রাজা শয্যা নিয়েছেন, পাশে রাজ কবিরাজ মাথায় হাত দিয়ে বসে রাজার প্রশ্নের উত্তরে বলছেন। আর কোনও জায়গায় চাঁদনি গাছ নেই, আর এ-রোগের আর কোনও চিকিৎসাও নেই।
ঠিক সেই সময় গিয়ে উপস্থিত হল কিশোর আর কানাই।
তুই এলি! ছেলেকে দেখে কাতর কণ্ঠে বলে উঠলেন রাজা। তবে তোর সঙ্গে এ কেন? এ যে পিশাচসিদ্ধ জাদুকর।
না বাবা, বলল কিশোর। এ হল রূপসার ভবিষ্যৎ মন্ত্রী।
অ্যাঁ!
হ্যাঁ বাবা। আমি সঙ্গে করে তোমার ওষুধ এনেছি। এই ওষুধ তোমাকে দেব, যদি কথা দাও যে অসুখ সারলেই তীর্থে চলে যাবে চিরকালের মতো!
তা কেন দেব না কথা, বললেন রাজা, যত নষ্টের গোড়া ছিল ওই জাদুপান্না, যদিও রোগের হাত থেকে ওটাই আমাকে এতদিন রক্ষা করেছে। সেই পান্না যাবার পর থেকেই আমার দেহে আর মনে পরিবর্তন শুরু হয়েছে। আমি বুঝেছি কত ভুল করেছি। আমি যাব তীর্থে, আর তুই বসবি আমার জায়গায় সিংহাসনে। রূপসার গৌরব ফিরিয়ে আনবি। লোকে ধন্য ধন্য করবে।
রাজকুমার এবার তার হাতের মুঠো খুলে ধরল বাপের সামনে। সেই মুঠোয় চাঁদনির বেগুনি পাতা, তার সৌরভে রাজার শয়নকক্ষ ভরপুর হয়ে গেল।
রাজা সেরে উঠলেন একদিনেই।
তিনদিন পরে যুবরাজের অভিষেক হল। রাজা নিজে তার হাত ধরে সিংহাসনে বসিয়ে দিলেন ছেলেকে, তার পরনে গোপালের তৈরি পোশাক। তারপর কিশোর কানাইকে বসিয়ে দিল মন্ত্রীর আসনে। ইতিমধ্যে কানাই নন্দীগ্রামে গিয়ে তার বাবাকে নিয়ে এসেছে, কিশোর বলরামকে থাকবার ঘর দিয়েছে, তার খাওয়া-পরার ব্যবস্থা করে দিয়েছে।
চারদিকে শাঁখ বাজছে, রোশনচৌকিতে সানাই বাজছে, তারই মধ্যে মন্ত্রীর আসনে বসে কানাই শুনতে পেল জগাইবাবার ডাক।
কানাই! কানাই! কানাই!
কানাই রাজসভার মধ্যেই ট্যাঁক থেকে ঝিনুক বার করে কানে দিল। খ্যান খ্যান করে শোনা গেল জগাইবাবার কথা।
তোর তো আস্পর্ধা কম না–তোর বিদ্যেবুদ্ধি নেই, তুই রূপসার মন্ত্রীর আসনে বসেছিস?
কী করব জগাইবাবা, মনে মনে বলল কানাই, আমি কি আর নিজে থেকে বসেছি?–এরা আমায় বসিয়েছে।
তবে শোন বলি, এল জগাইবাবার কথা। অ্যাদ্দিনে মনে পড়েছে। সেই হলদে ফলটা আছে তো?
হ্যাঁ হ্যাঁ, আছে!
এইবার সেইটে খেয়ে নে। সেটা খেলে তোর বিদ্যেবুদ্ধি হাজার গুণ বেড়ে যাবে। মন্ত্রীগিরি কীভাবে করতে হয়, রাজাকে মন্ত্রণা কীভাবে দিতে হয়, দেশের মঙ্গল কীসে হয়, দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন কাকে বলে–সব জানতে পারবি। তখন আর তোকে বেমানান লাগবে না, কেউ বলবে না তুই বামন হয়ে চাঁদে হাত দিতে গেছিস। বুঝেছিস?
বুঝেছি জগাইবাবা, বুঝেছি।
তা হলে আসি।
ঝিনুকে আবার সমুদ্রের গর্জন।
কানাই ঝিনুকটা আবার ট্যাঁকে খুঁজে তার পাশ থেকে হলদে ফলটা বার করে মুখে পুরল।
সন্দেশ, ফান, চৈত্র ১৩৯২
কুটুম-কাটাম
কোথায় পেলি এটা?
আমাদের বাড়ির কাছেই ছিল, বলল দিলীপ। একটা জমি পড়ে আছে কাঠা তিনেক, তাতে কয়েকটা গাছ আর ঝোঁপঝাড়। একটা গাছের নীচে এটা পড়ে ছিল। অলোকের বাড়িতে সেদিন দেখছিলাম একটা গাছের গুঁড়িকে কেটে তার উপর গোল কাঁচ বসিয়ে টেবিল হিসেবে ব্যবহার করছে। দেখে আমারও শখ হয়েছিল। গুঁড়ির বদলে এইটে পেলাম।
ব্যাপারটা আর কিছুই না–একটা গাছের ডালের অংশ, সেটাকে একভাবে ধরলে একটা চতুষ্পদ জানোয়ারের মতো দেখতে লাগে। জিনিসটাকে চার পায়ে দাঁড় করানো যায়–যদিও একটা পা একটু বেঁটে বলে কাত হয়ে থাকে। পিঠটা ধনুকের মতো বাঁকা। একটা লম্বা গলাও আছে, আর তার শেষের অমসৃণ অংশটাকে একটা মুখ বলে কল্পনা করে নেওয়া যায়। এ ছাড়া আছে একটা এক ইঞ্চি লম্বা মোটা লেজ। সব মিলিয়ে জিনিসটাকে বেশ দেখবার মতো। দিলীপের যে চোখে পড়েছে সেটাই আশ্চর্য। অবিশ্যি আশ্চর্যই বা বলি কী করে–দিলীপ চিরকালই একটু আর্টিস্টিক মেজাজের। স্কুলে থাকতে বইয়ের পাতার ভিতর ফুলের পাপড়ি আর ফার্ণ গুঁজে রাখত। ওর সারা বাড়িতে ছোটখাটো শিল্পদ্রব্য ছড়ানো রয়েছে যাতে সুরুচির পরিচয় মেলে। ঢোকরা কামারদের কাজ দেখতে একবার বোলপুর থেকে ঘুসকরা চলে গিয়েছিল–সেখান থেকে আমাদের সকলের জন্যই একটা করে ঢেকরার কাজের নমুনা নিয়ে এসেছিল–প্যাঁচা, মাছ, গণেশ, পাত্র–যেগুলো ভারী চমৎকার।
আমি বললাম, এ ধরনের জিনিস কিন্তু তুই-ই প্রথম সংগ্রহ করছিস না। গাছের ডালের পুতুল তোর। আগে আরেকজন জমিয়ে গেছে।
অবনীন্দ্রনাথ তো? জানি। তিনি এগুলোকে বলতেন কুটুম কাটাম। এটাকে কী বলা যায় বল তো? কী জানোয়ার এটা? শেয়াল না শুয়োর না কুকুর?
নাম একটা ভেবে বার করা যাবে। আপাতত কোথায় রাখছিস জিনিসটাকে?
আমার শোয়ার ঘরের তাকে। কালই তো সবে পেয়েছি। তুই এসে গেলি বলে তোকে দেখালাম।
আমি আছি একটা বিজ্ঞাপনের আপিসে, আর দিলীপ কাজ করে একটা ব্যাঙ্কে। দিলীপ বিয়ে করেনি এখনও; আমার একটা সংসার আছে; একটি পাঁচ বছরের ছেলে আছে, তাকে সবে স্কুলে ভর্তি করেছি। দিলীপের বাড়িতে মাঝে মাঝে সন্ধ্যাবেলা আড্ডা হয়, আমাদের আরও দুই বন্ধু সীতাংশু আর রণেন আসে। ব্রিজ খেলা হয়। দিলীপ গাছের ডালটা পাওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই আড্ডায় সকলকে দেখাল। রণেন প্রচণ্ড বেরসিক, তার চোখে জানোয়ার ধরা পড়ল না, বলল, মিথ্যে আবর্জনা এনে বাড়ি বোঝাই করছিস কেন? এতে কতরকম জার্মস থাকতে পারে জানিস? তা ছাড়া পিঁপড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে জিনিসটার গায়ে।
