কি সাপ-হয়ে-যাওয়া মানুষ?
ধূর্জটিবাবুর সর্বাঙ্গে চাকা চাকা দাগগুলো কী?
জিভের দাগটা কী?
সেটা কি দুভাগে ভাগ হয়ে যাবার আগের অবস্থা?
তাঁর শরীর এত ঠাণ্ডা কেন?
তিনি খাটে না শুয়ে খাটের তলায় ঢুকলেন কেন?
হঠাৎ বিদ্যুতের ঝলকের মতো একটা জিনিস মনে পড়ে গেল। খগম! ধূর্জটিবাবু জিজ্ঞেস করছিলেন খগমের কথা। নামটা চেনা চেনা লাগছিল, কিন্তু বুঝতে পারিনি। এখন মনে পড়ে গেছে। ছেলেবেলায় পড়া মহাভারতের একটা গল্প। খগম নামে এক তপস্বী ছিলেন। তাঁর শাপে তাঁর বন্ধু সহস্রপাদ মুনি ঢোঁড়া সাপ হয়ে যান। খগম—সাপ–শাপ…সব মিলে যাচ্ছে। তবে তিনি হয়ে ছিলেন ঢোঁড়া, আর ইনি কী–?
আমার দরজায় আবার কে যেন ধাক্কা দিচ্ছে। উপরদিকে নয়, তলার দিকে। চৌকাঠের ঠিক উপরে। একবার, দুবার, তিনবার। আমি বিছানা থেকে নড়লাম না। দরজা আমি খুলব না। আর না!
আওয়াজ বন্ধ হল, আমি দমবন্ধ করে কান পেতে আছি। এবার কানে এল শিসের শব্দ। দরজার কাছ থেকে ক্রমে সেটা দূরে সরে গেল। এবার আমার নিজের হৃৎস্পন্দন ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই।
ওটা কী? একটা চি চি শব্দ। একটা তীক্ষ্ণ মিহি আর্তনাদ। ইঁদুর নাকি? এখানে ইঁদুর আছে। প্রথম রাত্রেই দেখেছি আমার ঘরে। পরদিন লছমনকে বলাতে সে রান্নাঘর থেকে একটা ইঁদুর ধরা কলে জ্যান্ত ইঁদুর দেখিয়ে নিয়ে গেল। বলল চুহা তো আছেই, ছুছুন্দরও আছে।
আর্তনাদ ক্রমে মিলিয়ে এসে আবার নিস্তব্ধতা। দশ মিনিট গেল। ঘড়ি দেখলাম। পৌনে একটা। ঘুম যে কোথায় উধাও হয়েছে জানি না। জানলা দিয়ে বাইরের গাছপালা দেখা যাচ্ছে। চাঁদ বোধহয় ঠিক মাথার উপরে।
একটা দরজা খোলার শব্দ। পাশের ঘরে ধূর্জটিবাবু বারান্দায় যাবার দরজাটা খুলেছেন। আমার ঘরের যেদিকে জানলা বারান্দায় যাবার দরজাও সেইদিকে। ধূর্জটিবাবুর ঘরেও তাই। বারান্দা থেকে নেমে বিশ হাত গেলেই গাছপালা শুরু হয়।
ধূর্জটিবাবু বারান্দায় বেরিয়েছেন। কোথায় যাচ্ছেন তিনি? কী মতলব তাঁর? আমি একদৃষ্টে জানলার দিকে চেয়ে রইলাম।
শিসের শব্দ পাচ্ছি। সেটা ক্রমশ বাড়ছে। এবার সেটা ঠিক আমার জানলার বাইরে। জানলাটা ভাগ্যিস জালে ঢাকা, নইলে…
একটা কী যেন জিনিস জানলার তলার দিক থেকে ওপরে উঠছে। খানিকটা উঠে থেমে গেল। একটা মাথা। লণ্ঠনের আবছা আলোয় দুটো জ্বলজ্বলে কটা চোখ। নিষ্পলক দৃষ্টিতে চোখ দুটো আমার দিকে চেয়ে আছে।
প্রায় মিনিটখানেক এইভাবে থাকার পর একটা কুকুরের ডাক শোনামাত্র মাথাটা বাঁ দিকে ঘুরে পরক্ষণেই আবার নীচের দিকে নেমে অদৃশ্য হয়ে গেল।
কুকুরটা ডাকছে। পরিত্রাহি চিৎকার। এবার একটা ঘুম-জড়ানো সাহেবি গলায় ধমকের আওয়াজ পেলাম। একটা কাতর গোঙানির সঙ্গে কুকুরের ডাকটা থেমে গেল। তারপর আর কোনও শব্দ নেই। আমি মিনিট দশেক ইন্দ্রিয়গুলোকে সজাগ রেখে শুয়ে রইলাম। কানের মধ্যে আজই রাত্রে শোনা একটা ছড়া বারবার ফিরে ফিরে আসছে–
সাপের ভাষা সাপের শিস
ফিস্ ফিস্ ফিস্ ফিস!
বালকিষণের বিষম বিষ
ফিস্ ফিস্ ফিস্ ফিস!
ক্রমে সেই ছড়াটাও মিলিয়ে এল। বুঝতে পারলাম একটা ঝিমঝিমে অবসন্ন ভাব আমাকে ঘুমের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
ঘুমটা ভাঙল সাহেবদের চেঁচামেচিতে। ঘড়িতে দেখি ছটা বাজতে দশ। কিছু একটা গণ্ডগোল বেধেছে। তাড়াতাড়ি উঠে গায়ে একটা গরম কাপড় চাপিয়ে বাইরে এসে শ্বেতাঙ্গ আগন্তুকদের সাক্ষাৎ পেলাম। দুই যুবক, আমেরিকান–ডাকনাম ব্রুস আর মাইকেল–তাদের পোষা কুকুরটা কাল রাত্রে মারা গেছে। কুকুরটাকে নিজেদের ঘরেই নিয়ে শুয়েছিল, তবে ঘরের দরজা বন্ধ করেনি। ওরা সন্দেহ করছে রাত্রে বিছে বা সাপ জাতীয় বিষাক্ত কিছু এসে কামড়ানোর ফলে এই দশা। মাইকেলের ধারণা কাঁকড়াবিছে, কারণ শীতকালে সাপ বেরোয় না সেটা সকলেই জানে।
আমি আর কুকুরের উপর সময় নষ্ট না করে বারান্দার উলটো দিকে ধূর্জটিবাবুর ঘরের সামনে গিয়ে হাজির হলাম। দরজা খোলা রয়েছে, ঘরের মালিক ঘরে নেই। লছমন রোজ ভোর সাড়ে পাঁচটায় উঠে উনুন ধরিয়ে চায়ের জল গরম করে। তাকে জিজ্ঞেস করতে সে বলল ধূর্জটিবাবুকে দেখেনি।
নানারকম আশঙ্কা মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। যে করে তোক ভদ্রলোককে খুঁজে বার করতেই হবে। পায়ে হেঁটে আর কতদূর যাবেন তিনি! কিন্তু চারপাশের জঙ্গলে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাঁর কোনও খোঁজ পাওয়া গেল না।
সাড়ে দশটায় জিপ এল। আমি ড্রাইভারকে বললাম পোস্ট অফিস যাব–জয়পুরে টেলিগ্রাম করতে হবে। ধূর্জটিবাবুর রহস্য সমাধান না করে ভরতপুর ছাড়া যাবে না।
মেজদাকে টেলিগ্রাম করে, ট্রেনের টিকিট একদিন পিছিয়ে, রেস্ট হাউসে ফিরে এসে শুনলাম তখনও পর্যন্ত ধূর্জটিবাবুর কোনও খবর পাওয়া যায়নি। আমেরিকান দুটি তাদের মরা কুকুরটাকে কবর দিয়ে এর মধ্যেই তল্পিতল্পা গুটিয়ে উধাও।
সারা দুপুর রেস্ট হাউসের আশেপাশে ঘোরাফেরা করলাম। জিপটা আমার আদেশ মতোই আবার বিকেলে এসে হাজির হল। একটা মতলব ছিল মাথায়; মন বলছিল সেটায় হয়তো ফল হবে। ড্রাইভারকে বললাম, ইমলিবাবার কাছে চলো।
কাল যেমন সময় এসেছিলাম, আজও প্রায় সেই একই সময়ে গিয়ে পৌঁছলাম বাবার কুটিরে। বাবা কালকের মতো ধুনি জ্বালিয়ে বসে আছেন। শিষ্য আজ আরও দুটি বেড়েছে, তার মধ্যে একজন মাঝবয়সি, অন্যটি ছোঁকরা।
