তারপর থেকে গোপালের বাড়িতে আর কেউ আসেনি।
আজ কানাই আর সবুর সইতে না পেরে কিশোরকে বলল, হ্যাঁ ভাই, সেই জাদুপান্না না সরাতে পারলে তো আর চলছে না। একবার একটু ভেবে বলল দেখি তোমার বাবা একা কখন থাকেন, তার কাছাকাছি যাবার সুযোগটা কখন পাওয়া যায়?
কিশোর বলল, জাদুপান্না নিলেই যে সব গোল মিটে যাবে তেমন ভেবো না। বরং উপকারের চেয়ে অপকার বেশি হতে পারে, বাবার রাগ সপ্তমে চড়ে যেতে পারে।
কানাই বলল, তাও চেষ্টা করতে ক্ষতি কী? তুমি একবার একটু ভেবে বলো।
কিছুক্ষণ চোখ বুজে ভেবে রাজকুমার বলল, একটা কথা মনে পড়েছে।
কী কথা?
বাবা রোজ ভোরে সূর্যোদয়ের সময় রাজবাড়ির অন্দরমহলের দিঘিতে স্নান করতে যান। সেই। সময় প্রহরী থাকে দূরে। বাবার কাছাকাছি কেউ থাকে না।
তবে আর কী! বলল কানাই, এই তো সুযোগ। কাল ভোরে আমি রাজবাড়ি যাব অদৃশ্য হয়ে। দেখি তোমার বাবার সঙ্গে দিঘিতে গিয়ে কিছু করা যায় কিনা।
পরদিন সূর্য ওঠার আগেই কানাই ফক্কা বলে অদৃশ্য হয়ে ঝড়ের বেগে ছুটে রাজবাড়ি পৌঁছে দিঘির শ্বেতপাথরে বাঁধানো ঘাটের কাছেই একটা বকুল গাছের নীচে দাঁড়িয়ে রইল। পুব আকাশে পদ্মের রঙ ধরেছে কিন্তু সূর্য তখনও ওঠেনি।
কিছু পরে সূর্য ওঠার সঙ্গে-সঙ্গেই কানাই খট খট শব্দ শুনে বুঝল রাজা খড়ম পায়ে ঘাটে আসছেন।
ওই যে রাজা! রাজার গা খালি। পরনে কেবল ধুতি আর কাঁধের উপর একটা রেশমের উত্তরীয়। উত্তরীয়টা ঘাটের পাশের বেদিতে রেখে রাজা খড়ম খুলে সিঁড়ির দিকে এগোলেন। গলার হারের পান্নাতে সূর্যের আলো পড়ে যেন তার থেকে আগুন বেরোচ্ছে।
এবার রাজা জলে নামলেন। কানাইও এগিয়ে গেল ঘাটের সিঁড়ির দিকে, তারপর ধীরে ধীরে সেও জলে নেমে রাজার সাত হাত দূরে গলা জলে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।
রাজা যেই ডুব দিলেন, অমনই কানাইও ত্ব দিয়ে সাঁতরে এগিয়ে এসে পলকের মধ্যে রাজার গলা থেকে হার খুলে নিয়ে আবার ডুব সাঁতার দিয়ে দিঘির উলটো পারে গিয়ে জল থেকে উঠল।
ততক্ষণে রাজা দিশেহারা হয়ে জলে তাঁর হার খুঁজছেন আর প্রহরী, প্রহরী বলে ডাকছেন।
প্রহরী ছুটে এল। কী হল মহারাজ?
এই সেই শয়তান রাঘব বোয়ালের কাজ। আমার গলা থেকে হার খুলে নিয়ে গেল। খবর দিয়ে দে। দরকার হলে দিঘির জল সেঁচতে হবে। আর আমার ফেরত চাই।
ইতিমধ্যে অদৃশ্য কানাই হাতের মুঠোয় হার নিয়ে রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে এক ছুটে মুহূর্তের মধ্যে চলে এল একেবারে গোপালের বাড়ি। তারপর টক্কা বলে আবার নিজের চেহারায় ফিরে এসে রাজকুমারকে দেখিয়ে দিল যে তার কাজ সে করে এসেছে।
কিন্তু এর ফলে রাজার মধ্যে কোনও পরিবর্তন এল কিনা সেটা কী করে বোঝা যাবে?
কানাইয়ের সে বুদ্ধিও মাথায় এসে গেছে। সে বলল, আমি কাল অদৃশ্য হয়ে রাজসভায় যাব। রাজার হাবভাব কীরকম সেটা দেখে আসব।
তাই ঠিক হল, আর কানাই পরদিন রাজসভায় গিয়ে হাজির হল।
সভাসদরা এসে গেছেন, কিন্তু রাজা তখনও আসেননি।
কানাই পিছনের দিকে এক কোনায় চুপটি করে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক দেখতে লাগল।
সময় চলে যায়, কিন্তু রাজার দেখা নেই।
প্রায় আধঘণ্টা অপেক্ষার পর রাজামশাই এসে ঢুকলেন রাজসভায়।
কিন্তু কই, রাজার চেহারায় ভালর দিকে পরিবর্তনের তো কোনও লক্ষণ নেই। চোখে তো সেই একই শয়তানের দৃষ্টি, কেবল ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসির বদলে আজ প্রচণ্ড রাগ।
রাজা সিংহাসনে বসে চারিদিকে একবার লাল চোখে দেখে নিয়ে বললেন, আমার রাজ্যে মহা শয়তান এক জাদুকরের আবির্ভাব হয়েছে। সে নিজে কয়েদখানা থেকে প্রহরীর চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়েছে, আমার ছেলেকে বন্দিদশা থেকে মুক্তি দিয়েছে, আমার গলা থেকে আমার সাধের পান্নার হার খুলে নিয়েছে। গতকাল ভোরে দিঘিতে ডুব দেবার সময় এই ঘটনা ঘটে। আমি ভেবেছিলাম এ বোয়াল মাছের কাণ্ড, কিন্তু দিঘির জল সেঁচে সেই বোয়াল মাছকে ধরেও সে হার পাওয়া যায়নি। আজ থেকে শাসন হবে আরও দশগুণ কড়া। যতদিন সেই জাদুকর আর রাজকুমারকে খুঁজে না পাওয়া যায়, ততদিন হাটবাজার সব বন্ধ। লোকে না খেয়ে মরে মরুক!
এই ভীষণ কয়েকটা কথা বলে রাজা সিংহাসন ছেড়ে চলে গেলেন। কানাই একেবারে মুষড়ে। পড়ল। জাদুপান্না খুলে নিয়ে ফল আরও খারাপ হল। এখন কী উপায়?
কানাই গোপালের বাড়ি ফিরে এল।
তার কাছে সব শুনে-টুনে কিশোর আর গোপালের মুখও শুকিয়ে গেল। একে দেশে মড়ক, তার উপর রাজার এই মূর্তি! সারা দেশ তো ছারখার হয়ে যাবে।
কানাই তখন মনে মনে ভাবছে–আর একদিন মাত্র সময়। এই একদিনের মধ্যে চাঁদনির পাতা জোগাড় না হলে সে বাবাকে হারাবে।
দূর থেকে ঢ্যাঁড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে। আর সেইসঙ্গে ঘোষণা। আজ থেকে বাজারে কেনাবেচা বন্ধ। সেইসঙ্গে এও ঘোষণা হচ্ছে যে, রাজকুমার আর জাদুকরকে যে ধরে দিতে পারবে তাকে এক সহস্র স্বর্ণমুদ্রা দেওয়া হবে। ঢ্যাঁড়ার দুম দুম্ শব্দ ক্রমে এদিকে এগিয়ে আসছে। তাঁতিপাড়াতেও ঘোষণা হবে।
এই ডামাডোলের মধ্যে কানাই হঠাৎ চমকে উঠল।
তার নাম ধরে কে ডাকে ক্ষীণ স্বরে?
সে তৎক্ষণাৎ ট্যাঁক থেকে ঝিনুক বার করে কানে দিল। পরিষ্কার শোনা গেল জগাইবাবার কথা।
শোন কানাই, মন দিয়ে কাজের কথা শোন। কাল সকালে এক প্রহরে তুই যাবি রাজবাড়ির অন্দরমহলের বাগানের ঈশান কোণে। সেই কোণে জলে ঘেরা একটা ছোট্ট দ্বীপে চাঁদনি গাছ পোঁতা আছে। সেই গাছ তোকে উদ্ধার করতে হবে।
