.
সাতদিন পরে খচ্চরের পিঠে চড়ে প্যাঁচানো রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে জর্জ বলল, আমার এখনও ব্যাপারটা ভাল লাগছে না। এটা ভেবো না যে, আমি ভয় পেয়েছি বলে পালাচ্ছি। আমার এই বুড়ো লামাগুলোর জন্য মমতা হচ্ছে। তারা যখন দেখবে যে, তাদের ভবিষ্যদ্বাণী ফলল না, তখন। তাদের অবস্থা কী হয়, সেটা আমি দেখতে চাই না। আর আমাদের হেড লামার যে কী প্রতিক্রিয়া হবে, কে জানে।
চাক্ বলল, আশ্চর্য। –ওঁকে যখন গুডবাই করলাম, তখন কেন যেন মনে হল যে, উনি আমাদের মনের কথা সব জানেন, কিন্তু তাই নিয়ে কোনও উদ্বেগ বোধ করছেন না, কারণ মেশিন আবার ঠিকমতো চলছে, আর কাজও অল্পক্ষণের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। তারপর–অবিশ্যি ওঁর মতে তারপর বলে আর কিছু নেই।
জর্জ ঘোড়ার পিঠে উলটোমুখে ঘুরে পাহাড়ের দিকে চাইল। এর পরে মোড় ঘুরে আর গুফাটাকে দেখা যাবে না। সূর্যাস্ত হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। আকাশের শেষ রঙের সামনে বিরাটাকৃতি গুফাটাকে দেখা যাচ্ছে। কালো প্রাসাদের গায়ে এখন সেখানে জানলার ভিতরে আলো, যেমন দেখা যায় সমুদ্রগামী জাহাজের গায়ে পোর্টহোলের ভিতরে। ওগুলো সবই জেনারেটর চালিত বৈদ্যুতিক আলো, এবং একই জেনারেটরে চলছে কম্পিউটার। আর কতক্ষণ চলবে যন্ত্র? ভবিষ্যদ্বাণী না। ফললে লামারা কি তাদের আক্রোশ প্রকাশ করবে ওই যন্ত্রকে ধ্বংস করে? না কি তারা আবার নিরুদ্বেগে শুরু করবে তাদের হিসাব?
গুম্ফায় ঠিক এই মুহূর্তে কী হচ্ছে সেটা অবিশ্যি জর্জের জানতে বাকি নেই। লামাপ্রবর তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে যন্ত্রটার কাছে বসে আছেন। অপেক্ষাকৃত কমবয়স্করা তাঁদের সামনে এনে হাজির করছে যন্ত্র থেকে নতুন বেরিয়ে-আসা নামের তালিকা। লামারা নামগুলোর উপর চোখ বোলাচ্ছেন, তারপর সেগুলো কেটে কেটে খাতায় সেঁটে ফেলছেন। কারও মুখে কোনও কথা নেই, একমাত্র শব্দ হচ্ছে যান্ত্রিক টাইপরাইটারের, কারণ মার্ক-৫ কম্পিউটার প্রতি সেকেন্ডে হাজার হিসাবের কাজ করে সম্পূর্ণ নিঃশব্দে। জর্জ ও চাক্ তিন মাস ধরে এই কাজ দেখেছে। তাদের যে মাথা খারাপ হয়ে যায়নি, এটা পরম ভাগ্যি।
ওই দেখো, বলে উঠল চা সামনের উপত্যকার দিকে হাত বাড়িয়ে। আহা, কেমন সুন্দর দেখাচ্ছে বলো তো!
জর্জ মনে মনে ভাবল–সত্যিই সুন্দর। পুরনো ডি-সি-থ্রি বিমানটা রানওয়ের একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে একটি রুপালি ক্রুশের মতো। ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে ওদের দুজনকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে সভ্য জগতে, যেখানে তারা পাবে মুক্তি। উৎকৃষ্ট সুরাপানে যে আনন্দ হয়, চিন্তাটা মাথায় আসতে জর্জ সেই আনন্দ অনুভব করল।
হিমালয়ের হঠাৎ-রাত্রি এখনই তাদের গ্রাস করবে। তবে সৌভাগ্যক্রমে রাস্তা ভাল, আর দৃজনের কাছেই রয়েছে টর্চ। একমাত্র যদি না শীত হঠাৎ বেড়ে গিয়ে অস্বস্তির কোনও কারণ ঘটায়, এ ছাড়া কোনও চিন্তা নেই। মাথার উপরে মেঘমুক্ত আকাশে অগণিত অতি পরিচিত নক্ষত্র জ্বলজ্বল করছে। জর্জের একমাত্র দুশ্চিন্তা ছিল যে, প্রতিকূল আবহাওয়ার জন্য হয়তো প্লেন না উড়তে পারে; কিন্তু এখন সে দুশ্চিন্তাও দূর হয়েছে।
জর্জের গলা দিয়ে গান বেরিয়ে এল; তবে বেশিক্ষণের জন্য নয়। পর্বত পরিবেষ্টিত এই বিশাল প্রান্তরে গানটা যেন কিঞ্চিৎ বেমানান। সে রিস্টওয়াচের দিকে চাইল।
আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যে পৌঁছে যাওয়া উচিত, সে চেঁচিয়ে জানাল পিছনে চাক-এর উদ্দেশে। তারপর আরও কতগুলো কথা সে জুড়ে দিল। কম্পিউটারের কাজ শেষ হল কিনা কে জানে। এখনই তো হওয়ার কথা।
চাক-এর কাছ থেকে কোনও উত্তর না পেয়ে জর্জ উলটোমুখে ঘুরল। সে দেখল ঘোড়ার পিঠে চাককে–তার দৃষ্টি আকাশের দিকে।
ওপরে চেয়ে দেখো, বলল চাক্।
জর্জ চাইল –হয়তো শেষবারের মতো।
মাথার উপরে সন্ধ্যার আকাশ থেকে নির্বিবাদে একটি একটি করে তারা মুছে যাচ্ছে।
দি নাইন বিলিয়ন নেমস্ অফ গড
সন্দেশ, কার্তিক ১৩৯১
কনওয়েকাস্লের প্রেতাত্মা
তারিণীখুড়ো তাঁর এক্সপোর্ট কোয়ালিটি বিড়িতে দুটো টান দিয়ে বললেন, ভূতের গল্প অনেকে বলতে পারে, তবে পার্সোনাল এক্সপিরিয়েন্স থেকে বলা গল্পের জাতই আলাদা। সেটা আর কজন পারে বলো।
আপনি পারেন? প্রশ্ন করল ন্যাপলা।
হুঁঃ, বলে খুড়ো অন্য দিকে চাইলেন।
তারিণীখুড়োর এক্সপিরিয়েন্সের স্টক যে অফুরন্ত সেটা আমরা জানি। এই সেদিন অবধি সারা দেশময় টোটো করে বেড়িয়েছেন। ভারতবর্ষের তেত্রিশটা শহরে ছাপান্ন রকম কাজ করেছেন। উপার্জনের জন্য। তবে এক বছরের বেশি কোনও কাজে টিকে থাকেননি–সে ব্যবসাই তোক আর চাকরিই হোক। এখন চৌষট্টি বছর বয়সে চরকিবাজি থামিয়ে কলকাতায় এসে রয়েছেন বেনেটোলা লেনে একটা ফ্ল্যাট নিয়ে। এখানে বলে রাখি, তারিণীখুড়ো সকলেরই খুড়ো। বাবাও খুড়ো বলেন, আমিও বলি। ন্যাপলা একবার ওঁকে দাদু বলেছিল, তাতে খুড়ো মহা ক্ষেপে বললেন, এখনও বাস পেলে অক্লেশে হেঁটে আসি বেনেটোলা টু বালিগঞ্জ–দাদু আবার কী? খুড়ো বলবি।
আমি আর পাড়ার পাঁচটা ছেলে মিলে আমাদের দল। আমাদের বাড়িতেই আসেন তারিণীখুড়ো; এলেই খবর চলে যায়, আর পাঁচজন তুরন্ত চলে আসে খুড়োর গল্পের লোভে। একটা গল্পে পুরো একটা সন্ধে কেটে যায়। খুড়ো বলেন আর্টের খাতিরে খানিকটা রং চড়ানো ছাড়া গল্পগুলো ষোলো আনা সত্যি।
