কী করে জগাইবাবা?
সেটা হবে তোর নিজের বুদ্ধি আর সাহসের জোরে। কাজটা সহজ নয়। বুঝলি?
বুঝলাম, কিন্তু—
কিন্তু কী?
হলদে ফলের গুণ কী সেটা তো বললেন না।
এখন মনে পড়েনি। পড়লে বলব। আগে তোর বাপকে বাঁচাবার ব্যবস্থা কর। তার প্রায় শেষ অবস্থা। তবে পাতার রস খেলেই সে চাঙ্গা হয়ে উঠবে। আসি।
ঝিনুকের মধ্যে আবার সমুদ্রের গর্জন।
কানাই সব ঘটনা বলল কিশোর আর গোপালকে। কাল এক প্রহর, সব শেষে বলল কানাই। কালই এসপার, নয় ওসপার।
.
০৫.
জগাইবাবার নির্দেশমতো কানাই সকাল থেকেই অদৃশ্য হয়ে বাগানে হাজির হল। তারপর বাগানের ঈশান কোণে গিয়ে যা দেখল তাতে তার চক্ষুস্থির। একটা ছোট্ট দ্বীপে চাঁদনি গাছটা পোঁতা রয়েছে ঠিকই, কিন্তু এই এক-মানুষ উঁচু গাছটার গোড়ায় পেঁচিয়ে আছে একটা শঙ্খচূড় সাপ, যার এক ছোবলেই একটা মানুষ পায় অক্কা। আর দ্বীপটাকে ঘিরে আছে একটা পাঁচ হাত চওড়া পরিখা, তাতে কিলবিল করছে পাঁচ-সাতটা কুমির। কানাই যখন পৌঁছল তখন সেই কুমিরগুলোর দিকে কোলা ব্যাঙ ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিচ্ছে একটা লোক আর সেগুলো কপ কপ করে গিলে খাচ্ছে কুমিরগুলো। একটা ব্যাঙ সাপটার দিকেও ছুঁড়ে দেওয়া হল, আর সেটা তক্ষুনি সে মুখে পুরে গিলতে আরম্ভ করল।
খাওয়া শেষ হলে কানাই দুগ্না বলে কাজে লেগে গেল। আজই শেষ দিন, আজ তাকে যে করে হোক চাঁদনির পাতা জোগাড় করতেই হবে।
বাগানের একপাশে পাঁচিলের ধারে কিছু বাঁশ পড়ে আছে। অদৃশ্য কানাই তার থেকে দুটো বাঁশ নিয়ে সেগুলোকে পরিখার পাঁচিলে এমনভাবে শুইয়ে রাখল যে, বাঁশের অন্য দিক দ্বীপের উপর গিয়ে পড়ে। ফলে বেশ একটা সেতু তৈরি হয়ে গেল কুমির বাঁচিয়ে দ্বীপে যাবার জন্য।
কিন্তু সাপের কী হবে?
তার জন্য চাই অস্ত্র।
কানাই বাগানের ফটকে গিয়ে দেখল সেখানে হাতে ঢাল-তলোয়ার নিয়ে একটা সেপাই দাঁড়িয়ে আছে। অদৃশ্য কানাই তার হাত থেকে একটানে তলোয়ারটা বার করে নিল। তারপর সেপাইকে হতভম্ব করে দিয়ে শুন্য দিয়ে সে তলোয়ার নিয়ে বাঁশের সেতুর উপর দিয়ে দ্বীপে পৌঁছে এক কোপে শঙ্খচূড়ের মাথা শরীর থেকে আলগা করে দিল। তারপর তলোয়ারটাকে পরিখার জলে ফেলে অদৃশ্য কানাই এক হ্যাঁচকায় শেকড়সুদ্ধ চাঁদনি গাছটাকে তুলে সেতু পেরিয়ে এসে ঝড়ের বেগে চলে এল গোপালের বাড়ি। তারপর টা বলে সে নিজের চেহারায় ফিরে এল।
গোপাল কানাইয়ের হাতে গাছ দেখে চেঁচিয়ে উঠল, চলো যাই ঘরে ঘরে পাতা বিলিয়ে আসি।
তাই যাও, বলল কানাই। তবে একটা পাতা আমি নিচ্ছি। আমি আবার ফিরে আসব বিকেল পড়তে না পড়তেই। আজই শেষ দিন; আজ আমার বাবাকে বাঁচাবার শেষ সুযোগ।
তীরের বেগে দেখতে দেখতে নন্দীগ্রামে তার বাড়িতে পৌঁছে গেল কানাই। বাবা বিছানায় পড়ে আছে, তার শরীরের প্রত্যেকটি হাড় গোনা যায়।
কানাই এলি? ক্ষীণ স্বরে জিজ্ঞেস করল বলরাম কৃষক।
কানাই তখন পাতার রস বার করতে শুরু করছে। বেগুনি পাতার বেগুনি রস।
এই নাও বাবা, খেয়ে নাও।
কোনওমতে ঘাড় উঁচু করে রস খেয়ে আঃ বলে একটা আরামের নিশ্বাস ফেলে আবার বালিশে মাথা দিল বলরাম। আর তার পরমুহূর্তেই তার ঠোঁটের কোণে হাসি দেখা দিল। অনেক আরাম বোধ করছি রে কানাই! তুই আমাকে বাঁচালি এ-যাত্রা।
কানাই বাবাকে বলল তার একবার রূপসা যেতে হবে, সেখানকার খবর নেওয়া দরকার। কাজ সেরেই সে আবার ফিরে আসবে।
তা যা, বলল বলরাম, তবে যাবার আগে কিছু ফল আর এক বাটি দুধ রেখে যাস খাটের পাশে। মনে হচ্ছে খিদে পাবে।
কানাই বাবার ফরমাশ পালন করে রূপসা গিয়ে হাজির হল।
শহরের চেহারাই বদলে গেছে। তাঁতিপাড়ায় ঘরে ঘরে হাসিমুখ দেখতে দেখতে কানাই পৌঁছল গোপালের বাড়ি। কিশোরও রয়েছে সেখানে, কিন্তু তার মুখ গম্ভীর।
কী ভাবছ কিশোর? জিজ্ঞেস করল কানাই।
ভাবছি বাবার কথা, বলল কিশোর। বাবারও ব্যারাম হয়েছে।
অ্যাঁ, সে কী? কী করে জানলে?
ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে গেল। বলল রাজার অসুখ; রাজা আমাকে দেখতে চায়। আমি যেখানেই থাকি যেন গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করি।
ব্যারাম মানে কী ব্যারাম? জিজ্ঞেস করল কানাই।
শুখ্নাই। তাঁতির যা অসুখ; তোমার বাপের যা অসুখ, বাবারও সেই অসুখ। আর তার একমাত্র ওষুধ এখন আমাদের কাছে।
তা বেশ তো, বলল কানাই, সে ওষুধ তাকে দাও, কিন্তু একটা শর্তে।
কী শর্ত?
তিনি যেন রোগ সারলেই রাজকার্য ছেড়ে তীর্থে যান। আর তাঁর জায়গায় তুমি বসো সিংহাসনে।
আমিও তাই ভাবছিলাম, বলল কিশোর। একটা কথা বলব? হঠাৎ বলে উঠল গোপাল তাঁতি।
কী কথা ভাই? জিজ্ঞেস করল কিশোর।
তুমি রাজা হলে আমায় একটা নতুন তাঁত দেবে? যেটা আছে সেটা আমার ঠাকুরদাদার। তাতে ভাল বোনা যায় না।
নিশ্চয়ই দেব, বলল কিশোর। তুমি হবে তাঁতির সেরা তাঁতি। তোমার বোনা কাপড় পরে আমি সিংহাসনে বসব। তারপর কানাইয়ের দিকে ফিরে বলল, চলো যাই বাবার কাছে।
কানাইয়ের পিঠে চড়ে এক মুহূর্তে প্রাসাদের অন্দরমহলে পৌঁছে গেল কিশোর। রাজবাড়িতে শোকের ছায়া পড়েছে। রাজার অসুখের একমাত্র ওষুধ চাঁদনি পাতা ভেলকির বশে রাজার উদ্যান থেকে উধাও হয়ে গেছে। আর বিশ দিন মাত্র আয়ু তাঁর।
রাজার শোয়ার ঘরের বাইরে প্রহরী কিশোর আর কানাইকে দেখে চমকে উঠল, কিন্তু তাদের কোনও বাধা দিল না। কিশোর আর কানাই সোজা গিয়ে ঢুকল রাজার ঘরে।
