ভদ্রলোকের হাতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তিনি পনেরো বছর আগে একটা খুন করেছেন। সাংঘাতিক ফাঁড়া, কিন্তু সে ফাঁড়া তিনি কাটিয়ে উঠেছেন, সেকথাও হাতে রয়েছে।
আমি অবিশ্যি এ বিষয়ে আর কিছু বললাম না। ভদ্রলোক আমাকে টাকা দিয়ে আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। আমি আবার বলে দিলাম যে, নতুন ব্যবসায়ে টাকা ঢেলে কোনও ভাল ফল হবে না।
এর সাতদিন পরে সুরেশ মাথুর আবার এসে হাজির। আমি বললাম, কী ব্যাপার?
মাথুরকে বিশেষভাবে উত্তেজিত বলে মনে হচ্ছিল। সে বলল যে, এর মধ্যে নাকি গজানন আপ্টের আপিসে গিয়েছিল। আপ্টে ছিলেন না কিন্তু তাঁর সেক্রেটারি ছিল। সেটা জেনে-শুনেই নাকি মাথুর গিয়েছিল। সেক্রেটারি নাকি বিশ বছর ধরে ওই আপিসে চাকরি করছে। তার সঙ্গে কথা বলার দরকার ছিল মাথুরের। মাথুর তাকে তার বাপের মৃত্যুর কথা জিজ্ঞেস করে। সেক্রেটারি বলে, তার ঘটনাটা পরিষ্কার মনে আছে। সে প্রকাশ মাথুরের বিশেষ অনুরক্ত ছিল। সে বলে বিকেলে কফি খাওয়ার পরই নাকি প্রকাশ মাথুর মারা যান। সেক্রেটারি সন্দেহ করেছিল যে, কফিতে বিষ মেশানো হয়েছে, কিন্তু ডাক্তারের মুখের উপর সে কোনও কথা বলতে পারেনি।
তা হলে এখন তোমার কী মতলব? আমি সুরেশ মাথুরকে জিজ্ঞেস করলাম।
সুরেশ চাপা স্বরে বলল, আমি বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেব।
সে কী? কী করে?
যে করে হোক।
আমি যে ইতিমধ্যে গজানন আপ্টের হাত দেখেছি আর জেনেছি যে তাঁর আয়ু ফুরিয়ে এসেছে, সে বিষয়ে আর কিছু বললম না। সুরেশ মাথুর প্রতিশোধের সংকল্প নিয়ে আমার আপিস থেকে বেরিয়ে গেল।
এর তিনদিন পরে খবরটা খবরের কাগজে বেরোল। গজানন আপ্টে খুন হয়েছেন। তিনি ইটওয়ারি রোডে থাকতেন। রোজ সন্ধ্যায় আপিসের পর জুমা তালাও-এর পাশে হাঁটতে যেতেন। সেই হাঁটা অবস্থায় পিছন থেকে কেউ এসে তাঁকে কোনও ভারী অস্ত্র দিয়ে মাথায় মেরে খুন করেছে। পুলিশ আততায়ীর অনুসন্ধান করছে।
কিন্তু আমি তো সুরেশ মাথুরের হাত দেখেছি। আমি জানি তার এখন একটা ফাঁড়া আছে, কিন্তু এ ফাঁড়া সে কাটিয়ে উঠবে।
শেষ পর্যন্ত হলও তাই। পুলিশ খুনিকে ধরতে পারল না, এবং গজানন আপ্টের খুন আনসম্ভড ক্রাই-এর পর্যায়ে ফেলে দেওয়া হল।
সুরেশ মাথুর যে শুধু পারই পেল তা নয়। আমি জানি যে বিরাশি বছরের আগে তার মৃত্যু নেই, এবং সে মৃত্যু স্বাভাবিক মৃত্যু অন্তত তার হাতের রেখা তাই বলে।
সন্দেশ, আষাঢ় ১৩৯৫
গল্পবলিয়ে তারিণীখুড়ো
তোরা তো আমাকে গল্পবলিয়ে বলেই জানিস, বললেন তারিণীখুড়ো, কিন্তু এই গল্প বলে যে আমি এককালে রোজগার করেছি সেটা কি জানিস?
না বললে জানব কী করে? বলল ন্যাপলা।
সে আজ থেকে বাইশ বছর আগের কথা, বললেন তারিণীখুড়ো। বম্বেতে আছি, ফ্রি প্রেস জার্নাল কাগজে এডিটরের কাজ করছি, এমন সময় একটা বিজ্ঞাপন দেখলাম–আমেদাবাদের এক ধনী ব্যবসায়ী একজন গল্পবলিয়ের সন্ধান করছে। ভারী মজার বিজ্ঞাপন। হেডলাইন হচ্ছে ওয়ানটেড এ স্টোরি টেলার। তারপর লেখা আছে যে আমেদাবাদের একজন কাপড়ের ব্যবসায়ী বলবন্ত পারেখ একটি ব্যক্তির সন্ধান করছেন যে তাঁকে প্রয়োজনমতো একটি করে মৌলিক গল্প শোনাবে। সে লোক বাঙালি হলে ভাল হয়, কারণ বাঙালিরা খুব ভাল গল্প লেখে। বুঝে দেখ–মৌলিক গল্প। অন্যের লেখা ছাপা গল্প হলে চলবে না। সেরকম গল্প তো পৃথিবীতে হাজার হাজার আছে। কিন্তু এ বোক চাইছে এমন গল্প, যা আগে কোথাও প্রকাশিত হয়নি। এখন ব্যাপারটা হচ্ছে কী, আমার পক্ষে গল্প তৈরি করা খুব কঠিন নয়। আমার জীবনের এতরকম অভিজ্ঞতা হয়েছে, তাতেই একটু-আধটু রঙ চড়িয়ে রদবদল করে বলে নিলেই সেটা গল্প হয়ে যায়। তাই কপাল ঠকে অ্যাপ্লাই করে দিলুম। এটাও জানিয়ে দিলুম যে, আমি গুজরাতি জানি না, তাই গল্প বললে হয় ইংরিজিতে না হয় হিন্দিতে বলতে হবে। হিন্দিটা আমার বেশ ভাল রকমই রপ্ত ছিল আর ইংরিজি তো কলেজে আমার সাবজেক্টই ছিল। সাতদিনে উত্তর এসে গেল। পারেখ সাহেব জানালেন ওঁর ইনসমনিয়া আছে, রাত সাড়ে তিনটে-চারটের আগে ঘুমোন না, সেই সময়টা গল্প শুনতে চান। রোজ নয়, যেদিন মন চাইবে। মাইনে মাসে হাজার টাকা।
আমি আমার বম্বের খবরের কাগজের চাকরি ছেড়ে দিলুম। দেড় বছর করছি এক কাজ, আর এমনিতেই ভাল লাগছিল না।
বুড়ো থেমে দুধ চিনি ছাড়া চায়ে একটা চুমুক দিয়ে আবার শুরু করলেন।
.
আমেদাবাদ গিয়ে জানলুম পারেখ সাহেবের কাপড়ের মিল আছে, বিরাট ধনী লোক। বাড়িটাও পেল্লায়, অন্তত বারো-চোদ্দখানা ঘর। তার একটাতেই আমাকে থাকতে দিলেন। বললেন, তোমার ডিউটির তো কোনও ধরাবাঁধা সময় নেই। মাঝরাত্তিরে তোমায় ডাক–অন্য জায়গায় থাকলে চলবে কী করে। তুমি আমার বাড়িতেই থাকো। ভদ্রলোকের বয়স পঁয়তাল্লিশের বেশি না। অর্থাৎ আমারই বয়সি। দুই ভাইপো আছে, হীরালাল আর চুনীলাল–তারা কাকার ব্যবসায় লেগে গেছে। এর মধ্যে হীরালালের বিয়ে হয়ে গেছে, সে বউ আর দুটি ছেলেমেয়ে নিয়ে ওই একই বাড়িতে থাকে।
খাওয়ার ব্যাপারে আমার কোনও ঝামেলা নেই। পারেখ সাহেব জিজ্ঞেস করলেন আমি কোনও স্পেশাল রান্না খাব কিনা, আমি বলে দিলাম যে আমি গুজরাতি রান্নায় অভ্যস্ত।
মোট কথা, মাসখানেকের মধ্যেই বেশ গ্যাঁট হয়ে বসলাম। গল্প দেখলাম মাসে দশ দিনের বেশি বলতে হচ্ছে না। বাকি সময়টা খাতায় গল্পের প্লট নোট করে রাখতাম। ইচ্ছে করলে আমি নিজেই একজন গল্পলিখিয়ে হয়ে যেতে পারতাম, কিন্তু তাতে মাসে হাজার টাকা আয় হত না। ভূতের গল্প, শিকারের গল্প, ক্রাইমের গল্প–সাধারণত এইগুলোই ভদ্রলোক বেশি ভালবাসতেন শুনতে। তোরা তো। জানিসই ভূতের অভিজ্ঞতা আমার অনেক হয়েছে। তেমনি রাজারাজড়াদের সঙ্গে শিকারও করেছি কম। ক্রাইমের গল্পটা মাথা থেকে বার করে বলতুম, সেটা বেশ ভালই উতরিয়ে যেত। মোটামুটি ভদ্রলোক আমার কাজে খুশিই ছিলেন।
