেতা। নামটা বদলে নিই প্রথমেই। অর্থাৎ সবটাই আমার মুখোশ। টাক পড়ে যাচ্ছিল দেখে ফিল্মে পরচুলা ব্যবহার করতে শুরু করি। একটা গোঁফও নিই সেইসঙ্গে। আমার এই চেহারাটাই দর্শক পছন্দ করে। কিন্তু আমার আসল চেহারা হল এই ছবির চেহারা। আপনাকে কথা দিয়েছিলাম চেহারা মিললে পুরস্কার দেব। এই নিন সেই পুরস্কার।
সুখময় দেখল যে, তার হাতে চলে এসেছে একটি কুড়ি হাজার টাকার চেক। এবার গণেশ মুৎসুদ্দি বললেন, শুনুন, আমি অভিনয় করি বলে যে আর্টের প্রদর্শনীতে যাই না তা নয়। আপনার এ মতিভ্রম হল কেন? আপনার পোর্ট্রেটে এত সুন্দর হাত–আপনি সেই ছেড়ে অন্য লাইনে গেলেন কেন?
সুখময় আর কী বলবে, চুপ করে রইল। আমি আপনাকে বলছি, বললেন গণেশ মুৎসুদ্দি, আপনি সমালোচকের কথা ভুলে যান। আপনি আবার পোর্ট্রেট আঁকতে শুরু করুন। আমার ধারণা, আপনার হাত এখনও নষ্ট হয়নি।
গণেশ মুৎসুদ্দি ছবিটা আবার মোড়কে পুরে নিয়ে বললেন, আমি তা হলে আসি। আমার অ্যাডভাইসটা অগ্রাহ্য করবেন না।
সুখময় করেনি অগ্রাহ্য, এবং তাতে আশ্চর্য ফল পেয়েছিল। ১৯৯৫-এর ডিসেম্বরে তার আঁকা পোর্ট্রেটের প্রদর্শনীতে নতুন করে তার দক্ষতার সুখ্যাতি হল। আর সেইসঙ্গে ছবি বিক্রিও হল ভাল।
সন্দেশ, কার্তিক ১৩৯৪
গণৎকার তারিণীখুড়ো
তারিণীখুড়োর এক ভাইপো এক চা কোম্পানিতে ভাল কাজ করে, সে খুড়োকে এক টিন স্পেশাল কোয়ালিটির চা দিয়েছে। খুড়ো টিনটা আমার হাতে চালান দিয়ে বললেন, এটা খোলাবার ব্যবস্থা কর; আজ তোদের চা না খেয়ে এইটে খাব।
বৈশাখ মাসের এক রবিবারের সন্ধে। দুপুরের দিকে কালবৈশাখী হয়ে গেছে, এখন সব শান্ত। আমাদের ঘরে খুড়োর শ্রোতারা সব জমায়েত হয়েছে, তার মধ্যে অবিশ্যি ন্যাপলাও আছে। ন্যাপলা বলল, ভূতের গল্প অনেক হয়েছে খুড়ো; আজ একটা অন্য কিছু হোক। আপনি একবার বলেছিলেন আপনি কিছুদিন গণকারী করেছিলেন, তখন একটা আশ্চর্য ঘটনা হয়। সে গল্প কিন্তু আজ অবধি শোনা হয়নি।
ও, সে গল্প বলিনি বুঝি?
আমরা সবাই একসঙ্গে না বললাম।
খুড়ো বললেন, আগে ওই নতুন চা-টায় একটা চুমুক দিয়ে নিই। কাপে ঠোঁট ঠেকাতে না পারলে গল্প খোলে না।
পাঁচ মিনিটের মধ্যেই চা এসে গেল, ভুরভুরে সুগন্ধ, খুড়ো ওই গরম চাতেই একটা চুমুক দিয়ে বললেন, বাঃ, খাসা চা। তারপর একটা এক্সপোর্ট কোয়ালিটি বিড়ি ধরিয়ে নিয়ে গল্প আরম্ভ করলেন।
.
ঘটনাটা ঘটে নাগপুরে। আমি বোম্বাই গেলাম যদি ফিল্মে কিছু কাজ পাওয়া যায়। তার মানে মনে করিস না যে আমার ফিল্মে অভিনয় করার ইচ্ছে ছিল। তা নয় মোটেই। আমি প্রোডাকশন ম্যানেজারের কাজটা ভাল জানতাম; টালিগঞ্জে দুটো ছবিতে ওই কাজ করেছি, তাই সেইদিকেই চেষ্টা করছিলাম। একটা ছবিতে কাজ জুটেও গেল।
আমি থাকি ভিলে পার্লেতে একটা দোতলা বাড়ির একতলায় একটা ছোট ফ্ল্যাটে। পুরো দোতলাটা নিয়ে থাকেন বম্বের এক বিখ্যাত জ্যোতিষী মুকুন্দ পটবর্ধন। দিশি মতে হাত দেখিয়ে হিসেবে তার খুব নামডাক। আমার প্রতিবেশী, তাই আমার সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল। কেন জানি না, ভদ্রলোকের আমাকে খুব ভাল লেগে গেল। বললেন, তোমাকে আমি পামিস্ট্রি শিখিয়ে দেব।
যে কথা সেই কাজ। কাজের পর রাত্তিরে ভদ্রলোকের ঘরে বসে হস্তরেখা গণনা শিখতে আরম্ভ করলাম। অদ্ভুত সাবজেক্ট। নেশা ধরে গেল। দুমাসের মধ্যে দেখি আমিও বেশ হাত দেখতে পারছি। স্টুডিওর কয়েকজনের হাত দেখে অতীত ভবিষ্যৎ বলে দিলাম, এক প্রোডিউসারের ছবি হিট হবে সেটা বলে দিলাম, আর ফলেও গেল।
শেষটায় একটা সময় এল যখন মনে হল আমি নিজেই এ কাজ করে রোজগার করতে পারি। এক কাজে বেশিদিন টিকতে পারি না সেটা তো তোদের বলেইছি, তাই ফিল্মের লাইন ছেড়ে পামিস্ট্রি ধরলাম। কিন্তু বম্বেতে নয়। বম্বেতে এ কাজে পটবর্ধন একচ্ছত্র অধিপতি। আমাকে অন্য জায়গা দেখতে হবে। চলে গেলুম নাগপুর। পাচপাগুলি অঞ্চলে রাস্তার উপর একটা ঘর নিয়ে দরজার পাশে নোটিশ লটকে দিলুম–এখানে সুলভে হস্তরেখা দেখে ভবিষ্যৎ গণনা করা হয়। বেঙ্গলের বিখ্যাত গণৎকার ইত্যাদি।
