সুখময় সেন পোর্ট্রেট এঁকে যেমন নাম করেছিল, ল্যান্ডস্কেপ এঁকে তেমন করেনি। সমালোচকের মন্তব্য তাকে পীড়া দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেইসঙ্গে তার কিছুটা সে না মেনেও পারেনি। দৈনিক বার্তা কাগজের চিত্রসমালোচক অম্বুজ সান্যাল সুখময় সেন সম্পর্কে একটি দীর্ঘ আলোচনায় অনুযোগ করলেন যে, প্রাচীন পথ ধরে চলাই হচ্ছে সুখময়ের উদ্দেশ্য। অথচ তার তুলির জোর আছে। রঙের উপর দখল আছে, টেকনিকে সে দক্ষ; তা হলে সে পুরনো পথ ছেড়ে আজকের রীতি অবলম্বন করবে না কেন? আর্ট তো চিরকাল এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার রীতিনীতি পরিবর্তন হয়। সুখময়কে মডার্ন হতেই হবে। নইলে তার কাজে অবসাদের ছায়া আসতে বাধ্য।
১৯৭৫-এর মে মাসের প্রদর্শনীতে সুখময়ের নতুন ঢং-এর কাজের নমুনা দেখা গেল। দু-একজন প্রশংসা করলেন বটে, কিন্তু ছবি বিক্রি হল না। অথচ সুখময় পেশাদারি চিত্রকর, ছবি এঁকেই তাকে পেট চালাতে হয়।
এদিকে গোলমাল যা হবার তা হয়ে গেছে। মডার্ন আর্ট করতে গিয়েই সুখময়ের কাল হল। জীবনে সে প্রথম টের পেল অর্থাভাব কাকে বলে। নবীন নস্কর লেনে তার ফ্ল্যাটে তিনখানা ঘরে সে বাস করে। তার সঙ্গে এতদিন ছিলেন তার মা ও বাবা। ১৯৮০-র ডিসেম্বর সুখময়ের বাপের মৃত্যু হল। মার অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও সুখময় বিয়ে করেনি। ভাগ্যিস!–কারণ ১৯৭০-এর সুখময় আর ১৯৮০-র সুখময়ে অনেক পার্থক্য। শিল্পী হিসাবে তার যে আত্মপ্রত্যয় ছিল সেটা সে হারিয়েছে। মডার্ন আর্ট সে এখনও করছে এবং স্বল্পমূল্যে কয়েকটা বিক্রিও হয়, কিন্তু তাতে সংসার চলে না।
১৯৮৫-তে সুখময়কে মাঝে মাঝে ফিল্মের বিজ্ঞাপন আঁকতে শুরু করতে হল। তেলরঙের আঁকা বিরাট বিরাট বিজ্ঞাপন রাস্তায় টাঙানো হবে; কে সে ছবি এঁকেছে তা কেউ জানতে চাইবে না। অত্যন্ত হীন জীবিকা, কিন্তু এ ছাড়া গতি নেই। ফ্ল্যাটের তিনটে ঘরের একটা ভাড়া হয়ে গেল। তাতে এক জ্যোতিষী এসে উঠলেন, নাম ভবেশ ভট্টাচার্য। ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হল সুখময়ের। সুখময়ের ভবিষ্যৎ গণনা করে কিন্তু জ্যোতিষী মশাই কোনও আশার আলো দেখতে পেলেন না।
১৯৮৬-র কোনও একটা সময়ে জীবন সংগ্রামের চাপে পড়ে সুখময়ের স্মৃতি থেকে শিলং-এর ঘটনাটা বেমালুম লোপ পেয়ে গেল। এই স্মৃতি লোপ পাওয়ার ব্যাপারটা ভারী অদ্ভূত; কখন যে সেটা ঘটে তা কেউ বলতে পারে না।
১৯৮৯-তে সুখময়ের মা মারা গেলেন। এখন সুখময় একেবারে একা। তার সুদিনে তার যে কিছু বন্ধু জুটেছিল–প্রণব, সাত্যকি, অরুণ–এরা সকলেই সুখময়ের দুর্দিনে সরে পড়েছে। সুখময়ের বয়স এখন বাহান্ন। এই বয়সেই রাত্তিরের টিমটিমে আলোতে সাইনবোর্ড এঁকে এঁকে তার চোখে ছানির উপক্রম দেখা দিয়েছে। অথচ বাড়িওয়ালার তাগাদা এড়াতে তাকে ক্রমাগত কাজ করে যেতেই হচ্ছে। বাড়িওয়ালা আগে যিনি ছিলেন তিনি মোটামুটি ভদ্র ছিলেন, কিন্তু তিনি মরে গিয়ে তাঁর বড় ছেলে এখন তাঁর স্থান অধিকার করেছেন। ইনি পয়লা নম্বর চামার; এঁর মুখে কিছু আটকায় না। কিন্তু আশ্চর্য এই যে, গালিগালাজও সুখময়ের গা সওয়া হয়ে গেছে!
সময় কারুর জন্য অপেক্ষা করে না। দেখতে দেখতে ১৯৯৫ সাল এসে পড়ল। সুখময়ের এখন আর একটি কাঁচা চুলও অবশিষ্ট নেই।
অক্টোবরের পনেরোই–সেদিন বিজয়া দশমী–সুখময়ের ঘরের দরজায় টোকা পড়ল। সুখময় দরজা খুলে দেখল–একটি বৃদ্ধ ভদ্রলোক, মাথায় ঢেউ খেলানো পাকা চুল আর নাকের নীচে একটি জাঁদরেল গোঁফ। ভদ্রলোকের হাতে একটি বেশ বড় চতুষ্কোণ খবরের কাগজের মোড়ক, দেখলে মনে হয় হয়তো ছবি আছে। সুখময় ভদ্রলোককে দেখে সন্তুষ্ট হল না। এখন তার অচেনা লোকের সঙ্গে কথা বলার মেজাজ নেই। বাড়িভাড়া সাত মাসের বাকি পড়েছে, বাড়িওয়ালা শাসিয়ে গেছেন এবারে মিটিয়ে না দিলে তিনি জোর করে তাকে ঘরছাড়া করবেন। গুণ্ডার সাহায্যে সবই সম্ভব।
আগন্তুকের মুখে কিন্তু হাসি। ঘরের ভিতর ঢুকে বললেন, ভুলে গেছেন বুঝি?
সুখময় কিঞ্চিৎ বিস্মিত হয়ে বললেন, কী ব্যাপার?
ভদ্রলোক বললেন, আজ কী তারিখ?
পনেরোই অক্টোবর।
কী সন?
১৯৯৫।
তাও কিছু মনে পড়ছে না। শিলং-এর সেই ঘটনা বেমালুম ভুলে গেলেন?
প্রশ্নটা করতেই–আর হয়তো ভদ্রলোকের কণ্ঠস্বর শুনেই–সুখময়ের মনে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। এক ঝলকে তার সব কথা মনে পড়ে গেল–কেবল ভদ্রলোকের নামটা ছাড়া।
মনে পড়েছে, বলে উঠল সুখময়। আপনার একটা পোর্টেট করেছিলাম আমি আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে। কিন্তু আমি তো হেরে গেলাম। আপনার মাথা ভর্তি চুল, আপনার গোঁফ, আপনার ঝুলপি এসব তো কিছুই আমি আঁকিনি।
আমার চেহারা দেখে কারুর কথা মনে পড়ছে?
এটা সত্যি কথা বটে! ভদ্রলোককে দেখেই সুখময়ের কেমন যেন চেনা চেনা লেগেছিল।
আপনি বাংলা ফিল্ম দেখেন? জিজ্ঞেস করলেন ভদ্রলোক।
তা দেখি না, তবে বাংলা ছবির বিজ্ঞাপন আঁকি।
মণীশ গঙ্গোপাধ্যায়ের নামটা চেনা লাগছে কি?
ঠিক কথা। এই মণীশ গঙ্গোপাধ্যায় নামকরা চলচ্চিত্র অভিনেতা। বয়স হয়েছে, নায়কের অভিনয় করেন না, তবে জাঁদরেল চরিত্রাভিনেতা হিসাবে তাঁর যথেষ্ট খ্যাতি আছে। সুখময় বলল, এবার চিনেছি। আপনি ক্যারেকটার রোল করেন। খুব জনপ্রিয় অভিনেতা। আমি ফিল্মের বিজ্ঞাপনে আপনার ছবি এঁকেছি।
