অম্বিকা সেনগুপ্তর পোর্ট্রেটের পর্ব এখানেই শেষ হল।
এবার অবনীশ তার পেশাদারি শিল্পীজীবনের জন্য তৈরি হল। ছবি এঁকে রোজগার তাকে করতেই হবে। বাপের অনুগ্রহে আর কতদিন চলে? কী ঢঙে ছবি আঁকবে সে; সাবেকি না আধুনিক–সেই নিয়ে তার মনে প্রশ্ন জেগেছে, যদিও তার উত্তর সে এখনও খুঁজে পায়নি।
অম্বিকাবাবুর চলে যাওয়ার মাসখানেক পরে চিত্রকুট গ্যালারিতে আধুনিক ভারতীয় শিল্পীদের একটা প্রদর্শনী হল। অবনীশ গেল দেখতে, এবং দেখে সে হতবাক হয়ে গেল। যে ছবির না আছে মাথা না আছে মুণ্ডু, তার দাম আকাশছোঁয়া। আর সেই দামে লোকে সে ছবি কিনছে বাড়িতে টাঙিয়ে রাখার জন্য। চল্লিশটার মধ্যে উনিশটা ছবির ফ্রেমে লাল গোল কাগজ আঁটা। তার মানে ছবি বিক্রি হয়ে গেছে, অথচ আজ সবে প্রদর্শনীর চতুর্থ দিন।
মিনিট পনেরো থেকে অবনীশ গ্যালারি থেকে বেরিয়ে এল। সে মনস্থির করে ফেলেছে। চুলোয় যাক মডার্ন আর্ট। সে তার নিজের ঢঙেই ছবি আঁকবে–সে ছবি লোকে নিক বা না নিক।
ছমাসে অবনীশ বত্রিশখানা ছবি আঁকল। কিছু প্রাকৃতিক দৃশ্য আঁকার জন্য তাকে বাইরেও যেতে হয়েছিল–পুরী, ঘাটশিলা, গ্যাংটক। সে বুঝেছে ল্যান্ডস্কেপেও তার হাত খারাপ নয়।
নিখিল এল একদিন ছবি দেখতে। দেখে-টেখে বলল, দুর্দান্ত হয়েছে তোর ছবি। তবে ভয় হয় কী জানিস? আজকাল ছবির চেহারা আর লোকের রুচি এত পালটে গেছে যে, তোর ছবি বাজারে চলবে কিনা তাই ভাবছি। তুই একজিবিশন করবি তো?
ইচ্ছে তো আছে। ছবি বিক্রি না হলে রোজগার হবে কী করে?
একটা গ্যালারির নাম হয়তো তুই শুনেছিস–রূপম। তার মালিক পুরুষোত্তম মেহরা বাবার পেশেন্ট। খুব কঠিন ব্যারাম থেকে বাবা ওঁকে সারিয়ে তুলেছিলেন। মেহরা মোটামুটি সেকেলে লোক, যদিও ছবি যা দেখায় সবই মডার্ন। আমি ওঁকে ফোন করে রাখছি। তুই তোর গোটা দু-এক ছবি নিয়ে গিয়ে এঁকে দেখা। ভদ্রলোক হয়তো প্রদর্শনী করতে রাজিও হয়ে যেতে পারেন।
অবনীশ নিখিলের কথামতো মেহরার সঙ্গে টেলিফোনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে তিনটে বাছাই ছবি সঙ্গে নিয়ে ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা করল।
মিঃ মেহরা ছবিগুলোর দিকে মিনিটখানেক তাকিয়ে থেকে বললেন, এ তো দেখছি সবই চিনতে পারছি–মানুষের মতো মানুষ। বাড়ির মতো বাড়ি। গাছের মতো গাছ। আজকাল তো আর কেউ এমন আঁকে না।
অবনীশ মৃদুস্বরে বলল, আজ্ঞে, আমি এরকমই আঁকতে ভালবাসি।
মেহরা বললেন, দেখেন অবনীশবাবু–আমি আপনাকে ফ্র্যাঙ্কলি বলছি, আমরা নামকরা আর্টিস্টের ছাড়া কারও ছবি এগজিবিট করি না। ছবি বিক্রি হবে এই গ্যারান্টি আমাদের চাই, কারণ কি ছবি বিক্রির তিন ভাগের এক ভাগ টাকা আমরা কমিশন নিই; এ থেকে আমাদের ব্যবসা চলে। শুধু আমাদের নয়–অল কমার্শিয়াল গ্যালারিজ।
আর যদি ছবি বিক্রি না হয়?
তা হলে আমাদের লোকসান। বিক্রি হবে জেনেই তো আমরা ওয়েলনোন আর্টিস্ট ছাড়া কারুর ছবি দেখাই না।
তা হলে আমার ছবি আপনি দেখাবেন না? নৈরাশ্যের সুরে বলল অবনীশ।
মিঃ মেহরা অবনীশের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে মৃদু হেসে বললেন, আপনি অন্য কেউ হলে আপনাকে রিফিউজ করে দিতাম, কিন্তু ডক্টর দত্তর ছেলে আমাকে রিকুয়েস্ট করেছে বলে আমি আপনাকে ফিরিয়ে দিতে পারছি না। তা ছাড়া এরকম ছবির মার্কেট আছে কিনা সেটাও দেখা যাবে। তবে আপনাকে কিন্তু আমাদের টার্মস মেনে নিতে হবে।
নিশ্চয়ই।
এই ঘটনার এক মাস পর অবনীশের প্রদর্শনী শুরু হল রূপম গ্যালারিতে। দশ দিন চলবে, বত্রিশখানা ছবি। তার মধ্যে অম্বিকা সেনগুপ্তর পোর্ট্রেটটাও ছিল, তবে সেটা নট ফর সেল। তার জীবনের প্রথম পেশাদারি কাজ অবনীশ হাতছাড়া করবে না।
প্রদর্শনীতে প্রথম তিনদিন বিশেষ লোক হয়নি। তারপর থেকে দর্শকের সংখ্যা ক্রমে বাড়তে লাগল। অবনীশ অবাক হয়ে দেখল যে, তার ছবি বিক্রিও হচ্ছে। প্রথমবার বলে সে ছবির দাম বেশ কমই রেখেছিল, তাও চোদ্দখানা ছবি বিক্রি হয়ে কমিশন বাদে তার হাতে এল সাড়ে চার হাজার টাকা। মিঃ মেহরাও তাকে কনগ্রাচুলেট করলেন এবং কথা দিলেন যে ভবিষ্যতেও রূপম অবনীশের ছবির এগজিবিশন করবে।
কিন্তু একটা ব্যাপারে অবনীশকে চোট পেতে হল। সেটা হল বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তার প্রদর্শনীর সমালোচনা। বেশিরভাগ সমালোচকই বলেছে যে অবনীশের মস্ত দোষ হল সে সময়ের সঙ্গে তাল রেখে চলছে না। একজন বলেছে, আজ যদি কোনও লেখক বঙ্কিমচন্দ্রের ঢঙে উপন্যাস লেখে তা হলে কি সেটা একটা প্রশংসনীয় ব্যাপার হবে?
এইসব সমালোচকের নাম অনেকেই জানে না। যার নাম জানে, এবং যার সমালোচনা সকলেই পড়ে সেহল কৃষ্টি সাপ্তাহিকের সমালোচক আনন্দ বর্ধন। অবনীশ জানে যে নামটা ছদ্মনাম, কিন্তু এই নামের পিছনে আসল ব্যক্তিটি কে সেটা সে জানে না। এর সমালোচনার শিরোনাম হল মান্ধাতার আমল। তীরের মতো চোখা চোখা শব্দের ব্যবহারে সমালোচক অবনীশের প্রদর্শনীকে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছেন। যুগ পরিবর্তনের সঙ্গে আটের চেহারাও যে আমূল পালটেছে, সে খবর যে এই শিল্পী রাখেন।
সেটা এর ছবিগুলির দিকে এক ঝলক দৃষ্টি দিলেই বোঝা যায়, লিখছেন আনন্দ বর্ধন। ক্যানভাস ও তেল রঙ আজকাল দুল্য। তাদের এই অপব্যবহার কোনওমতেই বরদাস্ত করা যায় না। প্রদর্শনীর কথা চিন্তা না করে শিল্পী যদি আজকের শিল্পরীতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার প্রয়াস করেন তা হলে হয়তো এর একটা ভবিষ্যৎ গড়ে উঠতে পারে, কারণ রঙ তুলির ব্যবহার যে উনি একেবারে জানেন না তা নয়।
