বাবা আমাকে দেখেই ঘাড় বেঁকিয়ে নমস্কার জানালেন। কালকের সেই ভস্মকরা চাহনির সঙ্গে আজকের চাহনির কোনও মিল নেই। আমি আর সময় নষ্ট না করে বাবাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করলাম, আমার সঙ্গে কাল যে ভদ্রলোকটি এসেছিলেন তাঁর কোনও খবর তিনি দিতে পারেন কিনা। বাবার মুখ প্রসন্ন হাসিতে ভরে গেল। বললেন, খবর আছে বইকী, তোমার দোস্ত আমার আশা পূর্ণ করেছে, সে আমার বালকিষণকে আবার ফিরিয়ে এনেছে।
এই প্রথম চোখে পড়ল বাবার ডান পাশে রাখা রয়েছে একটা পাথরের বাটি। সেই বাটিতে যে সাদা তরল পদার্থটা রয়েছে সেটা দুধ ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু সাপ আর দুধের বাটি দেখতে তো আর আমি এতদূর আসিনি। আমি এসেছি ধূর্জটিপ্রসাদ বসুর খোঁজে। লোকটা তো আর হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে পারে না। তার অস্তিত্বের একটা চিহ্নও যদি দেখতে পেতাম তবু খানিকটা নিশ্চিন্ত হওয়া যেত।
ইমলিবাবা মানুষের মনের কথা বুঝে ফেলতে পারেন এটা আগেও দেখেছি। গাঁজার কলকেতে বড়রকম একটা টান দিয়ে সেটা পাশের প্রৌঢ় চেলার হাতে চালান দিয়ে বললেন, তোমার বন্ধুকে তো তুমি আর আগের মতো ফিরে পাবে না, তবে তার স্মৃতিচিহ্ন সে রেখে গেছে। সেটা তুমি বালকিষণের ডেরার পঞ্চাশ পা দক্ষিণে পাবে। সাবধানে যেয়ো, অনেক কাঁটাগাছ পড়বে পথে।
বাবার কথামতো গেলাম বালকিষণের গর্তের কাছে। সে গর্তে এখন সাপ আছে কিনা সেটা জানার আমার বিন্দুমাত্র কৌতূহল নেই। আকাশে ডুবু ডুবু সূর্যের দিকে চেয়ে হিসেব করে দক্ষিণ দিক ধরে এগিয়ে গেলাম। ঘাস, কাঁটাঝোঁপ, পাথরের টুকরো আর চোরকাঁটার ভেতর দিয়ে গুনে গুনে পঞ্চাশ পা এগিয়ে গিয়ে একটা অর্জুন গাছের গুঁড়ির ধারে যে জিনিসটা পড়ে থাকতে দেখলাম, সেরকম জিনিস এই কয়েক মিনিট আগেই ইমলিবাবার কুটিরে দড়ি থেকে ঝুলছে দেখে এসেছি।
সেটা একটা খোলস। সারা খোলসের উপর রুহিতন মার্কা নকশা।
সাপের খোলস কী? না, তা নয়। সাপের শরীর কি এত চওড়া হয়? আর তার দুপাশ দিয়ে কি দুটো
হাত, আর তলা দিয়ে কি একজোড়া পা বেরোয়?
আসলে এটা একটা মানুষের খোলস। সেই মানুষটা এখন আর মানুষ নেই। সে এখন ওই গতটার মধ্যে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে। সে জাতে কেউটে, তার দাঁতে বিষ।
ওই যে তার শিস শুরু হল। ওই যে সূর্য ডুবল। ওই যে ইমলিবাবা ডাকছে–বালকিষণ…বালকিষণ…বালকিষণ…
সন্দেশ, ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৭৯
খেলোয়াড় তারিণীখুড়ো
ডিসেম্বরের ঊনত্রিশে, শীতটা পড়েছে বেশ জাঁকিয়ে। সন্ধেবেলা তারিণীখুড়ো এলেন গলায় আর মাথায় মাফলার জড়িয়ে। তোরা মাঠে যাচ্ছিস না খেলা দেখতে? তক্তপোষে বসেই প্রশ্ন করলেন খুড়ো, নাকি দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাবার তাল করছিস?
তার মানে? জিজ্ঞেস করলাম আমি।
ওই টেলিভিশন আর কী, বললেন খুড়ো। লোককে ঘরকুনো করার জন্যে অমন জিনিস আর দ্বিতীয় নেই। আমাদের সময়ে খেলা দেখতে হলে টিকিট কেটে মাঠে যেতে হত, আর তার মজাটাই ছিল আলাদা। শীতকালের মিঠে রোদে সবুজ রঙের খোলা বেঞ্চেতে বসে সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠে সাদা পোশাক পরা লোকগুলোর কাণ্ড দেখে দিব্যি সময় কেটে যেত। তার মধ্যে দুটো একটা বাউন্ডারি, ওভার বাউন্ডারি হলে তো কথাই নেই। মনে আছে দিলওয়ার হোসেনের খেলা জার্ডিনের এম সি সি টিমের এগেনস্টে। মাথায় পট্টি বল লেগে মাথা ফেটে গেছে তাই নিয়ে খেলছে দিলাওয়ার। স্টাইল-ফাইলের বালাই নেই, ব্যাট ধরেছে যেন কোলা ব্যাঙ ওত পেতেছে, কিন্তু কী খেলা খেললে লোকটা! চৌষট্টি না পঁয়ষট্টি রান্, কিন্তু প্রত্যেকটি রানের দাম লাখ টাকা।
সে তো হল, কিন্তু খেলা যদি না জমে? বলল সুনন্দ।
তাতে কী হল? চার পাশে লোক রয়েছে, তাদের সঙ্গে খোশ গল্প করো; লাঞ্চ টাইমে মুরগির কাটলেট আর হ্যাপি বয় আইসক্রিম। বিকেল যত বাড়ছে সূর্যি তত হেলছে পশ্চিমে, আর গাছের ছায়া লম্বা হয়ে মাঠটাকে ছেয়ে ফেলছে, উত্তরে হাইকোর্ট। ব্যাটে বলে খুটখুটের ফাঁকে ফাঁকে গঙ্গা থেকে স্টীমারের ভোঁ…আর কত বলব? সাহেবরা বলে গেছে ইডেনের মতো ক্রিকেটের মাঠ দুনিয়ায় দুটি নেই।
আপনার যে ক্রিকেটে এত শখ সে তো অ্যাদ্দিন বলেননি, বলল ন্যাপলা।
বলিস কী! আমার হিরো ছিল রণজি। জামসাহেব অফ নওয়ানগর মহারাজা রণজিৎ সিংজী। নওয়ানগরের রাজা, ক্রিকেটেরও রাজা। সাহেবদের চোখ টেরিয়ে যেত কালা আদমির খেলা দেখে। যে সব ভারতীয় বিদেশে গিয়ে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে তার মধ্যে রণজিই বোধহয় প্রথম।… তবে, শুধু ক্রিকেট কেন? এই পঁয়ষট্টি বছরের জীবনে কোনও খেলাই বাদ দেয়নি এ শমা–ডাংগুলি হাডুডু থেকে শুরু করে ব্রিজ-পোকার-দাবা-বিলিয়ার্ড পর্যন্ত। ইস্কুল কলেজে হকি ক্রিকেট ফুটবল রেগুলার খেলতুম। ত্রিশ বছর বয়সে একবার এক সাহেব টিমের এগেনস্টে ক্রিকেট খেলতে হয়েছিল।
এম সি সি? ন্যাপলা জিজ্ঞেস করল।
ঠিকই বলেছিস বললেন তারিণী খুড়ো, তবে এম সি সির বিরুদ্ধে নয়, এম সি সি-র পক্ষে। মেরিলিবোন নয়, মার্তণ্ডপুর ক্রিকেট ক্লাব, আর বিপক্ষদলের সাহেবরা প্লান্টার্স ক্লাব।
কত রান করেছিলেন আপনি?
সে বললে তো পুরো গল্পটাই বলতে হয়।
তাই বলুন না বলল ন্যাপলা। ভূতের গল্প তো অনেক হল; আজ খেলার গল্পই হোক।
ভূত যে এ গল্পে একেবারেই নেই সেটা অবিশ্যি বললে ভুল হবে।
