এখনই? সুপ্রকাশ কিঞ্চিৎ বিস্মিত ভাবে প্রশ্ন করলেন।
আজ্ঞে হ্যাঁ। আজকাল ডাকের বড় গোলমাল হয়। তাই আমি নিজেই সঙ্গে করে লেখাগুলো নিয়ে এসেছি। তিনটে ছোটগল্প। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আপনার পছন্দ হবে। আমি সেই প্রথম থেকে বহুরূপী দেখছি। কাগজটার উপর আমার মায়া পড়ে গেছে। কিন্তু কিছুদিন থেকে লক্ষ করছি পত্রিকার গল্পগুলো তেমন জুতসই হচ্ছে না। আমি থাকি সেই নাকতলায়। আপনি যদি অন্তত একটা গল্প এখনই পড়ে আপনার মতামত দেন তা হলে বাধিত হব। আমি এই চেয়ারটায় বসছি; আমার তাড়া নেই।
সচরাচর আমি এ জিনিসটা করি না, বললেন সুপ্রকাশ।
আমি জানি, কিন্তু আমার একান্ত অনুরোধ। গল্প ছোট; আপনার বেশি সময় লাগবে না।
বসুন।
সুপ্রকাশ অগত্যা বান্ডিলটা ভদ্রলোকের হাত থেকে নিয়ে নিলেন। তিনটে গল্প, বেশ ঝরঝরে পাণ্ডুলিপি। সুপ্রকাশ একটা গল্প পড়তে শুরু করলেন।
দশ মিনিট লাগল গল্পটা পড়তে। খাসা লেখা। এত ভাল গল্প সুপ্রকাশের দপ্তরে কখনও আসেনি। সুপ্রকাশ নিজের আগ্রহেই বাকি দুটো গল্প পড়ে ফেললেন। এ দুটোও চমৎকার। ভদ্রলোকের ক্ষমতা আছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
ভাল গল্প, বললেন সুপ্রকাশ। আমি তিনটে গল্পই নিচ্ছি। পর পর ছাপব। ভবঘুরে গল্পটা সবথেকে ভাল, ওটা আমি পুজো সংখ্যার জন্য নির্বাচন করলাম। আপনাকে যথাসময়ে উপযুক্ত পারিশ্রমিক পাঠিয়ে দেব।
অনেক ধন্যবাদ। ইয়ে, আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করার ছিল।
বলুন।
আপনি কি সত্যভামা ইনস্টিটিউশনে পড়তেন?
হ্যাঁ। কেন বলুন তো?
আমিও একই ইস্কুলে পড়েছি। আপনার চেয়ে এক ক্লাস নীচে।
তাই বুঝি?
হ্যাঁ–আপনি আমাকে চিনতে পারছেন না, কারণ আমি অনেক রোগা হয়ে গেছি।
তা হবে। তা ছাড়া প্রায় পঁচিশ বছর আগের কথা তো।
কিন্তু আপনি খুব বেশি বদলাননি। শুধু আপনার একটা জিনিস বদলেছে।
কী?
আপনার নাম। আপনাকে আমি নিধুদা বলে ডাকতাম। আপনার নাম ছিল নিধিরাম ধাড়া।
আপনি ঠিকই বলেছেন। তবে, সে নামে কি আর কাগজের সম্পাদক হওয়া যায়? বললেন সুপ্রকাশ। তাই কাগজটা বার করার সময় নামটা বদলে নিই।
উজ্জ্বলবাবু উঠে পড়লেন।
আমি তা হলে আসি। আপনাকে গল্পগুলো পড়িয়ে সত্যিই আনন্দ পেলাম, নিধুদা। আপনাকে নিধুদা বলছি বলে কিছু মনে করবেন না।
ভদ্রলোক বান্ডিল নিয়ে এসেছিলেন, এখন খালি হাতেই বেরিয়ে গেলেন বহুরূপীর আপিস থেকে। আসল ব্যাপারটা উনি ধরে ফেলেছেন। বহুরূপীর সম্পাদক তাঁর লেখাগুলো না পড়েই ফেরত দিয়েছিলেন। এই একই গল্প, এবং তার জন্য তাঁর নামই দায়ী। নদেরচাঁদ ভড়! গোড়া থেকেই নামটা বদলে নেওয়া উচিত ছিল, আর নিজে না লিখে তাঁর ভাগনিকে দিয়েই পাণ্ডুলিপি লেখানো উচিত ছিল।
যাক, এখন থেকে তাঁর লেখা বহুরূপীতে ছাপা হবে তাতে সন্দেহ নেই।
সন্দেশ, ফাল্গুন ১৩৯৪
শেঠ গঙ্গারামের ধনদৌলত
আমার এখন যে চেহারা দেখছিস, বললেন তারিণীখুড়ো, তা থেকে আমার ইয়াং বয়সের চেহারা তোরা কল্পনাই করতে পারবি না।
কীরকম চেহারা ছিল আপনার, খুড়ো? জিজ্ঞেস করল ন্যাপলা, ধর্মেন্দরের মতো?
য্যা য্যাঃ! বললেন খুড়ো, ওরকম নাসপাতিমার্কা চেহারা নয়। টকটকে রং, ব্যায়াম করা পাকানো শরীর, জামা খুললে প্রত্যেকটি মা আঙুল দিয়ে দেখানো যায়–অ্যানাটমির চার্টের দরকার হয় না।–আর ফিল্ম স্টারের কথা কী বলছিস? কত অফার পেয়েছে জানিস খুড়ো হিরো হবার জন্যে?
ইস্–আর আপনি নিলেন না? বলল ন্যাপলা। আবিশ্যি তখন তো বোধহয় সাইলেন্ট ছবি, তাই না?
কে বললে সাইলেন্ট? আমি বলছি স্বাধীনতার কয়েক বছর আগের কথা। সাইলেন্ট ছবি তো ফুরিয়ে গেছে ত্রিশ সনের কিছু পরেই।
আপনি রিফিউজ করলেন?
আলবাৎ! একবার একটা ছবিতে করতে হয়েছিল, তবে সেটা অন্য গল্প, আরেকদিন বলব। আসলে ফিল্মের হিরো হবার শখ আমার ছিল না। আমি চেয়েছিলাম আমার গোটা জীবনটাই হবে একটা সিনেমার গপপো। একটা খাঁটি নির্ভেজাল অ্যাডভেঞ্চার। অথবা বলতে পারিস একটা সিরিজ অফ অ্যাডভেঞ্চার্স। রঙ মেখে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াব, ডিরেক্টরমশাই ডুগডুগি বাজাবেন, আর আমি নাচব–এ-শমা সে-শর্মা নয়।
আজ কোন অ্যাডভেঞ্চারের বিষয় বলবেন, মিস্টার শর্মা? জিজ্ঞেস করল ন্যাপলা। খুড়োকে এ ধরনের কথা বলার সাহস একমাত্র ন্যাপলারই আছে, তবে সেটা খুড়ো বিশেষ মাইন্ড করেন বলে মনে হয় না। বাইরে একটা খিটখিটে ভাব দেখালেও আসলে ওঁর মনটা নরম এটা জানতাম। বেনেটোলা থেকে টালিগঞ্জে আসেন যে শুধু আমাদের গল্প শোনাবার জন্যই এটা তো মিথ্যে নয়।
দুধ-চিনি ছাড়া চায়ে পর পর দুটো চুমুক দিয়ে খুড়ো বললেন, নাইনটিন ফর্টি-ফোরে আজমীর, তখন আমার বয়স আটাশ।
আমরা পাঁচজন–আমি, ভুল, চটপটি, সুনন্দ আর ন্যাপলা–গল্পের জন্য রেডি হয়ে বসলাম। চা শেষ করে একটা একসপোর্ট কোয়ালিটি বিড়ি ধরিয়ে খুড়ো আরম্ভ করলেন।
.
আগ্রায় একটা ব্যাঙ্কের চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে কোথায় যাওয়া যায় তাই ভাবছি, এমন সময় হঠাৎ মনে পড়ে গেল ধরণীকাকার কথা। আমার বাবার মাসতুতো ভাই। তিনি জয়পুরে হোমিওপ্যাথি করে বেশ পসার জমিয়ে বসেছেন। রাজস্থানটা দেখা হয়নি, অথচ ছেলেবেলা থেকেই ও-দেশটার উপর একটা আকর্ষণ রয়েছে। মনে হয় ভারতবর্ষে ওটাই হস সত্যিকারের রোম্যান্স ও অ্যাডভেঞ্চারের ঘাঁটি। চলে গেলুম কাকার কাছে।
