একটা ভারী কাঠের দরজা খোলার শব্দের সঙ্গে চা ছাতে এসে জর্জের পাশে দাঁড়াল। চাকের মুখে চুরুট–যে চুরুট লামাদের ভারী প্রিয় হয়ে উঠেছে। ধর্মযাজক হলেও এরা অল্পবিস্তর ফুর্তির স্বাদ গ্রহণ করতে বিমুখ নয়। এরা ছিটগ্রস্ত হতে পারে, কিন্তু গোঁড়া নয়।
চাক্ এসেছে একটা জরুরি বক্তব্য নিয়ে। যা শুনছি জর্জ, তাতে কিন্তু ব্যাপার গোলমেলে বলে মনে হচ্ছে।
কী শুনছ? যন্ত্র ঠিকমতো কাজ করছে না? জর্জের মতে এর চেয়ে বেশি গোলমেলের আর কিছু হতে পারে না। যন্ত্রের গণ্ডগোল হলে তাদের যাওয়া পিছিয়ে যেতে পারে, আর সেটাই হবে চরম বিপর্যয়। ইদানীং টেলিভিশনের রদ্দিমাকা বিজ্ঞাপনের ছবিগুলোর কথা ভেবেও জর্জের মন কেমন করে, কারণ সেগুলোও তো দেশের কথাই মনে করিয়ে দেয়!
না না, বলল চাক্, সে ধরনের গোলমাল নয়। চাক সাধারণত ছাতের পাঁচিলে বসে না, কারণ তাতে তার বুক ধড়ফড় করে, কিন্তু আজ ও সেখানেই বসে বলল, আমি আসল ব্যাপারটা জেনে ফেলেছি।
তার মানে? ব্যাপার তো সবই আমাদের জানা।
আমরা যেটা জানি সেটা হল লামারা কী করতে যাচ্ছে, কিন্তু কেন করতে যাচ্ছে, সেটা তো জানতাম না। এখন সেটা জেনেছি, এবং সে এক অভাবনীয় ব্যাপার!
তোমার ওসব বাজে কথা ছাড়া তো?
কিন্তু লামা যে আমায় নিজে বলেছেন! তুমি তো জানো, উনি রোজ এসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কম্পিউটার থেকে টাইপ করা কাগজের রোল বেরিয়ে আসা দেখেন। আজও এসেছিলেন এবং আজ কেন যেন অন্যদিনের তুলনায় ওঁকে বেশি উত্তেজিত বলে মনে হচ্ছিল। আমি যখন বললাম যে আমাদের কাজ প্রায় শেষ হতে চলেছে, উনি আমাকে তাঁর অদ্ভুত ইংরিজি উচ্চারণে জিজ্ঞেস করলেন, আমরা কোনওদিন এই কাজটার পিছনে আসল উদ্দেশ্যটা সম্বন্ধে কিছু অনুমান করেছি কিনা। আমি বললাম–সেরকম উদ্দেশ্য কিছু আছে নাকি? তখন ভদ্রলোক ব্যাপারটা বললেন।
কী বললেন?
এঁরা বিশ্বাস করেন যে, যখন ঈশ্বরের নামের তালিকা তৈরি হয়ে যাবে–এঁদের মতে নামের সংখ্যা হচ্ছে ন লক্ষ কোটি–তখন ঈশ্বরের কাজও ফুরিয়ে যাবে। সেইসঙ্গে মানুষের সৃষ্টি হয়েছিল যে কাজ করার জন্য, তাও শেষ হয়ে যাবে। শুধু তাই নয়–এর পরে মানুষের পক্ষে কিছু করতে যাওয়াটাই হবে ঈশ্বরবিরোধী কাজ।
তা হলে আমরা এখন করছিটা কী? আত্মহত্যা?
সেটার প্রয়োজন কোথায়? তালিকা শেষ হলে পর ঈশ্বর নিজেই যা করার করবেন। অর্থাৎ–খেল খতম!
বুঝলাম। আমাদের কাজ শেষ হওয়া মানে পৃথিবীর কাজও খতম!
চাক্ একটা শুকনো হাসি হেসে বলল, আমি ঠিক সেই কথাটাই বলেছিলাম লামাকে। কিন্তু তার ফল কী হল জানো? উনি আমার দিকে একটা অদ্ভুত দৃষ্টি দিয়ে বললেন–ব্যাপারটাকে অত হালকাভাবে নিও না।
জর্জ একটুক্ষণ চিন্তিতভাবে চুপ করে থেকে বলল, কিন্তু এ ব্যাপারে কী করা উচিত, সেটা তো বুঝতে পারছি না। অবিশ্যি সেভাবে দেখতে গেলে যাই করি না কেন তাতে কিছু এসে যায় না। এরা যে বদ্ধ পাগল, সে তো জানাই আছে।
কিন্তু একটা জিনিস ভেবে দেখো জর্জ-তালিকা শেষ হওয়ার পর যদি কিছু না ঘটে, পৃথিবী যেমন আছে তেমনই থেকে যায়, তা হলে দোষটা আমাদের ঘাড়ে পড়বে না তো? আমাদেরই যন্ত্র তো কাজটা করছে! ব্যাপারটা আমার কাছে মোটেই ভাল লাগছে না।
কথাটা খুব ভুল বলোনি, জর্জ গম্ভীরভাবে মন্তব্য করল। কিন্তু এ ধরনের ব্যাপার তো আগেও ঘটেছে। লুইসিয়্যানায় আমাদের ছেলেবেলায় এক ছিটগ্রস্ত পাদরি হঠাৎ একদিন বলে বসলেন–আসছে রবিবার পৃথিবীর শেষ দিন। বহু লোক তাঁর কথা বিশ্বাস করল। এমনকী, সেই বিশ্বাসে তাদের ঘরবাড়ি সব বিক্রি করে দিল। শেষটায় যখন কিছুই হল না, তখন কিন্তু তারা এই নিয়ে কোনওরকম মাতামাতি করল না। তারা ধরে নিল, পাদরির হিসেবে কোনও গণ্ডগোল হয়েছে। আসলে ঘটনাটা ঘটবে ঠিকই, কিন্তু পরে।
যাই হোক, এটা যে লুইসিয়্যানা নয়, সে খেয়াল আশা করি তোমার আছে। এখানে কেবল আমরা দুজন শ্বেতাঙ্গ, বাকি হল তিব্বতি সাধকদের বিরাট দল। এঁরা তোক ভালই এবং সত্যিই যদি। লামার ভবিষ্যদ্বাণী না ফলে, তা হলে আমার ওঁর জন্য একটু কষ্টই হবে। কিন্তু তাও বলছি, এ সময়টা এখানে না থেকে অন্য কোথাও থাকলে আমি নিশ্চিন্ত বোধ করতাম।
সে-কথাটা আমার কিছুদিন থেকে মনে হচ্ছে। কিন্তু আমরা যে চুক্তি সই করেছি। আর আমাদের ফেরত যাবার প্লেন না আসা পর্যন্ত তো আমরা কিছুই করতে পারছি না।
চাক্ চিন্তিতভাবে মাথা নেড়ে সায় দিল। তারপর প্রায় আপনমনেই বলল, অবিশ্যি আমরা ব্যাপারটা ভণ্ডুল করে দিতে পারি।
খেছে? ওতে আরও বিপদ।
আমি যেভাবে ভাবছি, তাতে বিপদ নেই। শোনো-। মেশিন চলবে আর চারদিন–দিনে চব্বিশ ঘণ্টা করে। আমাদের প্লেন আসবে এক হপ্তা পরে। বেশ। এখন ধরো যদি এর মধ্যে যন্ত্রে কোনও গণ্ডগোল হয়, দুদিন কাজ বন্ধ থাকে। গণ্ডগোল আমরা শুধরিয়ে দেব ঠিকই; কিন্তু সেটা করব একেবারে শেষ মুহূর্তে। আমরাও প্লেনে উঠব, আর ঈশ্বরের শেষ নামটিও উঠবে তালিকায়। তখন আমরা লামাদের আওতার বাইবে।
ব্যাপারটা আমার মনঃপূত হচ্ছে না, মাথা নেড়ে বলল জর্জ। এ ধরনের কারচুপি আমার ধাতে নেই ভায়া। তা ছাড়া এতে ওদের মনে সন্দেহের উদ্রেক হতে পারে। নাঃ, যেমন চলছে চলুক, তাতে যা হওয়ার হবে।
