নাম বলেছেন?
আজ্ঞে না, বললেন জরুরি দরকার।
বসবার ঘরে বসাও, আমি আসছি।
অ্যাপ্রন খুলে নিয়ে একটা ন্যাকড়ায় হাতের রঙটা মুছে অবনীশ বৈঠকখানায় গিয়ে হাজির হল। সোফা থেকে একজন চশমা পরা বছর পঁয়ত্রিশ ভদ্রলোক উঠে দাঁড়ালেন।
নমস্কার করে ভদ্রলোক বললেন, আমার পরিচয় দিলে হয়তো আপনি চিনবেন। আমার নাম হিমাংশু সেনগুপ্ত। আমি অম্বিকা সেনগুপ্তর বড় ছেলে।
আপনার বাবার মৃত্যুসংবাদ সেদিন কাগজে পড়লাম।
আপনি আমার বাবার একটা অয়েল পেপাট্রেট করেছিলেন।
হ্যাঁ–কিন্তু সে সময় তোত আপনাকে দেখিনি।
আমি তখন দিল্লি ছিলাম। আমিও ফিরলাম আর বাবাও গেলেন।
আই সি।
এই পোর্ট্রেটটা নিয়েই একটু কথা বলতে এসেছি।
কী ব্যাপার?
কাল সন্ধ্যায় বাবার স্মৃতিসভা আছে শিশির মঞ্চে। অনেক খুঁজেও বাবার এমন একটাও ফোটো পাইনি যেটা এনলার্জ করে সভায় রাখা যেতে পারে। তাই ভাবছিলাম আপনি যদি একদিনের জন্য আপনার ওই ক্যানভাসটা ধার দেন।
নিশ্চয়ই, বলল অবনীশ। এ নিয়ে কোনও প্রশ্নই উঠতে পারে না। আপনি কি এটা এখনই নিয়ে যেতে চান?
হাতের কাছে আছে কি? আমার ঠিক একদিনের জন্য দরকার।
আপনি পাঁচ মিনিট বসুন। আমি নিয়ে আসছি।
অবনীশ জানত ছবিটা কোথায় আছে। সেটা বার করে আবার ধুলো ঝেড়ে একটা খবরের কাগজে মুড়ে এনে হিমাংশু সেনগুপ্তর হাত দিল। ভদ্রলোক সেটা নিয়ে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে চলে গেলেন।
অবনীশ স্টুডিওতে ফিরে যাচ্ছিল, এমন সময় নিখিল এসে ঢুকল।
কাকে বেরোতে দেখলাম রে? প্রশ্ন করল নিখিল।
অবনীশ একটু ম্লান হাসি হেসে বলল, আমার প্রথম অয়েল পোর্ট্রেটের সাবজেক্টের ছেলে। অর্থাৎ অম্বিকা সেনগুপ্তর ছেলে।
বটে? নাম বলেছে?
হ্যাঁ। হিমাংশু।
ছবিটা নিল কেন?
ওঁর বাবার স্মৃতিসভা আছে, ভাল ফোটোগ্রাফ পায়নি, তাই ও পোর্ট্রেটটা রাখবে।
তুই খুব ভুল করেছিস।
কীসে?
ছবিটা দিয়ে।
কেন?
ও-ই বলেছিল মান্ধাতার আমল।
অ্যাঁ!
ইয়েস স্যার। আনন্দ বর্ধন হিমাংশু সেনগুপ্তর ছদ্মনাম।
.
অবনীশের মুখ থেকে অবাক ভাবটা কেটে গিয়ে একটা বিশেষ ধরনের হাসি ফুটে উঠল। তারপর চাপা স্বরে কথাটা বেরোল
পথে এসো বাবা, পথে এসো।
সন্দেশ, বৈশাখ ১৩৯৭
শিশু সাহিত্যিক
ছোটদের মাসিক পত্রিকা বহুরূপী এক বছর হল বেরোচ্ছে। সম্পাদক সুপ্রকাশ সেনগুপ্ত আপ্রাণ চেষ্টা করেন কাগজটাকে ভাল করতে। টাকার জোর নেই, তাই কাজটা সহজ নয়। গ্রাহক সংখ্যা দেড় হাজারের মতো; বিজ্ঞাপন যা আসে তার থেকেই টেনেটুনে চলে যায়। লাভ থাকে না মোটেই। তবে সুপ্রকাশ আদর্শবাদী, তাঁর বিশ্বাস, কাগজটা দাঁড়িয়ে যাবে, এবং তার জন্য চেষ্টার কোনও ত্রুটি করেন না তিনি।
সবচেয়ে মুশকিল হল গল্প নিয়ে। ভাল ছোটদের গল্প প্রায় আসে না বললেই চলে। এমনকী সুপ্রকাশ দু-একবার নামী লেখকের লেখাও জোগাড় করেছেন, কিন্তু সে লেখাও দায়সারা। নামকরা জনপ্রিয় পত্রিকার লেখাও সুপ্রকাশ পড়ে দেখেছেন, তারও গল্পের মান তেমন উঁচু নয়। আসলে ভাল গল্প আর তেমন লেখাই হচ্ছে না এই হল সুপ্রকাশের ধারণা।
অথচ পাণ্ডুলিপির অভাব নেই। প্রতি মাসে ষাট-সত্তরটা করে লেখা ডাকে আসে–গল্প, ছড়া, প্রবন্ধ। গল্পের উপরেই সুপ্রকাশ বেশি জোর দেন, কাজেই সেই পাণ্ডুলিপিগুলোই তিনি আগে পড়েন। দুঃখের বিষয় বেশিরভাগ লেখাই বাতিল হয়ে যায়। নতুন লেখকের অনেক লেখা আসে, এবং সে লেখা পড়েই বোঝা যায় কাঁচা। মাঝে মাঝে সে লেখা পড়বারও দরকার হয় না। পাণ্ডুলিপির চেহারা দেখেই সুপ্রকাশ তাকে বাতিল করে দেন। শুধু পাণ্ডুলিপির চেহারা কেন, সময় সময় লেখকের নাম থেকেই বোঝা যায় সে লেখা পড়ে কোনও লাভ নেই। নদেরচাঁদ ভড় বলে এক ভদ্রলোক তিন-চারখানা গল্প পাঠিয়েছেন, সঙ্গে ডাকটিকিট। সুপ্রকাশ সেগুলো না পড়েই ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছেন। নদেরচাঁদ ভড় যার নাম সে লেখকের কাছ থেকে সুপ্রকাশ কিছু আশা করেন না। তা ছাড়া পাণ্ডুলিপিও অপরিচ্ছন্ন। লেখা ফেরত পাঠাবার সময় সঙ্গে ছাপা চিঠি যায়–আপনার অমুক রচনা মনোনীত না হওয়ায় ফেরত পাঠানো হল। নমস্কারান্তে ইতি–ইত্যাদি।
তেমনই বটকেষ্ট হোড়, নকুড়চন্দ্র হাতি, গজানন আইচ–এদের সকলের লেখাই সুপ্রকাশ না পড়ে ফেরত দিয়েছেন। তার মন বলেছে লেখকের নামের সঙ্গে লেখার উৎকর্ষের একটা সামঞ্জস্য থাকে। উৎকট নামের ভাল লেখক আশা করা ভুল। এখনও পর্যন্ত গল্পের দিক দিয়ে কাগজটাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন দুটি লেখক–অমিয়নাথ বসু আর সঞ্জয় সরকার। দুজনেই সুপ্রকাশের আবিষ্কার, দুজনেই নিয়মিত গল্প পাঠান, এবং দুজনেই ভাল লেখেন। গল্পের বিষয় এবং ভাষা দুইই ভাল। সুপ্রকাশের গরিব কাগজ, কিন্তু তাও এ দুজন লেখককে তিনি নিয়মিত পারিশ্রমিক দেন।
লেখা যে সবসময় ডাকে আসে তা নয়। মাঝে মাঝে লেখক নিজেই লেখা সমেত এসে উপস্থিত হন। হয়তো এঁদের ধারণা যে, নিজে নিয়ে এলে লেখা মনোনীত হবার সম্ভাবনা বেশি। সুপ্রকাশ তাঁদের বলেন লেখা রেখে যেতে–মতামত যথাসময়ে জানানো হবে।
একদিন দুপুরের দিকে সুপ্রকাশ তাঁর ছোট্ট অফিসে বসে পাণ্ডুলিপি দেখছেন, এমন সময় একটি ধুতি-পাঞ্জাবি পর রোগা ফরসা ভদ্রলোক একটা লেখার বান্ডিল নিয়ে তাঁর আপিসে এলেন। সুপ্রকাশ মুখ তুলে চাইতে ভদ্রলোক বললেন, আমি একজন শিশু সাহিত্যিক; আমার নাম উজ্জ্বল বন্দ্যোপাধ্যায়। আমি কয়েকটা গল্প এনেছি আপনার পত্রিকার জন্য। আপনি অন্তত একটি যদি এখন পড়ে দেখেন।
