এই সমালোচনা শুধু অনীশ নয়, তার বাবা এবং তার বন্ধু নিখিলও পড়ল। বাবা বললেন, শিল্পীকে গালমন্দ করাটা, সমালোচকদের একটা হ্যাবিট, কারণ পাঠক প্রশংসার চেয়ে নিন্দাটা বেশি উপভোগ করে। তুই নিরুদ্যম হোস না।
নিখিল বলল, এই আনন্দ বর্ধন ছদ্মনামের আড়ালে কে লুকিয়ে রয়েছে সেটা বার করে সেই ব্যক্তিকে ধোলাই দিতে হবে।
অবনীশ কিন্তু সমস্যায় পড়ে গেল। সে অনুভব করল আনন্দ বর্ধনের বাক্যবাণ অনবরত তার মনে বিধছে। সে অত্যন্ত গভীর ভাবে চিন্তা করতে লাগল তার আঁকার ঢং পালটিয়ে সে আধুনিকের দলে চলে আসবে কি না। বারবার সমালোচকের তিরস্কার ও বিদ্রূপ সে সহ্য করতে পারবে না। মডার্ন আর্ট জিনিসটা কী ও কেন, সেটা সে এতদিন জানার চেষ্টা করেনি, এবার করবে।
প্রদর্শনীর পর ছটা মাস অবনীশ ছবিই আঁকল না; তার বদলে রোজ ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে গিয়ে মডার্ন আর্ট সম্বন্ধে যত বই পাওয়া যায়, সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল এবং পড়ল। তার ফলে সে জানল যে বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকেই প্রধানত ফ্রান্সে কিছু শিল্পীর প্রভাবে আর্টের জগতে এক বিপ্লব ঘটে। তার ফলে ছবির চেহারা একেবারে বদলে যায়, এবং বিপ্লবের প্রভাব ক্রমে সমস্ত পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। এইসব বইয়ে তার নিজের ঢং-এর একটি ছবিও খুঁজে পেল না অবনীশ।
এর পরে অবনীশ লাইব্রেরিতে যাওয়া বন্ধ করে ড্রইং-এর খাতায় প্যাস্টেল দিয়ে নতুন রীতিতে ছবি আঁকার চেষ্টা আরম্ভ করল। এভাবে প্রায় ত্রিশখানা খাতা ছবিতে ভরে গেল। ইজেলে সাদা ক্যানভাস খাটানো রয়েছে, কিন্তু তাতে একটা আঁচড়ও পড়েনি।
নিখিল একদিন এসে বলল, কী রে, তুই কি ছবি আঁকা ছেড়ে দিলি নাকি?
অবনীশ বলতে বাধ্য হল যে, সে তার ছবির ভোল পালটে আজকের দিনের শিল্পীদের দলে আসার চেষ্টা করছে।
মডার্ন আর্ট তো খুব সোজা, বলল নিখিল, একটা ক্যানভাস খাটিয়ে তাতে কাগের ঠ্যাং বগের ঠ্যাং এঁকে ভরিয়ে দেব্যস। হয়তো হাজার টাকায় বিক্রিও হয়ে যেতে পারে সেই ছবি।
অবনীশ তার বন্ধুর কথা খুব পছন্দ করল না। সে বুঝেছে মডার্ন আর্ট অত সোজা নয়। সেটা ঠিকভাবে করতে গেলে শিল্পীর দেশ-বিদেশের সাবেকি আর্ট ও লোকশিল্পের সঙ্গে পরিচয় থাকা চাই। সে পরিচয়ের জন্য সময় লাগে, অধ্যবসায় লাগে। তা হোক–অবনীশ বুঝেছে যে তাকে এই পথেই যেতে হবে। আনন্দ বর্ধনকে বলতে হবে–হ্যাঁ, অবনীশ বোস সার্থক শিল্পী। তার ছবিকে আর অবজ্ঞা করা চলে না।
দু বছর ধরে অবনীশ আধুনিক ছবি আঁকল। একবার ইজেলে ক্যানভাস খাটিয়ে অয়েল পেন্টিং। এই সময়ের মধ্যে স্বভাবতই তার কোনও রোজগার হয়নি। বাবা আবার তাকে সাহায্য করলেন। বললেন, তোর ছবি এখন আর বুঝতে পারছি না, কিন্তু এটা বুঝেছি যে তুই একটা তাগিদ অনুভব করছিস। তুই যদ্দিন আবার এগজিবিশন না করছিস, তদ্দিন কী খরচ লাগছে না-লাগছে সেটা আমাকে জানাতে দ্বিধা করিস না।অবনী বুঝল এমন বাপ না থাকলে তার শিল্পীজীবন এখানেই শেষ হয়ে যেত।
আজকাল অবনীশের এক-একটা ছবি আঁকতে বেশ সময় লাগে। একটু বড় ক্যানভাস হলে দুমাসও লেগে যায়। তাই দুবছরে তার ছবির সংখ্যা হল মাত্র বাইশ।
এই সময় একদিন মেহরার কাছ থেকে একটা ফোন এল। কী খবর অবনীশবাবু? আপনি কি ছবি আঁকা স্টপ করে দিয়েছেন? অবনীশ বলল সে এখনও নিয়মিত ছবি আঁকছে। তা হলে একদিন আপনার বাড়ি গিয়ে দেখি আপনার নতুন ছবি।
মেহরা এলেন এক রবিবার সকালে। অবনীশ তাঁকে তার স্টুডিওতে নিয়ে গেল।
এ আপনার কাজ? অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন মিঃ মেহরা।
আজ্ঞে হ্যাঁ।
আপনি স্টাইল একদম চেঞ্জ করে ফেলেছেন?
কেমন লাগছে বলুন।
আমি তো নিজে আর্ট বুঝি না। তবে দ্য কালারাস আর ভেরি গুড। আজকাল বড় খদ্দেররা এরকম জিনিসই চায়। এগুলোর সঙ্গে তাদের মডার্ন ফানির্চার খুব ভাল ম্যাচ করে।
সব ছবির উপর মেহরা একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন। কিছু বেশ বড় ছবিও ছিল। এই বাইশটাতেই যে রূপম ভরে যাবে তাতে সন্দেহ নেই।
অবনীশের প্রদর্শনীর দিন ঠিক হয়ে গেল। এবারও দশদিনের মেয়াদ। এই দশদিনে বাইশটার মধ্যে সতেরোখানা ছবিই বিক্রি হয়ে গেল। বেপরোয়া হয়ে অবনীশ ছবিগুলোর দাম বেশ চড়াই রেখেছিল; সেই দাম দিতেও লোকে দ্বিধা করল না। যা টাকা এল, তাতে অবনীশের দুবছরের সংস্থান হয়ে গেল।
আর সমালোচনা? অবনীশ দেখল তার বাবাই ঠিক বলেছিলেন। পথে এসো বাবা। লিখেছেন আনন্দ বর্ধন। তবে এই নতুন পথে চলাটা শিল্পীর পক্ষে এখনও সহজ হয়নি। এইভাবে আরও পাঁচ বছর লেগে থাকলে হয়তো অবনীশ বোস শিল্পী আখ্যা পেতে পারেন।
অবনীশ পত্রিকাটা ছুঁড়ে ফেলে দিল। সেই সঙ্গে এই ছদ্মনামধারী ব্যাক্তিটির আসল পরিচয়টা জানবার আগ্রহ আরও বেড়ে গেল। নিখিল বলল, কৃষ্টির একজনের সঙ্গে আমার আলাপ ছিল। সে যদি এখনও থেকে থাকে, তা হলে তাকে ভজিয়ে ছদ্মনামের পেছনে লোকটা কে সেটা হয়তো জানা যেতে পারে।
এর মাসখানেক পরে একদিন সকালে অবনীশ তার স্টুডিওতে কাজ করছে, এমন সময় চাকর গোবিন্দ এসে ঘরে ঢুকল।
কী ব্যাপার, গোবিন্দ? জিজ্ঞেস করল অবনীশ।
আজ্ঞে একটি বাবু আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।
কে এল আবার? খদ্দের নাকি? ইতিমধ্যে অবনীশের বাড়িতে লোক এসে তার ছবি কিনে নিয়ে গেছে। গুজরাতি ভদ্রলোক।
