এই কাজ আপনারা তিনশো বছর ধরে করছেন?
আজ্ঞে হ্যাঁ। আমরা অনুমান করি, কাজটা সম্পূর্ণ হতে লাগত আরও পনেরো হাজার বছর।
ডাঃ ওয়াগনার এখনও খেই পাচ্ছেন না। তিনি বললেন, বুঝলাম। এখন বুঝতে পারছি, কেন আপনারা কম্পিউটার ব্যবহার করার কথা ভাবছেন। কিন্তু এই কাজের আসল উদ্দেশ্যটা কী?
লামার মধ্যে যেন কিঞ্চিৎ ইতস্তত ভাব। ডাঃ ওয়াগনারের আশঙ্কা হল, তিনি বুঝি অজান্তে অপমানসূচক কিছু বলে ফেলেছেন। কিন্তু লামার উত্তরে কোনও বিরক্তি প্রকাশ পেল না।
এই কাজটা আমাদের আচারানুষ্ঠানের একটা অঙ্গ। আমরা এটাকে একটা কর্তব্য বলে মনে করি। যতরকম নামে মানুষ ঈশ্বরকে জানে–গড়, জেহোভা, আল্লা, ইত্যাদি–এগুলো সবই মানুষের দেওয়া নাম। এখানে অবিশ্যি কতগুলো দার্শনিক প্রশ্ন এসে পড়ছে যেগুলো আমি আলোচনা করতে চাই না, কিন্তু নটি অক্ষরে সীমাবদ্ধ রেখে যদি আমরা সেগুলিকে পারমিউটেশন কম্বিনেশনের সাহায্যে পাশাপাশি বসিয়ে চলি, তা হলে আমার বিশ্বাস, শেষ পর্যন্ত আমরা ঈশ্বরের সবকটি নামই লিখে ফেলতে পারব। সেই বিন্যাসের কাজটা আমরা এতদিন যন্ত্রের সাহায্য ছাড়াই করে আসছি।
বুঝেছি–আপনারা AAAAAAAA থেকে শুরু করে ZZZZZZZZZ পর্যন্ত যেতে চান।
ঠিক তাই। যদিও–যে কথাটা বললাম–এক্ষেত্রে অক্ষরগুলো আমরাই তৈরি করেছি। সংখ্যা থেকে অক্ষরে পরিবর্তন করার কাজটা আপনাদের পক্ষে কঠিন হওয়ার কথা নয়। তবে এমন সার্কিট করা দরকার, যাতে অক্ষরগুলো যুক্তিসম্মতভাবে পরপর সাজানো হয়। যেমন, কোনও শব্দে একই অক্ষর পরপর তিনবারের বেশি ব্যবহার করা চলবে না।
তিনবার? না দু বার?
তিনবার। কেন তিনবার সেটা বোঝাতে গেলে বৃথা সময় নষ্ট হবে।
ওঃ, বললেন ডাঃ ওয়াগনার। আর কিছু বলার আছে কি?
আমার বিশ্বাস, আপনাদের যন্ত্রটিকে আমাদের কাজের উপযুক্ত করে তৈরি করে দিতে বেশি সময় লাগবে না। তার পরেই সংখ্যার বদলে অক্ষর-বিন্যাসের কাজটা শুরু হয়ে যেতে পারবে। আমার ধারণা, যে কাজটা আমাদের লাগত পনেরো হাজার বছর, সেটা যন্ত্রের সাহায্যে হয়ে যাবে একশো দিনে।
ডাঃ ওয়াগনারের ঘরের খোলা জানলা দিয়ে নিউ ইয়র্ক শহরের ট্রাফিকের মৃদু গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, কিন্তু সে শব্দ তাঁর কানে প্রবেশই করছে না। তাঁর মন এখন সম্পূর্ণ অন্য জগতে বিচরণ করছে। যেখানে গগনচুম্বী পাহাড়গুলি প্রকৃতির সৃষ্টি, মানুষের নয়। সেই পাহাড়ের চুড়োয় গুম্ফায় বসে এই তিব্বতি সাধকেরা যুগের পর যুগ ধরে অসীম ধৈর্যের সঙ্গে তাদের অর্থহীন তালিকা তৈরি করে যাচ্ছে! মানুষের পাগলামির কি কোনও সীমা নেই? যাই হোক, তাঁর মনের ভাব বাইরে প্রকাশ করা চলবে না। কথাই তো আছেদ্য কাস্টমার ইজ নেভার রং।
ডাঃ ওয়াগনার বললেন, এটা নিঃসন্দেহে বলতে পারি যে, আমাদের মার্ক-৫ কম্পিউটারকে আপনাদের কাজের উপযুক্ত করে তৈরি করে দিতে পারি আমরা। আমি এখন যে কথাটা ভেবে চিন্তিত হচ্ছি, সেটা হল–আপনাদের গুম্ফাতে যন্ত্রটিকে বসানো, চালানো এবং তার পরিচর্যা নিয়ে। ওটাকে তিব্বতে নিয়ে যাওয়াটাও তো একটা দুরূহ কাজ।
সে ব্যবস্থা আমরা করব। আপনাদের কম্পিউটারের অংশগুলো তেমন কিছু বড় নয়–যে কারণে আপনাদের মডেলটা বাছাই করেছি। ওটাকে একবার ভারতবর্ষে পৌঁছে দিতে পারলে বাকি পথটুকুর ব্যবস্থা আমরাই করব।
আর আপনি বলছিলেন, আমাদের এখান থেকে দুজন লোক নেওয়ার কথা?
হ্যাঁ। তিন মাসের জন্য। তার বেশি সময় নিশ্চয়ই লাগবে না।
সে ব্যবস্থাও হয়ে যাবে, বিষয়টা প্যাডে নোট করে নিয়ে বললেন ডাঃ ওয়াগনার। অবিশ্যি আরও দুটো ব্যাপার–
কথা শেষ করার আগেই লামা তাঁর আলখাল্লার পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে ওয়াগনারের হাতে দিয়ে বললেন, এটা হল এশিয়াটিক ব্যাঙ্কে আমার কত টাকা জমা আছে তার সার্টিফিকেট।
ধন্যবাদ। হ্যাঁ–তা, এতে যথেষ্ট হবে বলেই মনে হয়। দ্বিতীয় ব্যাপারটা এতই মামুলি যে, সেটা উল্লেখ করতেও আমার সঙ্কোচ হচ্ছে–অথচ না করলেও নয়। আপনাদের ইলেকট্রিসিটির কী ব্যবস্থা?
১১০ ভোল্টে ৫০ কিলোওয়াট উৎপাদনকারী ডিজেল জেনারেটর। বছর পাঁচেক হল এটা বসানো হয়েছে এবং কাজ দিচ্ছে ভালই। এটা আসার পর থেকে গুম্ফার জীবনযাত্রা অনেক সহজ হয়ে গেছে। অবিশ্যি ওটা আনার মূল উদ্দেশ্য ছিল বড় বড় জপ-যন্ত্রগুলোকে চালানো।
তা তো বটেই, বললেন ডাঃ ওয়াগনার। এটা আমার অনুমান করা উচিত ছিল।
.
গুম্ফার ছাতের বেঁটে পাঁচিলের ধারে দাঁড়িয়ে বাইরে নীচের দিকে চাইলে প্রথমে মাথা ভোঁ ভোঁ করে ঠিকই, কিন্তু ক্রমে সবই অভ্যাস হয়ে যায়। এই তিন মাসেও দু হাজার ফুট নীচে খাদের দৃশ্য বা দূরে উপত্যকায় শস্যক্ষেত্রের নানারকম জ্যামিতিক নকশা জর্জ হ্যানলির মনকে নাড়া দিতে পারেনি। সে এখন ছাতের দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দূরের পর্বতশৃঙ্গগুলোর দিকে চেয়ে আছে। সেগুলোর নাম জানার কোনও ঔৎসুক্য সে বোধ করেনি। এমন বেয়াড়া অবস্থায় তাকে কোনও দিন পড়তে হয়েছে কি? নিশ্চয়ই না। গত তিন মাস ধরে মার্ক-৫ কম্পিউটারে উদ্ভট অক্ষরের সমষ্টি ছাপা রোলের পর রোল কাগজ বেরিয়ে আসছে। অক্ষরগুলির যতরকম সম্ভাব্য বিন্যাস হতে পারে, যান্ত্রিক টাইপরাইটারে তার প্রত্যেকটি ছেপে চলেছে অক্লান্তভাবে। কাগজের রোল বেরোনোর সঙ্গে। সঙ্গে লামারা প্রত্যেকটি শব্দ কাঁচি দিয়ে কেটে সেগুলোকে বিরাট বিরাট খাতায় সযত্নে সেঁটে ফেলছে। আর এক সপ্তাহে কাজ শেষ হওয়ার কথা। কোন্ হিসাবের ভিত্তিতে যে এরা কথাগুলোকে ন-অক্ষরে সীমাবদ্ধ রেখেছে, তার রহস্য জর্জ হ্যানলির অজানা। একটা আশঙ্কা মাঝে মাঝে হ্যানলির বুক কাঁপিয়ে দেয়, সেটা হল এই যে, লামারা হয়তো হঠাৎ একদিন স্থির করবে যে কাজটা ২০৬০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত চালানো দরকার। এদের পক্ষে সবই সম্ভব।
