আরেব্বাস! চোখ গোল গোল করে বলল ন্যাপলা, ভূত আর ক্রিকেট–দারুণ কম্বিনেশন!
চিনি-দুধ ছাড়া চায়ে একটা সশব্দ চুমুক দিয়ে গলার মাফলারটা আরেকটু ভাল করে পেঁচিয়ে নিয়ে তারিণীখুড়ো আরম্ভ করলেন তাঁর গল্প।
.
উত্তর প্রদেশের উত্তরে হিমালয়ের গায়ে সাড়ে তিন হাজার ফুট এলিভেশনে হল মার্তণ্ডপুর শহর। নেটিভ স্টেট, রাজার বয়স বাহান্ন, নাম বীরেন্দ্রপ্রতাপ সিং। এই রাজার সেক্রেটারির চাকরি আমি পেলুম ভগবানগড়ের রাজার রেকমেন্ডেশনে। রাজাদের সম্বন্ধে যে যাই বলুক না কেন, আমি তাদের কাছ থেকে যে ব্যবহার পেয়েছি তাতে আমি অন্তত তাদের বদনাম করতে পারব না। হতে পারে যে আমার কপাল ছিল ভাল, তেমন বিচ্ছু রাজার সংস্পর্শে আমি আসিনি। সে যাই হোক, মার্তণ্ডপুরের রাজা আমাকে যে ভাবে খাতির করলেন তাতে খুশি না হয়ে উপায় নেই। সেক্রেটারির যাবতীয় কাজ ছাড়াও একটা জরুরি কাজ আমার ছিল সেটা হল এই বীরেন্দ্রপ্রতাপ তাঁর বাপ রাজেন্দ্রপ্রতাপের জীবনী লিখবেন, সেই কাজে তাঁকে সাহায্য করা। রাজেন্দ্রপ্রতাপ ছাত্র-জীবন থেকেই ডায়রি লিখতেন। সেই সব ডায়রি পড়ে তাঁর জীবনের নানান তথ্য বার করে একটা খাতায় নোট করে রাখতে হবে আমাকে। ঘটনাবহুল জীবন, তাই কাজটা করতে ভালই লাগছিল। এই ডায়রি থেকেই আমি জানতে পারি যে রাজেন্দ্রপ্রতাপের জীবনে ক্রিকেট একটা খুব বড় স্থান অধিকার করেছিল। রাজবাড়ির বিশাল কম্পাউন্ডে একটা ক্রিকেট মাঠ রয়েছে সেটা এসেই দেখেছিলাম। কম্পাউন্ডের অধিকাংশটাই পাহাড় চেঁছে সমতল করে ফেলা হয়েছে। তাতে ফুলের বাগান, ফলের বাগান, তিরতির করে বয়ে যাওয়া সরু নদী, চিড়িয়াখানা, মন্দির, সবই রয়েছে। আর আছে ক্লাব বিল্ডিং সমেত ক্রিকেট গ্রাউন্ড। রাজাকে জিজ্ঞেস করাতে উনি বলেছিলেন সে মাঠে খেলা হয়। শরৎকালে। বড় খেলা একটাই হয়, সেটা হল মার্তণ্ডপুর ক্রিকেট ক্লাব ভারসাস প্লান্টার্স ক্লাব। সে খেলা দেখতে নাকি সমতলভূমি থেকেও লোক উঠে আসে। আমি যখন গেছি–নাইনটিন ফটি নাইনে–তখনও অনেক সাহেব প্লান্টার থাকে ওই অঞ্চলে। তারা সব স্থানীয় চা বাগানের মালিক। তার মধ্যে নাকি জনাচারেক ডাকসাইটে প্লেয়ার আছে যারা তরুণ বয়সে দেশে থাকতে কাউন্টি ক্রিকেট খেলেছে, তারপর ভারতবর্ষে চলে এসেছে ব্যবসা করতে। রাজার টিম নাকি রাজেন্দ্রপ্রতাপের আমলে খুবই ভাল ছিল, কিন্তু এখন আর তেমন নেই। তাই গত দশ বছরে একবারও মার্তণ্ডপুর জিততে পারেনি। চারদিন ধরে খেলা চলে, মার্তণ্ডপুরের পক্ষে রান ওঠে না বলে প্রতিবারই নাকি ইনিংস ডিফিট হয়, তাই সাহেবদের এক ইনিংসের বেশি ব্যাটই করতে হয় না।
আমি আসার হপ্তা তিনেকের মধ্যেই রাজা একদিন আমাকে এই বাৎসরিক ম্যাচের কথা বলে বললেন, তোমার তো বেশ জোয়ান ছিমছাম সুপুরুষ চেহারা, খেলাধুলোর শখ আছে নাকি?
আমি বললাম, আউটডোর গেমস এককালে খেলেছি; আজকাল তাস, দাবা, বিলিয়ার্ড, এই সব খেলি সুযোগ পেলে।
তারপরেই রাজা এম সি সি আর প্লান্টার্স ক্লাবের কথাটা বললেন। এখানে ভাল ক্রিকেটারের খুব অভাব, বললেন রাজা। এককালে এমন ছিল না। আমি নিজে অবশ্য কোনওদিন ক্রিকেট খেলিনি, বাবাই খেলতেন, কিন্তু তখন আমাদের দলকে সাহেবরা রীতিমতো ভয় পেত। এখন ব্যাপারটা উলটে গেছে। অথচ এমনই ট্র্যাডিশনের জোর যে বাৎসরিক ম্যাচটা না খেললেই নয়। আর তো একমাস আছে; এবার তুমিও লেগে পড়ো।
আমি বাধ্য হয়ে বললাম যে আমার প্র্যাকটিস নেই; কিন্তু রাজা কথাটা কানেই নিলেন না। বললেন, এই একমাসে প্র্যাকটিসের ঢের সুযোগ পাবে। তোমাকে গান অ্যান্ড মুর কোম্পানির একটা ভাল বিলিতি ব্যাট দিচ্ছি, বাবা এনেছিলেন বিলেত থেকে, তাঁর এক বন্ধুর কাছ থেকে পাওয়া। কাজের ফাঁকে ফাঁকে একটু হাত চালিয়ে নাও। তোমার কি বোলিং আসে নাকি?
বাধ্য হয়ে বললুম যে ওদিকে আমার কোনওদিনও ঝোঁক ছিল না। ফাইভ ডাউন, সিক্স ডাউন। নামতুম আর ব্যাটিং-ই করতুম। তবে ইয়াং বয়সের সে ফর্ম ফিরে পাবার আশা বৃথা। সেটাও জানিয়ে দিলুম। রাজা অবিশ্যি এ কথাতেও কান দিলেন না। বললেন, আমার সঙ্গে এসো, তোমাকে ব্যাটটা দিয়ে দিই।
প্রাসাদের দক্ষিণভাগে একটা বিশেষ ঘরে গেলুম রাজার সঙ্গে। এই ঘরটা হল যাকে বলে ট্রোফি রুম। বীরেন্দ্রপ্রতাপ ভাল শিকারি, তাঁর মারা বাঘ ভাল্লুক বাইসন হরিণের স্টাফ করা দেহ আর মাথা রয়েছে এই ঘরে। এ ছাড়া রয়েছে এক আলমারি বোঝাই কাপ আর মেডেল, তার মধ্যে বেশির ভাগই রাজেন্দ্রপ্রতাপের পাওয়া, আর বাকি পেয়েছেন বর্তমান রাজা তাঁর স্কোয়াশ খেলায় কৃতিত্বের জন্য।
এরই পাশে একটা আলমারিতে রয়েছে কিছু টেনিস র্যাকেট, স্কোয়াশ র্যাকেট, মাছ ধরার ছিপ, আর বিভিন্ন খেলার সময় পরার জন্য রকমারি ক্যাপ। কিন্তু ক্রিকেট ব্যাট তো কোথাও দেখছি না। রাজাকে জিজ্ঞেস করাতে বললেন, ওটা ছিল রাজার খুব সাধের সম্পত্তি, তাই যেমন-তেমন ভাবে রাখা নেই।
এই বলে একটা আলমারির তলার দিকের দেরাজ খুলে তার থেকে টেনে বার করলেন খবরের কাগজে মোড়া ব্যাটটা। সেটা দিয়ে অনেক খেলা হলেও এখনও বেশ ব্যবহার্য অবস্থায় রয়েছে।
হাতে নিয়ে দেখো।
নিলুম, আর নিতেই কেমন যেন ম্যাজিকের মতো বয়সটা দশ বছর কমে গেল। মনে পড়ল যত খেলা আমি খেলেছি তার মধ্যে নিঃসন্দেহে আমার সবচেয়ে প্রিয় ছিল ক্রিকেট। বার চারেক হাঁকড়াবার ভঙ্গিতে হাত চালিয়ে ফস করে বলে দিলুম আমি রাজার দলের হয়ে সাহেবদের বিরুদ্ধে খেলতে রাজি আছি। রাজা হ্যান্ডশেকের জন্য তাঁর ডান হাতটা বাড়িয়ে দিলেন আমার দিকে।
